মেহনতি মানুষের মুক্তির দিশারি মওলানা ভাসানী

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৩৩ এএম

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আফ্রো-এশিয়া-লাতিন আমেরিকার মানুষের কাছে ‘মজলুম জননেতা’ হিসেবে পরিচিত। তিনি ছিলেন, ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম তৃণমূল রাজনীতিবিদ ও গণআন্দোলনের নায়ক। বেশ কিছু সাধারণ ও স্থানীয় নির্বাচনে জয়ীও হয়েছিলেন, তবে কখনো ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেননি। তার নেতৃত্বের ভিত্তি ছিল কৃষক শ্রমিক জনসাধারণ, যাদের অধিকার এবং স্বার্থরক্ষার জন্য তিনি নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম করে গেছেন। ১৯৪৭-এ সৃষ্ট পাকিস্তান ও ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।  মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়া পল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হাজি শারাফত আলী। ছেলে-মেয়ে বেশ ছোট থাকা অবস্থায় হাজি শারাফত আলী মারা যান। তার ডাক নাম ছিল চেগা মিয়া। পিতৃহীন হামিদ প্রথমে কিছুদিন চাচা ইব্রাহিমের আশ্রয়ে থাকেন। ওই সময় ইরাকের এক আলেম ও ধর্ম প্রচারক নাসির উদ্দীন বোগদাদী সিরাজগঞ্জে আসেন। হামিদ তার আশ্রয়ে কিছুদিন কাটান। মওলানা ভাসানী কর্মজীবন শুরু করেন,  টাঙ্গাইলের কাগমারিতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে। পরে তিনি ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট এলাকার কালা গ্রামে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন।

১৯১৯ সালে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। কংগ্রেসে যোগদান করে, অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে ১০ মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯২৬ সালে তিনি তার সহধর্মিণী আলেমা খাতুনকে নিয়ে আসাম গমন করেন এবং আসামে প্রথম কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। ১৯২৯-এ আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে প্রথম কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেন। এখান থেকে তার নাম রাখা হয় ‘ভাসানীর মওলানা’। এরপর থেকে তার নামের শেষে ‘ভাসানী’ শব্দ যুক্ত হয়। কৃষক আন্দোলনের নেতা হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। তিনি সবসময় রাজনীতি করেছেন কৃষক-শ্রমিক, মেহনতি মানুষের তথা অধিকার বঞ্চিত মানুষের জন্য। তার নেতৃত্বের ভিত্তি ছিল কৃষক-শ্রমিক জনসাধারণ, যাদের অধিকার এবং স্বার্থরক্ষার জন্য তিনি নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম করে গেছেন। এদেশের নির্যাতিত-নিপীড়িত, মেহনতি মানুষের মুক্তির দিশারি ছিলেন। তিনি নারীশিক্ষার একজন দৃঢ় সমর্থক ছিলেন এবং নারীর অধিকার রক্ষায় সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশাপাশি নারীদের অধিকার নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করতেন। তার রাজনৈতিক দর্শনে শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ছিল প্রধান, যার মধ্যে নারীরা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তিনি ইসলামের মানবিক শিক্ষা এবং আধুনিক সমাজতন্ত্রের সমন্বয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের কথা ভাবতেন, যেখানে সব মানুষের, বিশেষ করে মজলুম ও অধিকারবঞ্চিতদের মুক্তি নিশ্চিত হবে। সামগ্রিকভাবে, মওলানা ভাসানী মনে করতেন যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মানুষের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা জরুরি এবং এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন। আজ ১৭ নভেম্বর দেশের রাজনীতি ও গণমানুষের মুক্তির আন্দোলনের এই পথিকৃতের মৃত্যুবার্ষিকী। তার জীবন ছিল গ্রামভিত্তিক এবং ঔপনিবেশিক রীতিনীতির প্রতি আস্থাহীন। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকদের অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। মওলানা ভাসানী ছিলেন মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছিল তার আদর্শিক ঐক্য ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা। তার দীর্ঘ কর্মময় জীবনে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও সমাজ-রাষ্ট্রে তাদের কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নিরলসভাবে করে গেছেন।  বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য শেখ মুজিবের পাশাপাশি যিনি অপরিসীম অবদান রেখেছিলেন, তিনি মওলানা ভাসানী। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে থাকার কারণে ও সরাসরি অংশগ্রহণের জন্য তার মতো একজন মওলানাকে ‘কাফের’ উপাধি দিয়ে বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল পাক বাহিনী। মওলানা ভাসানী ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭২-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক হক-কথা প্রকাশ করেন।

রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সমাজ সংস্কারমূলক কর্মকা-ে জড়িত ছিলেন। জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে মহিপুর হাজী মহসীন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, পরে সেটি জাতীয়করণ করা হয়। আসামে ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কারিগরি শিক্ষা কলেজ, শিশু কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন সন্তোষে। এ ছাড়াও তিনি কাগমারিতে মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ এবং পঞ্চবিবিতে নজরুল ইসলাম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। সন্তোষে ‘মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ যা কিনা ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৩য় স্থানে আছে। তার প্রকাশিত গ্রন্থ : ১. দেশের সমস্যা ও সমাধান (১৯৬২) ২. মাও সে তুং-এর দেশে (১৯৬৩)। দেশ ও জনগণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মরহুম আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর বলিষ্ঠ এবং সাহসী ভূমিকা আমাদের চিরদিন শক্তিশালী এবং আত্মনির্ভরশীল দেশ-সমাজ বিনির্মাণে প্রেরণা ও উৎসাহ জোগাবে। তার প্রদর্শিত পথ ধরে চলতে পারলেই, বহুদলীয় গণতন্ত্রের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে কোনো কঠিন বাধাই আমাদের পথ আগলাতে সক্ষম হবে না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সব স্বৈরশাসকের অপশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা ও দেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশপ্রেমিক মজলুম জননেতা মরহুম মওলানা ভাসানীর অবদান নিঃসন্দেহে স্মরণীয়। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই দেশবরেণ্য নেতা মৃত্যুবরণ করেন। তাকে টাঙ্গাইল জেলার সদর উপজেলার উত্তর-পশ্চিমে সন্তোষ নামক স্থানে পীর শাহজামান দিঘির পাশে সমাধিস্থ করা হয়। সারা দেশ থেকে আগত হাজার হাজার মানুষ তার জানাজায় অংশগ্রহণ করে। মওলানা ভাসানীর ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

লেখক : নারী নেত্রী ও রাজনৈতিক সংগঠক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত