প্রতিশোধ নিচ্ছে প্রকৃতি

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৩:৫৭ এএম

ঘূর্ণিঝড় ও টানা ভারী বৃষ্টিতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় একটি অংশে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। মালাক্কা প্রণালিতে সৃষ্ট দুটি ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। আর ঘূর্ণিঝড় দিতওয়ার বয়ে নিয়ে আসা ভারী বৃষ্টিতে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধস হয়েছে শ্রীলঙ্কায়। বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত এশিয়ার ৪ দেশে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৫০ জনে। এর মধ্যে শুধু ইন্দোনেশিয়ায় মারা গেছে ৭০৮ জন। ঘূর্ণিঝড় দিতওয়ারের প্রভাবে শ্রীলঙ্কায় ৪৫০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। এছাড়া থাইল্যান্ডে ১৮১ এবং মালয়েশিয়ায় ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় শহর ও গ্রাম কাদায় তলিয়ে গেছে। উদ্ধার তৎপরতায় কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়া

বন্যায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, তিনটি প্রদেশে বন্যার কারণে এখনো নিখোঁজ ৫ শতাধিক মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১১ লাখ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে উত্তর সুমাত্রা ও পশ্চিম সুমাত্রায়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ত্রাণ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। আলজাজিরার প্রতিবেদক জেসিকা ওয়াশিংটন জানিয়েছেন, তিনি উত্তর সুমাত্রা প্রদেশ জুড়ে সর্বত্র ভূমিধস দেখেছেন। উত্তর সুমাত্রার ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি তাপানুলি। ওই এলাকা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি আগেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর সংগ্রহ করেছি। সাধারণত নির্দিষ্ট একটি জায়গায় ভূমিধস সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এবার আমরা যেসব গ্রাম পেরিয়ে এসেছি, সব জায়গায় ভূমিধস হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট ভূমিধস ও ধ্বংসাত্মক বন্যায় ৭০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৪ সালের প্রলয়ঙ্করী সুনামির পর দ্বীপটিতে হওয়া সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্যোগ এটি। এই ব্যাপক দুর্যোগের জন্য দেশটির অনেকেই নির্বিচার বন উজাড়কে দায়ী করছেন, জানিয়েছে রয়টার্স।

সুমাত্রার স্থানীয় বাসিন্দা রেলিওয়াতি সিরেগার তার বাড়ির আশপাশে বন উজাড়ের জন্য রাগতভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা তাপানুলিতে তার বাড়ির কাছে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে সিরেগার বলেন, দুষ্ট হাতগুলো গাছ কেটে নিয়েছে। তারা বনের বিষয়গুলোকে তোয়াক্কা করে না। আর এখন আমরা তার মূল্য দিচ্ছি।

সরকারি তথ্য বলছে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ইন্দোনেশিয়ায় হওয়া মোট মৃত্যুর চার ভাগের একভাগ এই তাপানুলিতেই হয়েছে। তাপানুলির স্থানীয় সরকারপ্রধান গুস ইরাওয়ান পাসারিবু রয়টার্সকে টেলিফোনে বলেন হ্যাঁ, ঘূর্ণিঝড় একটি কারণ, কিন্তু আমাদের বনগুলো যদি ভালোভাবে সংরক্ষিত থাকতো তাহলে এটি এত ভয়ানক হতো না। পাসারিবু আরও জানান, তিনি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রকল্পে জন্য বন ব্যবহারের লাইসেন্স দেওয়ায় বন মন্ত্রণালয় কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, কিন্তু তার আপত্তি গ্রাহ্য করেনি তারা। ইন্দোনেশিয়ার বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের জানানো অনুরোধে সাড়া দেয়নি। পর্যবেক্ষক গোষ্ঠী গ্লোবার ফরেস্ট ওয়াচ জানিয়েছে, ২০০১ সালে ২০২৪ সালের মধ্যে উত্তর সুমাত্রা ১৬ লাখ হেক্টর এলাকা ছেয়ে রাখা বন হারিয়েছে। এটি ওই এলাকা ঢেকে রাখা গাছের ২৮ শতাংশের সমান। আর ২০০১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সুমাত্রা মোট ৪৪ লাখ হেক্টর (এক কোটি ১০ লাখ একর) বন হারিয়েছে, এই এলাকাটি সুইজারল্যান্ডের চেয়েও বড় বলে জানিয়েছেন বন উজাড় পর্যবেক্ষণকারী নুসান্তারা অ্যাটলাসের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড গ্যাভু।

শ্রীলঙ্কা

শ্রীলঙ্কায় প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় দিতওয়ার প্রভাবে টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৪৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৩৩৬ জন। শ্রীলঙ্কায় বন্যা ও ভূমিধসে ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। গত ২৮ নভেম্বর দেশটির প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে এই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের মহাপরিচালক সম্পথ কোটুওয়েগোডা বলেন, দেশটি নজিরবিহীন এক মানবিক সংকট মোকাবিলা করছে। শ্রীলঙ্কার সেই ক্যান্ডি অঞ্চলে ৮৮ জনের মৃত্যু নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এটি দেশটির এক অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা। এখানে নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত দেড়শ মানুষ। ক্যান্ডি অঞ্চলের ২০ হাজারেরও বেশি মানুষকে ১৭৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যে সব এলাকায় ভূমিধস হয়েছে সেখানে মাটিতে চাপা পড়া মৃতদেহ উদ্ধারে শত শত সেনা ও পুলিশ সদস্য কাজ করছেন। পাহাড় থেকে ধসে পড়া মাটি, পাথর ও গাছের ভেঙে পড়া ডালসহ রাস্তায় রাস্তায় জমে থাকা বিভিন্ন আবর্জনা সরাতে কর্র্তৃপক্ষ বুলডোজার ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টেলিযোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতেও কাজ শুরু হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রবল বাতাসে এসব সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

