দেশের ওষুধশিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে লাইসেন্সপ্রাপ্তি ও নবায়ন-সংক্রান্ত জটিলতাকে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকার জন্য কাঁচামাল স্বল্পতাকে শিল্পের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই কর্তৃক আয়োজিত ‘স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে। আলোচকরা বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেরও অবদান ছিল অনেক। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যসেবা খাতে সরকারের বরাদ্দ নগণ্য। স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। দক্ষ চিকিৎসক ও নার্সসহ হাসপাতালের সংখ্যাও বাড়াতে হবে বলে মত দিয়েছেন তারা।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান। প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মহাপরিচালক গাজী এ কে এম ফজলুল হক। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ।
সেমিনার থেকে দেশে স্বাস্থ্যসেবা, মেডিকেল ইকুইপমেন্টস এবং ওষুধশিল্পের টেকসই উন্নয়নে যুগোপযোগী নীতিমালা বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন উদ্যোক্তা এবং বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি, বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল ইকুইপমেন্টস ও ওষুধশিল্পের জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্তি এবং নবায়ন প্রক্রিয়া সহজীকরণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে মেডিকেল ইকুইপমেন্টস প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জেএমআই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, যুগোপযোগী একটি নীতিমালা বাস্তবায়ন না করা গেলে দেশে মেডিকেল ইকুইপমেন্টস শিল্পের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই খাতের স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা এবং ইকো-সিস্টেম উন্নয়নে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এপিআই শিল্পপ্রতিষ্ঠার জন্য একজন উদ্যোক্তাকে ৪৭টি সংস্থা থেকে লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হবে, যা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। এই শিল্পের লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজীকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর আহ্বান জানান তিনি।
লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা না গেলে বেসরকারি খাত স্বাস্থ্যসেবা, মেডিকেল ইকুইপমেন্টস এবং ওষুধশিল্পে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করা যাবে না বলে মনে করেন ব্র্যাক হেলথ প্রোগ্রামের ঊর্ধ্বতন পরিচালক মো. আকরামুল ইসলাম।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আসরাফ হোসেন জানান, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর তার দায়িত্ব দ্রুত এবং যথাযথ বাস্তবায়নে সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের জন্য আবেদন করলে তার সম্ভাব্য যাচাই-সংক্রান্ত কাজে কিছু সময় লেগে যায়, ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করা হয় না।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান বলেন, ওষুধশিল্পের লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে সরকার ইতিমধ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চেষ্টা রয়েছে অন্তত তিন বছর মেয়াদের জন্য লাইসেন্স দেওয়ার।
পাশাপাশি, ওষুধশিল্প এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণে সরকারের কঠোর নজরদারির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ওষুধশিল্পের কাঁচামালের স্থানীয় শিল্প স্থাপন এবং আমদানিনির্ভরতা হ্রাসসহ গবেষণা ও উন্নয়নে জোর দেন স্বাস্থ্য সচিব।
দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরে সাইদুর রহমান বলেন, সরকারের একার পক্ষে সব নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এজন্য সরকার, বেসরকারি খাত এবং একাডেমিয়ার মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিডার মহাপরিচালক বলেন, মেডিকেল ইকুইপমেন্টস শিল্পের জন্য স্বতন্ত্র একটি খসড়া নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বিডা, যা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মূল্যায়ন, বিশ্লেষণ এবং পরামর্শের পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবায়ন হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
স্বাগত বক্তব্য দেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান। তিনি বলেন, আয়সীমা অনুযায়ী সব নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চিকিৎসাব্যয় যেন রোগীদের সাধ্যের মধ্যে থাকে, সেই চেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
