নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালন করেছে বিএনপি। কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল বিকেলে নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে বিএনপির নেতাকর্মীরা। শোভাযাত্রা শুরুর আগে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিকে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই নির্বাচনের পরিবেশ বানচালের ষড়যন্ত্র করছে।’
ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি এই সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশ শেষে শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রাটি শান্তিনগর, মালিবাগ, মৌচাক, মগবাজার ও বাংলা মোটর হয়ে সোনারগাঁও হোটেলের মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। এতে দলের মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খানসহ কেন্দ্রীয় ও অঙ্গসংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করেন। বিএনপির শোভাযাত্রার কারণে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারেও রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হয়।
নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলের আন্দোলন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘একটা রাজনৈতিক দল কয়েকটি দলের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। জোট বেঁধে তারা চাপ সৃষ্টি করছে নির্বাচনের আগে গণভোট দিতে হবে। তাদের সেই চাপ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র সফল হবে না। গণভোট হলে তা নির্বাচনের দিনই হতে হবে, কারণ দুটো নির্বাচন করতে গেলে প্রচুর অর্থের অপচয় হবে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল হতে পারে। নির্বাচন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই হতে হবে। অন্যথায় দেশের মানুষ এই অবস্থা মেনে নেবে না।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সাত মাস ধরে আলোচনা শেষে ঐকমত্যে পৌঁছানো বিষয়গুলো থেকে হঠাৎ সরে আসা হয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে “জুলাই সনদ” স্বাক্ষরিত হলেও সম্প্রতি উপদেষ্টা পরিষদ ও প্রধান উপদেষ্টা যে নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন, সেখানে আগেকার ঐকমত্যের সিদ্ধান্তগুলো, বিশেষ করে আপত্তিগুলো (নোট অব ডিসেন্ট) উপেক্ষা করা হয়েছে। এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণামূলক আচরণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার, যাকে বিএনপি সম্পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে, তারাই এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যাতে নির্বাচনব্যবস্থা বানচাল হয়। যারা নির্বাচনের আগে গণভোটের চাপ দিচ্ছে, তারাও নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে।’
মির্জা ফখরুল যুবক ও নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, মারা গেছেন, তাদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা এই নির্বাচনে অংশ নেব ইনশাআল্লাহ। এই নির্বাচনে জয়ী হয়ে আমরা একটা নতুন বাংলাদেশ গড়ব।’
বিএনপি মহাসচিবের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ও উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক। এর আগে সকালে দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই গণতন্ত্র ধ্বংসের চক্রান্ত চলছে। দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ধ্বংস করতে এখনো কিছু গোষ্ঠী নানা রকম ষড়যন্ত্র করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন ধরনের অপচেষ্টা ও চক্রান্ত চলছে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্য। তাই ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের মতো সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ষড়যন্ত্র রুখে দিতে হবে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস আমাদের সেই পথেই পরিচালিত করে, যে পথে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও একটা সমৃদ্ধ রাষ্ট্র নির্মাণ করতে পারব। জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত, বিচারের অধিকার নিশ্চিত করতে পারব। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।’
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট ইস্যুতে আলোচনার জন্য গত বুধবার রাতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ফোন করে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য গত বুধবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত খুব পরিষ্কারভাবে আপনাদের জানিয়ে দিয়েছি। সেটাই আমাদের চূড়ান্ত বক্তব্য।’
এ সময় উপস্থিত ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সালাহউদ্দিন আহমদ, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন; চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান; সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী; যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন ও আব্দুস সালাম আজাদ এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
