খালেদা জিয়া স্থিতিশীল এলেন চীনের চিকিৎসক

থমকে গেছে বিএনপির সব কর্মকান্ড

সুস্থতা কামনা করে মোদির পোস্ট

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:১৪ এএম

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের সর্বশেষ অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তবে জানা গেছে, রবিবার শেষ রাতের দিকে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। এ সময় তার শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হলে অক্সিজেন সাপোর্টে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। গতকাল সোমবার দুপুরে দলের দুয়েকজন নেতা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ‘খুবই ক্রিটিকাল’ কিংবা তিনি ‘ভেন্টিলেশনে’ আছেন উল্লেখ করে গণমাধ্যম এবং ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। বেলা ৩টার দিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, খালেদা জিয়ার অবস্থা স্থিতিশীল, চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তার চিকিৎসা চলছে। আর যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সিসিইউতে আগের মতোই বেগম জিয়ার চিকিৎসা চলছে। কারও বক্তব্যে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় বিদেশ থেকে এসেছেন একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। সন্ধ্যায় তারা এভারকেয়ারের মেডিকেল বোর্ডের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থার বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলটির কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের প্রায় সব রাজনৈতিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। গত ২৩ নভেম্বর হার্ট ও ফুসফুসে সংক্রমণ নিয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। লক্ষণীয় কোনো উন্নতির কথা এখন পর্যন্ত চিকিৎসকরা বলেননি। তারা বারবার জানাচ্ছেন, বেগম জিয়ার স্বাস্থ্য স্থিতিশীল রয়েছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা জানতে গতকাল দুপুরে ও সন্ধ্যায় কথা হয় তিনজন চিকিৎসকের সঙ্গে। একজন চিকিৎসক জানান, চীন এবং আরও দুই-তিনটি দেশ থেকে আসা কয়েকজন চিকিৎসক খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়টি দেখছেন। এর মধ্যে চীনের পাঁচজন চিকিৎসক আছেন। চিকিৎসকরা মেডিকেল বোর্ডের বৈঠকে অংশ নেন। যেখানে যুক্ত হন দেশি-বিদেশি অন্তত দেড় ডজন চিকিৎসক। যুক্তরাষ্ট্র থেকে জন হপকিনস হসপিটালের চিকিৎসক, লন্ডন থেকে লন্ডন ক্লিনিকের চিকিৎসকরা যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া লন্ডন থেকে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান ও পুত্রবধূ ডা. জোবাইদা রহমানও চিকিৎসকদের বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। ঘণ্টা দুয়েক চলে বোর্ডের বৈঠক। সেখান থেকে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হয়।

ওই চিকিৎসক সূত্রের মতে, এখন পর্যন্ত শারীরিক অবস্থা ভালো বলা যাবে না। আবার একেবারে খারাপ তাও বলা যাবে না। মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়াকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। গতকাল দুপুরে একজন চিকিৎসক জানান, ম্যাডামের অবস্থার কিছুটা অবনতি হয়েছে। তবে আইসিইউতে নেওয়া হয়নি। তিনি সিসিইউতেই আছেন।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ইনফেকশনের (সংক্রমণ) শঙ্কায় খালেদা জিয়াকে সিসিইউতে নেওয়া হয়। জানা গেছে, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুর নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। শারীরিক অবস্থা ট্রাভেল করার মতো হলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গতকাল সকালে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ড. রেজা কিবরিয়ার যোগদান অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনারা জানেন, ম্যাডাম অসুস্থ এবং আমাদের চিকিৎসকরা কাজ করছেন, আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। দেশি-বিদেশি সব চিকিৎসককে যুক্ত রেখেই তারা চিকিৎসাটা করছেন। আল্লাহতায়ালার কাছে আমরা সবসময় গোটা দেশবাসী এ দোয়া করছি যে, আল্লাহতায়ালা তাকে যেন সুস্থ করে দেন এবং তিনি যেন আমাদের মাঝে ফিরে আসেন।’

বিভিন্ন গণমাধ্যমে ম্যাডামকে নিয়ে সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে, এটা সঠিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কেউ এতে বিভ্রান্ত হবেন না।’