দেশটির মধ্যাঞ্চলের বাসিন্দা নওয়াজ নাশরা স্মরণ করেন কীভাবে তিনি নিজেকে ও তার তিন বছর বয়সী কন্যাকে দুর্যোগের মধ্যে তার বাড়িতে আঘাত হানা ভূমিধস থেকে রক্ষা করেছিলেন। কন্যাকে বিছানার একটি চাদর দিয়ে মুড়ে নিয়ে দৌড়ে ঘর ছেড়ে পালান তিনি। শুক্রবার রাতে নাশরা ও তার সঙ্গে বসবাস করা তার গর্ভবতী বোন পরবর্তী ২০ মিনিট ধরে আলওয়াতুগোদা গ্রামের পাহাড়ের ঢাল দিয়ে নামতে থাকেন, কখনো কখনো হাঁটু পর্যন্ত কাদায় দেবে যায় তাদের পা, পরে আরও নিচে একটি মসজিদে পৌঁছাতে সক্ষম হন তারা। সেখানেই রাতটি পার করেন। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ঘুটঘুটে অন্ধকার, তার মধ্যে আমরা শুধু বজ্রপাতের মতো শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। পাশের বাড়িটা আমাদের চোখের সামনেই ভেঙে পড়ে। কাউকে সতর্ক করার মতো কোনো সময় ছিল না। বন্যায় থাইল্যান্ডে ১৮১ ও মালয়েশিয়ায় ৩ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে সেখানকার কর্র্তৃপক্ষ।

কেন এমন বন্যা ও ভূমিধস

অস্ট্রেলিয়ার সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির এনভায়রনমেন্টাল জিওগ্রাফি বিভাগের অস্থায়ী অধ্যাপক স্টিভ টারটন বলেন, এই অঞ্চলে সাধারণ যে চিত্রটি দেখা গেছে, প্রচুর পরিমাণ বৃষ্টির পানি মোকাবিলা করতে গিয়ে জনগোষ্ঠীগুলো হিমশিম খাচ্ছিল। টারটন বলেন, বিশ্ব জুড়ে যেখানে এ ধরনের ক্রান্তীয় ঝড়প্রবণ আবহাওয়া রয়েছে, সেগুলোকে আপনি টাইফুন, হারিকেন বা ঘূর্ণিঝড় যাই বলুন না কেন, এগুলো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বৃষ্টি ঝরাচ্ছে। আর এটা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। তিনি আরও বলেন, ঘূর্ণিঝড় ‘সেনিয়ার’ ও ‘ডিটওয়া’ এবং টাইফুন ‘কোটো’ বাতাসের গতির কারণে তীব্র ঝড় হিসেবে শ্রেণিভুক্ত না হলেও এগুলো অনেক বেশি বৃষ্টি ঝরিয়েছে। ভারতের ট্রপিক্যাল মেটিওরোলজি ইনস্টিটিউটের জলবায়ুবিজ্ঞানী রক্সি ম্যাথিউ কোল-এর ব্যাখ্যায় বলেন, তুলনামূলক উষ্ণ মহাসাগর ঘূর্ণিঝড়ের চারপাশে শক্তিশালী বৃষ্টিবলয় তৈরি করে। আর তুলনামূলক উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং তা আরও তীব্রভাবে ঝরায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘লা নিনা’ নামের একটি স্বাভাবিক আবহাওয়া চক্র। এই চক্রে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাংশ স্বাভাবিকের চেয়ে ঠান্ডা আর পশ্চিমাংশ উষ্ণ থাকে। এর ফলে বাতাস শক্তিশালী হয়ে এশিয়ার দিকে আরও বেশি উষ্ণ পানি ও আর্দ্রতা ঠেলে দেয়। কোল বলেন, এই ধরন এশিয়ার বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত আর্দ্রতা সঞ্চার করে, যা ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বন্যার ঝুঁকি বাড়ায়। গত সপ্তাহের ঘূর্ণিঝড়গুলোর অন্যান্য অস্বাভাবিক দিকগুলো উল্লেখ করে টারটন বলেন, ঘূর্ণিঝড় ‘সেনিয়ার’ ও টাইফুন ‘কোটো’ কীভাবে একে অপর থেকে শক্তি সঞ্চার করল, সেই বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট গবেষণার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। গ্রান্থাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্ট সম্প্রতি ইম্পিরিয়াল কলেজ স্টর্ম মডেল (আইআরআইএস) ব্যবহার করে এ ধরনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে টাইফুন ‘ফাং-ওং’-এর কেন্দ্র ঘিরে বৃষ্টির পরিমাণ প্রায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত