আশুলিয়ায় ৬ দলিল লেখক বরখাস্ত, স্বস্তি সাধারণ মানুষের

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:৩৯ পিএম

সিন্ডিকেট করে দুর্নীতি ও জাল–জালিয়াতি করতে না দেওয়ায় দলিল রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করে ধর্মঘটের নামে ঢাকার আশুলিয়ায় দলিল লেখকরা দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ ও সাব-রেজিস্ট্রারকে জিম্মি করে রেখেছিলেন। 

তাদের অনৈতিক দাবিতে সাড়া না দেওয়ায় সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে একের পর এক কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, মিছিল ও সমাবেশ করে আসছিলেন তারা। এসব বিষয়ে দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে দলিল লেখকরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

তাদের সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। অতিষ্ঠ হয়ে নিজ অফিসে দলিল লিখতে গিয়ে এই সিন্ডিকেটের হাতে মারধরের শিকার হয়ে মামলা করেন শাহাদাত হোসেন নামে এক দলিল লেখক। পরে তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ৬ জন দলিল লেখককে বরখাস্ত করা হয় এবং অফিস চত্বরে তাদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এতে আশুলিয়ায় স্বস্তি ফিরেছে।

জানা গেছে, গত ২৮ অক্টোবর জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ৬ দলিল লেখক—আলমগীর হোসেন, মোতালেব হোসেন, ফজলুর রহমান, মনসুর রহমান, অনিক হাসান দিলবর ও রেজাউল করিম—কে বরখাস্ত করা হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, তারা বহিরাগতদের দিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে হামলা চালিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় মামলা (নম্বর–১৫/২৫) হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, আন্দোলনের কারণে জমির দলিল সম্পাদনের কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, এতে জমি কেনাবেচা ব্যাহত হয়। জমির দলিল সম্পাদন করতে না পেরে ক্রেতা-বিক্রেতারা বিপাকে পড়েন এবং সরকারও কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারায়।

আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার খায়রুল বাশার ভূঁইয়া পাভেল বলেন, আশুলিয়া দলিল লেখক কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন, মোতালেব, করিম, দিলবরসহ আরও কয়েকজনের ইন্ধনে দলিল লেখকরা ভিত্তিহীন আন্দোলনে নেমেছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে কয়েক মাস ধরে দলিল লেখার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন কিছু দলিল লেখক। এতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিল সম্পাদনের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। যারা নিজ উদ্যোগে অন্যত্র থেকে দলিল লিখে সম্পাদনের জন্য আসছিলেন, তাদেরও ভয়ভীতি দেখানো হতো।

সাব-রেজিস্ট্রার খায়রুল বাশার ভূঁইয়া পাভেল বলেন, “আমার কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা না পেয়ে কয়েকজন দলিল লেখক ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছেন। আশুলিয়া দলিল লেখক কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের ইন্ধনে জোর করে দলিল লেখকদের কক্ষ বন্ধ রাখা হয়েছে, পে–অর্ডার করতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি স্ব-উদ্যোগে দলিল লিখে সম্পাদন করতে আসা এক ব্যাংক কর্মকর্তাকে মারধর করা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অচলাবস্থা সৃষ্টি করে সরকারকে রাজস্ব বঞ্চিত করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “আলমগীর হোসেন ভুয়া খাজনা দিয়ে একটি দলিল সম্পাদন করাতে চেয়েছিলেন, আমি তা গ্রহণ করিনি। বিভিন্ন সময় তার অনৈতিক দাবির কাছে মাথা নত না করায় তিনি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নেমেছেন।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন দলিল লেখক জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আলমগীর হোসেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক পদে থেকে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। এখন আবার সেই আধিপত্য ফিরে পেতে ঘনিষ্ঠ কিছু দলিল লেখককে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছেন।

ভুক্তভোগীরা বলেন, গত ১৭ জুন থেকে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এ ধরনের অচলাবস্থা চলছিল। এখন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ায় সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছেন তারা।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আশুলিয়া দলিল লেখক কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন বলেন, “সাব-রেজিস্ট্রার পাভেলের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ কারণেই আমরা তার অপসারণ দাবি করছি।”

কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, কর্মবিরতি পালনকারীদের অনেকে জমির নিবন্ধন করতে আসা মানুষকে হুমকি দিয়ে ফিরিয়ে দিতেন। তবে অনেকেই নিজ উদ্যোগে দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন করছেন। এক ব্যক্তিকে দলিল সম্পাদনের কারণে মারধরও করা হয়েছে, এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, দলিল লেখকরা দাবি করেছেন, আশুলিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার খায়রুল বাশার ভূঁইয়ার স্বেচ্ছাচারিতা, তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ আচরণ ও দুর্নীতির প্রতিবাদে তারা কর্মবিরতি পালন করছেন। তারা সাব-রেজিস্ট্রারের পদত্যাগ দাবি করেছেন।

অন্যদিকে অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২৩ মার্চ সাব-রেজিস্ট্রার খায়রুল বাশার ভূঁইয়া যোগ দেওয়ার পর থেকেই জমির শ্রেণি অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত কর আদায়ে তিনি কঠোর হন। এতে কিছু দলিল লেখক ক্ষুব্ধ হন। তারা সরকারের নির্ধারিত উৎস কর কমানোর দাবি জানান, কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রার তা প্রত্যাখ্যান করেন। ভুয়া খাজনা রসিদ দিয়েও দলিল সম্পাদন করতে গেলে তিনি তা আটকান।

‘ভুয়া’ ভূমি উন্নয়ন করের এমন এক রসিদে দেখা যায়—রসিদের কিউআর কোড স্ক্যান করলে সেটি সরকারি ডোমেইনে নয়, বরং একটি ডোমেইনে তৈরি ওয়েবসাইটে সংযুক্ত থাকে। অভিযোগ উঠেছে, এসব ভুয়া রসিদ ব্যবহার করেই দলিল রেজিস্ট্রেশন করা হতো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত