বিদ্যুৎ ও জ্বালানি স্থাপনায় রুশ হামলা, ভয়াবহ সংকটে ইউক্রেন

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:০১ এএম

শীতের শুরুতেই ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। রাতভর পরিচালিত এই হামলায় বিদ্যুৎ ও শিল্পখাতের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির এক মিলিয়নেরও বেশি পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং এতে একাধিক অঞ্চলে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানা গেছে, অন্তত ৫টি অঞ্চলে এই হামলার প্রভাব পড়েছে। ডিনিপ্রোপেত্রোভস্ক, কিরোভোহরাদ, মিকোলাইভ, ওডেসা ও চেরনিহিভ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। হামলায় কয়েকজন আহত হওয়ার খবরও নিশ্চিত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরুদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনায় অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো রুশ হামলার প্রধান লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে আবহাওয়া শীতল হতে শুরু করায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এসব হামলার মাত্রা আরও বেড়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত। ইউক্রেনীয় নেতৃত্ব জানিয়েছে, সর্বশেষ হামলায় চার শতাধিক ড্রোনের পাশাপাশি কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আধুনিক ও উচ্চগতির ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্র এই অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে, যেগুলো শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে কঠিন।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, ব্যাপক সামরিক তৎপরতার প্রভাবে জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সাময়িকভাবে বাইরের সব বিদ্যুৎ সংযোগ হারিয়েছিল। পরে সংযোগ পুনরুদ্ধার করা হলেও কেন্দ্রটি নিরাপদ রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ যে কতটা জরুরি, তা আবারও সামনে এসেছে। রুশ নিয়ন্ত্রণাধীন এই কেন্দ্রটি বর্তমানে চালু না থাকলেও রিঅ্যাক্টর ঠান্ডা রাখার জন্য বিদ্যুৎ অপরিহার্য।

অন্যদিকে রাশিয়ার সারাতোভ অঞ্চলেও ড্রোন হামলার প্রভাব দেখা গেছে। সেখানকার একটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের উদ্যোগে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা চললেও এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এ সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত জার্মানির বার্লিনে গিয়ে ইউক্রেনীয় নেতৃত্ব ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। সেখানে প্রস্তাবিত শান্তিচুক্তির সর্বশেষ খসড়া নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

বার্লিনের বৈঠকে কোন কোন ইউরোপীয় নেতা অংশ নেবেন, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতির সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। বৈঠকের আগে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের সংশোধিত শান্তি প্রস্তাবও তুলে ধরেছে, যা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক কূটনৈতিক আলোচনা চলছে।

শান্তি আলোচনার সবচেয়ে জটিল ইস্যু হয়ে আছে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় ভূখণ্ড। কিয়েভের অবস্থান স্পষ্ট—দখল হওয়া কোনো এলাকা ছাড় দেওয়ার প্রশ্নে তারা অনড়। বিপরীতে মস্কো জানিয়েছে, ইউক্রেনীয় বাহিনী সরে না গেলে তারা বলপ্রয়োগের পথেই এগোবে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাব নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছে ইউক্রেনীয় নেতৃত্ব। প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট অঞ্চলকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় রেখে সেখানে একটি কার্যত নিরস্ত্রীকৃত পরিস্থিতি তৈরির কথা বলা হয়েছে, যা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শান্তি প্রস্তাবের খসড়ায় ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে দ্রুত অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও স্থান পেয়েছে। ইউক্রেন ইতোমধ্যে সদস্যপদের আবেদন করলেও পূর্ণ সদস্য হতে সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউরোপীয় পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া মিললেও যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত অবস্থান এখনও পরিষ্কার নয়।

সব মিলিয়ে, শীতের শুরুতে বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা ইউক্রেনের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরালো হলেও ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিলতায় শান্তিচুক্তি এখনও অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত