জাহান্নাম থেকে বাঁচতে কোরআনের বার্তা

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:০৯ এএম

জাহান্নাম আরবি শব্দ। একে ফারসিতে দোজখ আর বাংলায় নরক বলা হয়। ইসলামের পরিভাষায় জাহান্নাম হলো, পরকালে পাপীদের জন্য নির্দিষ্ট যন্ত্রণাদায়ক আবাসস্থল। সেদিন যাদের আমলনামার প্রতি মহান আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন তাদের শাস্তির ঠিকানা হবে জাহান্নাম। জাহান্নাম বিভীষিকাময় ও ভয়ংকর শাস্তির স্থান। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে মুমিনদের জাহান্নাম থেকে বাঁচতে এবং তাদের পরিবারের লোকদেরকেও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে নির্দেশ দিয়েছেন।

ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে জাহান্নাম অত্যন্ত নিকৃষ্ট।’ (সুরা ফুরকান ৬৬) জাহান্নামের শাস্তিসমূহের অন্যতম একটি উপাদান হলো আগুন। জাহান্নামের আগুন একটি প্রলম্বিত ও অসহনীয় দহন যন্ত্রণার উৎস। সাধারণ জ্ঞান ও উপলব্ধির বাইরে এ যন্ত্রণা। এর ব্যাপ্তিও অকল্পনীয়। জাহান্নামের আগুন কখনো নিস্তেজ হবে না। দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পরও তার প্রজ্জ্বলন হ্রাস পাবে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ওই আগুন (জাহান্নাম) থেকে আত্মরক্ষা করো, যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফের সম্প্রদায়ের জন্য।’ (সুরা আলে ইমরান ১৩১)

অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদেরকে লেলিহান আগুন সম্পর্কে সতর্ক করেছি।’ (সুরা লাইল ১৪) তাই জাহান্নামের আগুন থেকে নিজে বাঁচুন এবং পরিবার-পরিজনকেও বাঁচান। মহান আল্লাহর আদেশও অনুরূপ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনদের সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। সেখানে রূঢ় স্বভাব ও কঠিন হৃদয়ের ফেরেশতারা নিয়োজিত থাকবে, যারা কখনো আল্লাহর কোনো নির্দেশ অমান্য করে না। তাদের যে নির্দেশ দেওয়া হয় তাই পালন করে।’ (সুরা তাহরিম ৬)

এ আয়াতে সব মুসলিম জাতিকে আদেশ করা হয়েছে যে, জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে বাঁচাও এবং নিজের পরিবার-পরিজনকেও বাঁচাও। অতঃপর মহান আল্লাহ জাহান্নামের আগুনের প্রখরতা ও ভয়াবহতার কথা উল্লেখ করেছেন। এরপর এটিও উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি জাহান্নামি হয়ে যাবে, সে আপন শক্তি-সামর্থ্য, ক্ষমতা-দক্ষতা, চাটুকারিতা বা ঘুষ ইত্যাদি দিয়েও জাহান্নামে নিয়োজিত ফেরেশতাদের হাত থেকে রক্ষা পাবে না। কারণ সেখানে এত কঠিন হৃদয়ের ফেরেশতা দায়িত্ব পালনে নিযুক্ত রয়েছে, যারা মহান আল্লাহর আদেশ পালনে অটল। কখনো তারা মহান আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন করে না।

আলোচ্য আয়াতে ‘আহলিকুম’ শব্দে আপন পরিবার-পরিজনের সব সদস্য অন্তর্ভুক্ত। তাই পরিবার প্রধানের দায়িত্ব হচ্ছে তার স্ত্রী, সন্তানসন্ততি ও তার অধীন সবাই জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করা।

একজন মানুষের পরিবারই হচ্ছে মূল। তাই পরিবারকে দ্বীনের দিকে দাওয়াত প্রদান, তাদের সংশোধন, উপকারী ইলম দ্বারা তাদেরকে শক্তিশালীকরণ, সৎ আমলে অভ্যস্ত করে তোলা এবং ক্ষতিকারক বিষয় থেকে সতর্ক করা আবশ্যক।

এ প্রসঙ্গে কাতাদা (রহ.) বলেন, ‘পরিবারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি তার পরিবারকে মহান আল্লাহর আনুগত্যের আদেশ করবে, তাদেরকে আল্লাহর নাফরমানি থেকে নিষেধ করবে। তাদের ওপর আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়ন করবে, তার নামেই তাদের নির্দেশনা দেবে এবং তাদেরকে সাহায্য করবে। যখন সে তাদের মধ্যে কোনো নাফরমানি দেখবে, তখন তা প্রতিরোধ করবে এবং তাদের তা থেকে ধমক দেবে।’ (তাফসিরে তাবারি ২৮/১৬৬)

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর স্মরণ করো এই কিতাবে উল্লিখিত ইসমাইলকে। সে ছিল সত্যিকারের ওয়াদা পালনকারী এবং সে ছিল রাসুল, নবী। আর সে তার পরিবার-পরিজনকে নামাজ ও জাকাত আদায়ের নির্দেশ দিত এবং সে ছিল তার রবের সন্তোষভাজন।’ (সুরা মারইয়াম ৫৪-৫৫) মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘তুমি তোমার পরিবারের লোকদেরকে নামাজের আদেশ দাও এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকো।’ (সুরা তাহা ১৩২)

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি ২৫৫৪)

আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন যে, সে তা ঠিকঠাক আদায় করেছে কিনা? এমনকি ব্যক্তিকে তার পরিবার সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করবেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান ৪৫৭০)

বস্তুত একজন মুমিন ব্যক্তি তার পারিবারের হেদায়েত ও সংশোধনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, ঠিক যেভাবে সে নিজের হেদায়েত ও সংশোধনের জন্য দায়িত্বশীল। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন শাসক তার অধীনস্তদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ গৃহকর্তা তার পরিবার-পরিজনদের প্রতি দায়িত্বশীল, সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন স্ত্রী তার স্বামীর পরিবার ও সন্তানসন্ততির প্রতি দায়িত্বশীল, সে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। আর একজন কর্মচারী তার মালিকের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি ৫১৮৮)

এ হাদিসটি আমাদের সামনে একজন মুসলিমের দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা স্পষ্ট করে দেয়। এটি সাধারণভাবে সবার জন্য প্রযোজ্য, এখানে কাউকে আলাদা করার সুযোগ নেই। আমরা সর্বদা চেষ্টা করব, আমাদের প্রত্যেকের ওপর যে দায়িত্ব রয়েছে, তা যথাযথভাবে পালন করতে। বিশেষ করে পরিবারের লোকদের ব্যাপারে, তারা ইসলামের বিধিবিধান পালন করছে কিনা, তা যথাযথভাবে তদারকি করা। অন্যথায় মহান আল্লাহ পরকালে আমাদেরকে পাকড়াও করবেন।

তাই একজন মুমিন ব্যক্তির তার নিজের এবং নিজ পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা জাহান্নামের আগুন তো জালেমদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। সে নিজেও এর মুখোমুখি হতে পারে, হতে পারে তার পরিবারও। সেজন্য তার ওপর আবশ্যক হলো নিজেকে এবং তার পরিবারকে তা থেকে রক্ষা করা।

সুতরাং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সবার উচিত মহান আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-এর আদেশ-নিষেধ মেনে দুনিয়ার জীবন পরিচালনা করা। তাহলেই আমরা সফলকাম হবো। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত