বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে বাল্যবন্ধুকে খুন করেন জরেজুল

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:২৩ এএম

রাজধানীতে হাইকোট-সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের গেটের কাছে ড্রাম থেকে রংপুরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের ২৬ টুকরো লাশ উদ্ধারের ঘটনার ‘মূলহোতা’ জরেজুল ইসলামকে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অন্যদিকে এ ঘটনায় জড়িত জরেজুলের ‘বান্ধবী’ শামীমাকে ‘বিভিন্ন আলামত’সহ গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৩। গতকাল শুক্রবার রাতে ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

ডিবির একটি সূত্র বলছে, আশরাফুলকে হত্যার পর লাশের সঙ্গে একই বাসায় অন্তত ‘২৪ ঘণ্টার বেশি’ লাশ কী করবেন, তা নিয়ে পরিকল্পনা করেন জরেজুল ইসলাম ও শামীমা। একপর্যায়ে দুজনে সিদ্ধান্ত নেন, লাশ টুকরো করে ড্রামের মধ্যে নিয়ে কোথাও ফেলে দিয়ে আসবেন। সে অনুযায়ী লাশ ২৬ টুকরো করে ড্রামে ভরে হাইকোর্টের সামনে ফেলে যান তারা। পুলিশ ও আশরাফুলের পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, ব্যবসায়িক কাজে দুই বন্ধুর যাওয়ার কথা ছিল চট্টগ্রাম। কিন্তু ২৬ টুকরো লাশ হয়ে পড়ে রইলেন হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে। গতকাল সন্ধ্যায় এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মঙ্গলবার বাড়ি থেকে আশরাফুল ঢাকায় আসেন। বুধবার রাত ৯টা পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার কথা হয়। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। পরিবার ও আত্মীয়স্বজন সবাই সন্দেহ করছেন আশরাফুলের বন্ধু জরেজই এ হত্যার সঙ্গে জড়িত।’

এদিকে আশরাফুলের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। পরিবারের অন্যতম উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা পরিবার। আশরাফুলকে ২৬ টুকরো করে নির্মম হত্যার কথা বারবার স্মরণ করে ডুকরে কাঁদছেন স্বজনরা।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আশরাফুল হক হিলি স্থলবন্দর থেকে কাঁচামাল কিনে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাইকারি বিক্রি করতেন। তার বন্ধু জরেজ সদর উপজেলার শ্যামপুরের বাসিন্দা ও তিনি দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় ছিলেন। দেশের ফেরার পর আশরাফুলের সব ব্যবসা-বাণিজ্য, হিসাব-নিকাশ রাখতেন জরেজ। গত মঙ্গলবার দুজন ব্যবসার কাজে ঢাকায় যান। বুধবার বিকেলে আশরাফুলের সঙ্গে স্ত্রী লাকী বেগমের শেষ কথা হয়। এরপর থেকে আর যোগাযোগ করতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা। বৃহস্পতিবার বদরগঞ্জ থানায় জিডি করতে আসেন তারা। সেখানে এসে জানতে পারেন আশরাফুলকে ঢাকায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার খ-িত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

গতকাল দুপুরে সরেজমিন ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ। বাড়ির দরজায় নির্বাক হয়ে বসে আছেন আশরাফুলের বাবা আবদুর রশিদ। তার মা এছরা খাতুন শয্যাশায়ী। ঘরের ভেতর স্ত্রী লাকী বেগমের আহাজারিতে স্তব্ধ এলাকাবাসী। তাদের চোখে আশরাফুল ছিলেন একজন নম্র-ভদ্র ও দানবীর মানুষ। তিনি দুই হাত প্রসারিত করে এলাকার গরিব-দুঃখী মানুষকে দান করতেন। কেউ সাহায্য নিতে এসে তার কাছ থেকে খালি হাতে ফেরত যায়নি। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার তিনি বাড়ির পাশে ৯২ শতক জমি কওমি মাদ্রাসা ও মসজিদের নামে দলিলমূলে রেজিস্ট্রি করে দিয়ে রাতেই ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন বলে এলাকার মানুষ জানান।

এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আশরাফুল কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। তিনি একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। কাঁচামাল ট্রাকে করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাতেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তিনি অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র মানুষ ছিলেন। বছরের দুই ঈদে এলাকার গরিব মানুষদের দুই হাত প্রসারিত করে শাড়ি-লুঙ্গিসহ শুকনো খাবার বিতরণ করতেন। গরিব মানুষদের জন্য প্রতি বছর কোরবানির ঈদে একটি গরু কিনে মাংস বিতরণ করতেন। তার কোনো শত্রু ছিল না। ঢাকায় কেন তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো, এর কারণ আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

আশরাফুল কওমি মাদ্রাসার ও মসজিদের নামে দান করা ৯২ শতক জমি দেখিয়ে প্রতিবেশী মতিয়ার রহমান বলেন, ‘এ মানুষটাকে (আশরাফুল) খুন করতে একটুও কলিজা কাঁপল না! যে মানুষটা মঙ্গলবার মাদ্রাসা ও মসজিদের নামে এ জমিটা লিখে দিলেন, মাদ্রাসা স্থাপনের জন্য ৬০ হাজার ইটের বায়না দিলেন, সেই মানুষটাকে ঢাকায় টুকরা টুকরা করে ড্রামের ভরাইলো। তার দোষটা কী ছিল? অত্র এলাকায় দান করাই কি তার অপরাধ ছিল?’

জানা গেছে, আশরাফুলের কোনো ভাই নেই। তার চার বোন আছে। ভাইবোনের মধ্যে আশরাফুল তৃতীয়। তার বাবা আবদুর রশিদ ছিলেন একজন ক্ষুদ্র কাঁচামাল ব্যবসায়ী। ছোট থাকতেই বাবার হাত ধরে কাঁচামাল ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৩ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক মেয়ে ও পাঁচ বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে তার।

বাবা আবদুর রশিদ কিছুটা নির্বাক থাকার পর বলেন, ‘মঙ্গলবার বিকেলে আমাকে হাসপাতালে দেখতে যায় আশরাফুল। সঙ্গে ছিল জরেজ। আমি আশরাফুলকে বলেছিলাম, বাবা আমাকে হাসপাতালে রেখে তুই ঢাকায় যাইস না। এ সময় আমার ছেলেকে ঢাকায় যাইতে জরেজ খুব তাগাদা দেয়। জরেজকে ধরলেই বেরিয়ে আসবে আমার ছেলেকে কারা খুন করেছে। আমি খুনিদের ফাঁসি চাই।’

স্ত্রী লাকী বেগম বলেন, ‘আমার স্বামীর কাছে বিদেশ যাওয়ার জন্য ১০ লাখ টাকা ধার চেয়েছিলেন জরেজ। মঙ্গলবার জরেজ আমার স্বামীকে ঢাকায় নিয়ে যান। এরপর স্বামীকে ফোনে পাই না। তার ফোন ধরেন জরেজ, বলেন আপনার স্বামী ফোন রেখে কালেকশনে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি কি বাচ্চা ছাওয়াল, কিছুই বুঝি না। আমার স্বামীকে খুন করেছে ওই জরেজ। আমি তার কঠোর শাস্তি চাই।’

আশরাফুল হকের শ্যালক আবদুল মজিদ বলেন, ‘বুধবার বিকেলে আমার বোনের সঙ্গে আশরাফুলের কথা হয়। তখন তিনি বলেছিলেন, বাবা হাসপাতালে আছে, তাকে রিলিজ দেবে, টাকা পরিশোধ করে দিছি। বাবাকে নিয়া আইসো। এরপর আশরাফুলের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাকে কল করলে বন্ধু জরেজ ধরে বলেন আশরাফুল ব্যস্ত আছে, কালেকশনে গেছে।’

গতকাল দুপুরে জরেজের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার স্ত্রী উম্মে কুলসুম বলেন, ‘আমার স্বামী ১২ বছর দেশের বাইরে ছিলেন। দেড় মাস আগে বাড়িতে এসেছেন। আশরাফুলের সঙ্গে ছোটকাল থেকে আমার স্বামীর বন্ধুত্ব ছিল। স্বামী বিদেশ থেকে আসার পর আশরাফুল আমাদের বাড়িতে এসে স্বামীকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে তার ব্যবসায়িক কাজে নিয়ে যেতেন।’ তিনি আরও বলেন, গত মঙ্গলবার বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় স্বামী আমাকে বলেছেন, আশরাফুলের ব্যবসায়িক কাজে চট্টগ্রামে যাচ্ছি। এরপর তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হলে তিনি (জরেজ) চট্টগ্রামে পৌঁছেছেন বলে আমাকে জানান। যখন গত বৃহস্পতিবার আশরাফুলের খুন হওয়ার কথা শুনলাম এবং খুনের ঘটনায় আমার স্বামীর নাম আসল, তখন স্বামীকে ফোন দিলাম। স্বামী বলল, আমি খুনের সঙ্গে জড়িত নই, আমাকে চট্টগ্রামে ঘরে রেখে আশরাফুল বেরিয়ে যান। আমি তখন স্বামীকে বাড়িতে আসার অনুরোধ করলে তিনি রাতেই গাড়িতে চড়বেন বলে আমাকে জানান। এরপর থেকে আর স্বামীর সঙ্গে কথা হয়নি। তার ফোনটি বন্ধ পাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে বদরগঞ্জ থানা পুলিশ আমাদের বাড়িতে এসে আমার শ্বশুর আজাদুল মোয়াজ্জেমকে নিয়ে যায়। এ সময় আমার ও বাড়ির আরও দুটি ফোন নিয়ে যায় পুলিশ।’

বদরগঞ্জ থানার ওসি এ কে এম আতিকুর রহমান বলেন, ‘খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়। এ কারণে মামলা হবে ঢাকায়। আমরা একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় এনেছি। ঢাকা থেকে আসা ডিবির টিম তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। আমরা ওই টিমকে সহযোগিতা করছি মাত্র।’

ময়নাতদন্ত সম্পূর্ণ ও পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর: ঢামেক প্রতিনিধি জানান, শুক্রবার বিকেলে আশরাফুল হকের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত করেন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. দীপিকা রায়।

এর আগে মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেন শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাজিবুল আলম। তিনি সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, গলা থেকে নিচ পর্যন্ত ২৫ টুকরো করা হয়। মাথাসহ ২৬ টুকরো লাশ একসঙ্গে মিলিত করে সুরতহাল প্রস্তুত করা হয়েছে। চুল, দাঁত, স্বাভাবিক থাকলেও গলার নিচ থেকে অনেক অংশ মিল ছিল না।

ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়। হাসপাতাল মর্গে আশরাফুলের বোন আনজিরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আশরাফুলের স্ত্রী লাকী গত বুধবার থেকে স্বামীর ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। তবে ফোন ধরে জরেজ জানাতেন, আশরাফুল বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। এজন্য ফোনটি তার কাছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে স্ত্রী লাকী তার ভাইকে নিয়ে বদরগঞ্জ থানায় গিয়ে জানতে পারেন, ঢাকায় ড্রামভর্তি একটি মরদেহ উদ্ধার হইছে। সেই মরদেহ তার স্বামীর কি না খোঁজ নিতে।’

আনজিরা বেগম আরও জানান, তিনি বাড্ডা এলাকায় থাকেন। বৃহস্পতিবার রাতে ফেসবুকে আশরাফুলের একটি ছবি দেখতে পান তারা। সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগ থানায় যান। সেখানে গিয়ে তার ভাই আশরাফুলের খ-িত মরদেহ দেখতে পান।

জানা গেছে, আশরাফুলকে দাফনের জন্য দান করা কওমি মাদ্রাসা ও মসজিদের পাশেই কবর খোঁড়া হয়েছে। এখানেই তার মরদেহ দাফন করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত