বৈশ্বিক উত্তেজনা সংঘাতের বিস্তৃতি উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৫৩ এএম

বর্তমান বিশ্ব এক অভূতপূর্ব এবং বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, সুদান ও মায়ানমারের মতো অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ এই সব মিলিয়ে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের দিকে তাকালে দেখা যায়, সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে এবং এর সরাসরি ফলস্বরূপ মানবিক দুর্বলতা বাড়েছে, যা টেকসই উন্নয়নের (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে তীব্রভাবে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বকে শুধু উষ্ণায়ন, দারিদ্র্য বা বৈষম্যের মতো একক সমস্যার মোকাবিলা করতে হচ্ছে না, বরং এই সংকটগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সংঘাতের বিস্তার : ভূ-রাজনীতির অগ্নিগর্ভ

ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন কেবল পরাশক্তিগুলোর শীতল যুদ্ধের ধারণায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি আঞ্চলিক যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (২০২৫) অনুসারে, সুদান, ইউক্রেন, গাজা এবং মায়ানমারের মতো অঞ্চলগুলোতে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী ও বিভীষিকাময় রূপ নিয়েছে।

সুদান সংকট : সুদানের গৃহযুদ্ধকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যুদ্ধ-পূর্ব জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১২ মিলিয়ন মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এ ছাড়া, এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে।

ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত : গাজা উপত্যকায় ব্যাপক সামরিক আগ্রাসন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে চরমভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই সংঘাতের প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য পথকেও প্রভাবিত করছে। ওওঝঝ এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩-২০২৫ সময়ের মধ্যে সংঘাত-সংশ্লিষ্ট কারণে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি। বহুপাক্ষিকতা দুর্বল হওয়ায় আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবিক সহায়তা প্রদানের নিয়মনীতি প্রায়শই লঙ্ঘিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন বৈশ্বিক সংলাপে বাধা সৃষ্টি করছে, যার ফলে বড় সংকটগুলো সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মানবিক দুর্বলতা : সংকটের সীমাহীন বিস্তার

সংঘাতের এই বিস্তার সরাসরি মানবিক বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করছে। দুর্বলতা কেবল বাস্তুচ্যুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষার মতো মৌলিক ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ছে। ইন্টারসোর্স এবং জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (OCHA)-এর তথ্য অনুযায়ী, মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা এখনকার মতো কখনো বেশি ছিল না।

বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা : জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১২ বছর ধরে ক্রমাগত বেড়েছে, যা ২০২৪ সালের মাঝামাঝি নাগাদ প্রায় ১২৩ মিলিয়নে পৌঁছেছে।

খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা : সংঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী ২৮০ মিলিয়নের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মানবিক সহায়তার চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ক্রমশ কমছে। OCHA 2025  সালের জন্য বিশাল অর্থায়নের আবেদন করলেও, প্রধান দাতা দেশগুলোর অর্থায়ন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে, ত্রাণ সংস্থাগুলোকে সীমিত সম্পদের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।

আঞ্চলিক বাণিজ্য ও শিল্পে প্রভাব : চীন-মার্কিন উত্তেজনা ও ইউরোপের অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশ অস্থির। বাংলাদেশের মতো পোশাক শিল্পনির্ভর দেশগুলো তাদের প্রধান ক্রেতা দেশগুলোতে (যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন) মন্দার কারণে রপ্তানি আয়ে চাপের মুখে পড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন : সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে খাদ্য ও পানির অভাব তৈরি করে বিদ্যমান দুর্বলতাকে আরও জটিল করে তুলছে।UNEP এবং অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ব +1.5°C  উষ্ণায়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি উৎপাদন হ্রাস, বন্যা এবং খরা গ্রামীণ অর্থনীতিকে সংকটাপন্ন করছে, যা দেশীয় মানবিক দুর্বলতা বাড়াচ্ছে।

উত্তরণের উপায় ও বৈশ্বিক দায়িত্ব : এই সংকটময় বিশ্ব থেকে উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক সংহতি এবং নীতিগত কৌশলগত পরিবর্তন অপরিহার্য। বৈশ্বিক সহযোগিতা, শান্তি এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি :

১. টেকসই উন্নয়ন অগ্রাধিকার : সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

২.  শান্তি স্থাপনের কূটনৈতিক উদ্যোগ : সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দেশগুলোকে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিরসন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তি এবং সংঘর্ষের মূল কারণ সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা : বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার বাইরে নয়। ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রপ্তানি বাজারের অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। এই সময়ে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য সরবরাহ শৃঙ্খলকে বহুমুখী করা এবং আমদানি নির্ভরতা কমানো জরুরি। পাশাপাশি, মুদ্রানীতিতে সতর্কতা অবলম্বন করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

বৈশ্বিক উত্তেজনা, সংঘাতের বিস্তার এবং মানবিক দুর্বলতা বিশ্বকে এক সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কেবল মানবিক সহায়তা প্রদান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সংঘাতের মূল কারণগুলোর সমাধান এবং আন্তর্জাতিক কাঠামো পুনর্গঠন। বৈশ্বিক সংহতি, ন্যায়বিচার এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রতি অঙ্গীকারই পারে এই সংকটময় বিশ্বকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনতে।

লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত