২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের পর নিজের প্রথম মেয়াদেই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সে সময় থেকেই সুযোগ পেলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করা শুরু করেন তিনি (কখনো প্রশংসা, কখনো খোঁচা)। বিশ্লেষকরা সেটিকে জটিল কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন রূপ বলে অ্যাখা দিয়েছিলেন। এমনকি ট্রাম্পের হয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নির্বাচনের ফলাফলে হস্তক্ষেপের মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছিল। এতকিছু সত্ত্বেও ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্কে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। পরে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজের মসনদে ফেরার পর থেকে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাসহ মস্কো-ওয়াশিংটনের মধ্যে শীতলতা কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এবার ট্রাম্প প্রশাসন শিল্পোন্নত সাত দেশের জোট জি৭-এর বিকল্প হিসেবে রাশিয়াকে নিয়ে পাঁচ দেশীয় একটি নতুন জোট গঠন করতে আলোচনা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিষয়ক সংবাদপত্র পলিটিকো এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে। হোয়াইট হাউজ গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের কিছু অংশ প্রকাশ করে। ওই নিরাপত্তা কৌশলেই পাঁচ দেশীয় নতুন জোট গড়ার এই পরিকল্পনা আছে বলে খবর পাওয়া গেছে। যদিও এ-সংক্রান্ত নথিটি এখনো প্রকাশ পায়নি।
ডিফেন্স ওয়ান নিউজ ওয়েবসাইট জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী, জি৭-এর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা হবে সি৫ জোট (কোর ৫)। এ জোটে থাকবে বিশ্বের ক্ষমতাধর নেতৃস্থানীয় পাঁচ দেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত ও জাপান। জি৭ (কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র)-এর মতো সি৫-ও হবে অনানুষ্ঠানিক ফোরাম বা ক্লাব। তবে এই জোটের সদস্যপদ রাজনৈতিক ব্যবস্থার নিরিখে নির্ধারিত হবে না, বরং দেশগুলোর জনসংখ্যা (১০ কোটির বেশি মানুষ) এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নিরিখে হবে। তাছাড়া, জি৭ জোটের মতো সি৫ জোটও বিশ্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত বৈঠক এবং আলোচনা চালিয়ে যাবে।
সি৫ বৈঠকের আলোচ্যসূচির প্রথমেই প্রাধান্য পেতে পারে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি। বিশেষত, ইসরায়েল এবং সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি। মধ্যপ্রাচ্যকে স্থিতিশীল করার পথে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি আন্না কেলি সি৫-সংক্রান্ত এ ধরনের কোনো নথি থাকার বিষয়টি পলিটিকো পত্রিকাকে নিশ্চিত করে বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সি৫ জোট গড়া হলে তা বর্তমান প্রশাসনের স্বার্থেই কাজ করবে। হোয়াইট হাউজ ডিসেম্বরের শুরুতেই নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করেছে। ৩৩ পৃষ্ঠার এই জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের নথির ভাষায় অনেকটা ক্রেমলিনের বক্তব্যের সুরই অনুরণিত হয়েছে বলে অভিযোগ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের। এই কৌশলপত্রের নথিতে ইউরোপ সভ্যতার দিক থেকে বিলুপ্তির মুখে আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে এতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাশিয়াকে হুমকি হিসেবেও দেখানো হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন সি৫ জোটে রাখা হয়নি ইউরোপকে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের ইউরোপীয়বিষয়ক পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন টোরি টাউসিগ। তিনি বলেন, সি৫ জোট পরিকল্পনায় ইউরোপ না থাকার কারণে ইউরোপীয়রা মনে করতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন রাশিয়াকেই বিশিষ্ট ক্ষমতাধর দেশ হিসেবে দেখে, যাদের ইউরোপের ওপর নিজস্ব প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা আছে।
ন্যাটো প্রধানের সতর্কবার্তা : পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটোর কোনো সদস্য রাষ্ট্রে বছর পাঁচেকের মধ্যেই রাশিয়া হামলা চালাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ন্যাটোপ্রধান মার্কো রুট্টে। জার্মানিতে আয়োজিত এক সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে এ কথা বলেন তিনি। রুট্টে বলেন, রাশিয়া ইতিমধ্যে আমাদের বিরুদ্ধে গোপন অভিযানের মাত্রা বাড়াচ্ছে। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে সেই ধরনের যুদ্ধের জন্য, যা আমাদের পূর্বপুরুষরা দেখেছিলেন। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন সময়ের মূল্যায়নের পুনরাবৃত্তি করলেন রুট্টে, যা মস্কো বরাবরই ‘উদ্বেগ তৈরির অপচেষ্টা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন বলেছিলেন, ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে ইউরোপ যুদ্ধ শুরুর পাঁয়তারা করলে মস্কো যেকোনো সময় প্রস্তুত।
