দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কবলে থাকা দেশের শেয়ারবাজার কবে ঘুরে দাঁড়াবে? অজুহাত ও আশ্বাসনির্ভর বাজারটি ভালো করার লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। ফলে হতাশাগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা এবার রাস্তায় নেমেছেন। তাদের দাবি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের অযোগ্যতার কারণে রাস্তায় নামতে হয়েছে। পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকে। প্রতিবাদে গতকাল রবিবার বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের অপসারণসহ আট দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে বিনিয়োগকারীদের ১০টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত জোট। তারা একীভূত পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারমূল্য পুনর্নির্ধারণ, মার্জিন ঋণ বিধিমালা ও মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালার গেজেট বাতিল করার দাবি করেছেন।
বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে পুঁজিবাজারের অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের কিছু করতে না পারলেও সংস্কারের নামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের গলা টিপে ধরা হচ্ছে। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের স্থান হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউজ বা অফিস। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা এখন আর লেনদেনে অংশগ্রহণ করার অবস্থায় নেই। সব হারিয়ে রাস্তায় নেমেছেন তারা।
বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানান ইস্যুতে শেয়ারবাজারে ধস নামে। আবার ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যতিক্রম। সিঁদুরে মেগ। যেকোনো বিষয়ে সংবেদনশীল আচরণ করে। একবার পতন শুরু হলে আর থামে না। অনেকে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনভাবে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু সচেতনতা অবলম্বন করতে গিয়ে অচেতন হয়ে পড়েছে পুঁজিবাজার। দীর্ঘমেয়াদি মন্দা কাটিয়ে শেয়ারবাজারের কবে হুস ফিরবে তা কেউ বলতে পারে না।
এদিকে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় দেউলিয়া হওয়া পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদের তুলনায় দায় বেশি থাকায় সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো সুবিধা ছাড়াই শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে রাতারাতি পথে বসেছেন হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কার্যকর কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না।
সম্মিলিত জোটের বিক্ষোভে বক্তারা বলেন, বর্তমান সরকার ও বিএসইসির কমিশনার এবং চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে পুঁজিবাজারে পতন ঘটছে। পুঁজিবাজারের করুণ দশার জন্য অর্থ উপদেষ্টা এবং বিএসইসির চেয়ারম্যানকে দায়ী করে তার অপসারণ দাবি করেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এ সময় দেশের সব বিনিয়োকারী সংগঠন ও ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের নিয়ে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন উপস্থিত বিনিয়োগকারীরা।
বিক্ষোভ থেকে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের ১০টি সংগঠনকে নিয়ে নতুন জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই ১০ সংগঠন হলো বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ, পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী জাতীয় ঐক্য ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ শেয়ার ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশন, আইসিবি ইনভেস্টরস ফোরাম, পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদ, ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টরস ফোরাম, পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত পরিষদ, পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী স্থিতিশীল পরিষদ এবং বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী কল্যাণ পরিষদ।
জোটের সিনিয়র সমন্বয়ক এসএম ইকবাল হোসেন ৮ দফা দাবি ঘোষণা করেন। দাবিগুলো হলো অযোগ্য ও অদক্ষ বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের দ্রুত অপসারণ, মার্জিন ঋণ বিধিমালা ২০২৫-এর গেজেট দ্রুত বাতিল করা, মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০২৫-এর গেজেটও দ্রুত বাতিল করা, একীভূত হতে যাওয়া পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ারমূল্য বিনিয়োগকারীদের দ্রুত ফেরতের ব্যবস্থা করা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ না করার কারণে এবং পুঁজিবাজার উন্নয়নে ব্যর্থতার দায় নিয়ে বিএসইসির পুরো কমিশনের পদত্যাগ করতে হবে, বিএসইসির ভেতরে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে অপসারণ করা, শেয়ার মার্কেট লুটকারী ও মিউচুয়াল ফান্ড লুণ্ঠনকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তির আওতায় আনা এবং পুঁজিবাজারের অস্থিতিশীলতা নিরসন না হওয়া পর্যন্ত শেয়ার মার্কেটের লেনদেন স্থগিত রাখতে হবে।
