চট্টগ্রামের উপকূলীয় বাঁশখালীর দীর্ঘ বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য বিগত দিনে ২৯৩ কোটি টাকার কাজ শেষ হওয়ার পর আবারও নতুন করে ৪৯৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার প্রকল্প শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ কাজ ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয়দের সাব-ঠিকাদারি ও বালি সরবরাহের দাবি, লবণাক্ত বালি ব্যবহারের অভিযোগসহ নানা কারণে এখনো পুরোদমে কাজ শুরু করা যায়নি। নভেম্বর মাসের শুরুতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে কাজের অগ্রগতি মাত্র আড়াই শতাংশ। বেশ কয়েকটি স্থানে কাজ একেবারে বন্ধ রয়েছে। ফলে আগের মতো এবারও যথাসময়ে কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
১৯৯১ সালের প্রলয়ংকর ঘূর্ণিঝড় থেকে শুরু করে প্রতিটি দুর্যোগে বাঁশখালী উপকূলের মানুষ প্রাণহানি, বাড়িঘর হারানোসহ চরম ক্ষতির শিকার হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ১ মে থেকে ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদে প্রথমে ২০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি ও ঠিকাদারদের আপত্তির মুখে ২০১৫ সালেই তা বাড়িয়ে ২৫১ কোটি ২৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকা করা হয়। অবশেষে প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়ায় ২৯৩ কোটি টাকা। ৩৪টি প্যাকেজে খানখানাবাদে ৪ হাজার ৫০০ মিটার, ছনুয়ায় ৩ হাজার ২০০ মিটার, সাধনপুরে ২ হাজার ৭৯ মিটার, পুকুরিয়ায় ১ হাজার ২৬৯ মিটার, গন্ডামারায় ৯০০ মিটার এবং বাহারছড়ায় ৫০০ মিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই বাঁধের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ফাটল ধরেছে, ব্লক ধসে পড়ছে। এখন আবার নতুন করে ৪৯৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার প্রকল্পে ৬.৪১০ কিলোমিটার বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ ও ঢাল সংরক্ষণ কাজ চলছে। এবার খানখানাবাদ ইউনিয়নে ২ হাজার ৬১০ মিটার, বাহারছড়া ইউনিয়নে ১ হাজার মিটার, ছনুয়া ইউনিয়নে ২ হাজার ৮০০ মিটার এবং সাধনপুর ইউনিয়নে ১ হাজার ১০০ মিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ করা হবে।
বাঁশখালীতে চলমান এ প্রকল্পের কাজ পেয়েছে প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (পিডিএল), আরএফএল, হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং জামিল ইকবাল নামের চারটি প্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আগেও বাঁশখালীর বেড়িবাঁধের কাজ করেছে, কিন্তু যথাসময়ে কাজ শুরু বা শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খন্দকার মো. জুলফিকার তারেক বর্তমান প্রকল্পের পরিচালক হলেও আগের প্রকল্পেও নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে প্রতি মিটার বাঁধ নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছিল ২.৩৩ লাখ টাকা, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৪৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হলেও কাজের মান ঠিক থাকবে কি না, সেটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রধান প্রশ্ন।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, ৪৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের শুরু থেকেই লবণাক্ত বালি, নোনাপানি মিশ্রিত উপকরণ ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
কাজ শুরুর প্রথম দিকেই লবণাক্ত বালি ব্যবহারের অভিযোগে গত ২৭ অক্টোবর বাঁশখালী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ওমর সানি আকন কদমরসুল এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন এবং লবণাক্ত বালু জব্দ করে তা সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিডিএলের কদমরসুল এলাকার প্রকৌশলী ফখরুল হাসান বলেন, ‘কাজের মান যথাযথ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয়রা সাব-ঠিকাদারি ও বালি সরবরাহের জন্য নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। তাদের বালু না নিলে নানা রকম তদবির করা হচ্ছে।’
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁশখালী পানি উন্নয়ন উপ-বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল বলেন, ‘খানখানাবাদে লবণাক্ত বালির অভিযোগে কাজ বন্ধ আছে। ছনুয়ায় ১ নভেম্বর থেকে কাজ শুরু হয়েছে, সাধনপুরে চলমান। কোনো অনিয়ম হলে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ জামশেদুল আলম বলেন, ‘বাঁশখালীর জনগণের কাছে বেড়িবাঁধ জীবনরেখা। কোনোভাবেই অনিয়ম হোক, তা কেউ চায় না। লবণপানি মিশ্রিত বালু দিয়ে ব্লক নির্মাণ একেবারেই চলবে না। কাজের মান ঠিক রেখে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।’