এক দোয়া মাহফিলে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘এভারকেয়ার হাসপাতালের ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে আগের মতোই ম্যাডামের চিকিৎসা চলছে। দয়া করে যে যাই বলুক, এ ব্যাপারে কারও কথা কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সার্বক্ষণিক ম্যাডামের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত আছেন। তাদের থেকে যতটুকু জানতে পেরেছি, তার চিকিৎসা চলছে, এটাই আপগ্রেড।’

এদিকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলটির কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের প্রায় সব রাজনৈতিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। চলমান রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঘোষিত বিজয় মশাল মিছিল স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় মনোনয়ন-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক আলোচনা আপাতত বন্ধ রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

দলটির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অব্যাহত জটিলতার কারণে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বড় কোনো কর্মসূচি নিতে চাইছে না। এ কারণে সারা দেশে বিএনপির গণসংযোগ কার্যক্রমও প্রায় থেমে গেছে। ক্ষেত্রবিশেষে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা খুব সীমিত পরিসরে সাংগঠনিক যোগাযোগ চালালেও কেন্দ্রীয় নির্দেশনা না থাকায় মাঠপর্যায়ের তৎপরতা নেমে এসেছে ন্যূনতম পর্যায়ে।

স্থায়ী কমিটির এক নেতা বলেছেন, ম্যাডামের শারীরিক অবস্থা আমাদের কাছে এখন সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়। তাকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মুহূর্তে বড় সিদ্ধান্ত বা কর্মসূচি ঘোষণা দল নেওয়ার পক্ষে নয়।

দলীয় নেতারা জানান, চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থায় উন্নতি হলে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির গতি কমে গেলেও দল জুড়ে এক ধরনের আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনায় দেশ জুড়ে দোয়া মাহফিল অব্যাহত রয়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার বিভিন্ন মসজিদ, মন্দির, গির্জা এবং উপাসনালয়ে দোয়া-প্রার্থনার আয়োজন করছে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোসহ বিভিন্ন দল এবং সংগঠনের সংশ্লিষ্টরা। নেতাকর্মীরা গরু, খাসি সদকা করে দোয়া মাহফিল করছেন ও গরিবদের খাওয়াচ্ছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেদের মতো হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নিয়ে এসেছেন। অনেকেই খোঁজ নিতে এভারকেয়ারের সামনে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা, বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান-রাষ্ট্রদূতসহ অনেক জায়গা থেকেই বেগম জিয়ার সুস্থতা কামনা করা হয়েছে।

জানতে চাইলে রিজভী আহমেদ বলেন, ‘খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির নেত্রী নন, তিনি গণতন্ত্রের প্রতীক। তার সুস্থতা না ফেরা পর্যন্ত বিএনপির বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রত্যাবর্তন সময়সাপেক্ষ হতে পারে।’

গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুরে খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনা করে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে রিজভী ছাড়াও নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহাবুবুল ইসলাম মাহবুব, ঢাকা মহানগর উত্তর ড্যাবের সভাপতি ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম প্রমুখ অংশ নেন। দুটি খাসি সদকা দিয়েছেন রিজভী। আশু রোগ মুক্তির জন্য রাজধানীর ওয়ারীতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক প্যানেল মেয়র কাজী আবুল বাশারের উদ্যোগে দোয়া মাহফিল হয়েছে। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন হলে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

সুস্থতা কামনা করে মোদির পোস্ট : বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর পাশাপাশি তার শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে চিকিৎসার যেকোনো প্রয়োজনে ভারত সহায়তা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল সোমবার রাতে নরেন্দ্র মোদি এক্সে এক পোস্টে বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পেরে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের জনগণের জন্য অবদান রেখেছেন। তার দ্রুত আরোগ্য লাভের জন্য আমাদের আন্তরিক প্রার্থনা ও শুভকামনা রইল। আমরা যেভাবে পারি, আমাদের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা প্রদানের জন্য ভারত প্রস্তুত রয়েছে।’

এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়া। তাকে গত রবিবার রাতে ভেন্টিলেশনে নেওয়া হয়েছে। তার অবস্থা ‘খুব ক্রিটিক্যাল’ বলে বিএনপির এক নেতা জানিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত