‘মা এখন আর কষ্ট নাই, ডিউটি কম’। গত শনিবার ফোনে মাকে এই কথা বলেছিলেন করপোরাল মাসুদ রানা। এখন মা মর্জিনা বেগম বুক চাপড়িয়ে কাঁদছেন। সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সন্ত্রাসী হামলায় থেমে গেছে সন্তান মাসুদের জীবনযাত্রা।
সুদানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬ শান্তিরক্ষী নিহতের ঘটনায় কাঁদছে দেশ কাঁদছে তাদের পরিবার।
সুদানের আবেই এলাকায় ইউএন ঘাঁটিতে শান্তিরক্ষা মিশনের আওতাধীন কাদুগলি লজিস্টিক বেসে হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬ এবং ৮ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর এবং তার সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। তাদের সবার পরিচয় জানিয়েছে আইএসপিআর।
গতকাল রবিবার দুপুরে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
আইএসপিআর জানায়, সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতাধীন কাদুগলি লজিস্টিক বেসে গত শনিবার স্থানীয় সময় আনুমানিক বিকেল ৩টা ৪০ মিনিট থেকে ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ড্রোন হামলা চালায়। হামলায় দায়িত্বরত ৬ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী শহীদ হন এবং ৮ জন আহত হন। শহীদ শান্তিরক্ষীরা হলেন, করপোরাল মো. মাসুদ রানা, (নাটোর), সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম, (কুড়িগ্রাম), সৈনিক শামীম রেজা, (রাজবাড়ী), সৈনিক শান্ত ম-ল, (কুড়িগ্রাম), মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (কিশোরগঞ্জ) ও লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া (গাইবান্ধা)
আহত শান্তিরক্ষীরা হলেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল খোন্দকার খালেকুজ্জামান, সার্জেন্ট মো. মোস্তাকিম হোসেন, কর্পোরাল আফরোজা পারভিন ইতি, ল্যান্স কর্পোরাল মহিবুল ইসলাম, সৈনিক মো. মেজবাউল কবির, সৈনিক মোসা. উম্মে হানি আক্তার, সৈনিক চুমকি আক্তার, অর্ডন্যান্স ও সৈনিক মো. মানাজির আহসান, বীর (নোয়াখালী)।
আইএসপিআর আরও জানায়, আহত ৮ জন শান্তিরক্ষীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে সৈনিক মো. মেজবাউল কবিরের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় এরইমধ্যে তার সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। অপর আহত ৭ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারযোগে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং তারা সবাই শঙ্কামুক্ত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই নৃশংস হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। শহীদ শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারের এক উজ্জ্বল ও গৌরবময় নিদর্শন হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শহীদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয় এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করা হয় বলেও জানিয়েছে আইএসপিআর।
গ্রামের বাড়িতে শোকের মাতম : ড্রোন হামলায় ৬ বাংলাদেশি মারা যাওয়ার খবর তাদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
নাটোরের লালপুর প্রতিনিধি জানান, লালপুরে সুদানে শহীদ সেনাসদস্য মাসুদের বাড়িতে কান্না আর আহাজারি চলছে। আরবাব ইউনিয়নের বোয়ালিয়াপাড়া গ্রামের সন্তান কর্পোরাল মাসুদ রানা (৩০)। তার মৃত্যুর খবরে পরিবারসহ পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শহীদ কর্পোরাল মাসুদ রানা বোয়ালিয়াপাড়া গ্রামের সাহার উদ্দিনের ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন মাসুদ রানা। তার মেজো ভাই মনিরুল ইসলাম ২০১২ সালে এবং ছোট ভাই রনি আলম ২০১৮ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সর্বশেষ তিনি যশোর ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন। গত ৭ নভেম্বর স্ত্রী আসমাউল হুসনা আঁখি ও আট বছরের একমাত্র কন্যা মাগফিরাতুল মাওয়া আমিনাকে রেখে শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দিতে সুদানে যান তিনি। প্রায় ১৯ বছর ধরে সেনাবাহিনীতে কর্মরত থেকে দেশের জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। শনিবার তার মৃত্যুর খবর প্রথম জানতে পারেন ছোট ভাই সেনা সদস্য রনি আলম। পরে তিনি পরিবারের অন্য সদস্যদের বিষয়টি জানান। খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রাম জুড়ে শোকের মাতম শুরু হয়। বাড়িতে স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। শহীদের মা মর্জিনা খাতুন ছেলের মৃত্যুর খবরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘গতকালই ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল। সে বলেছিল, মা এখন আর কষ্ট নাই, ডিউটি কম। আমাকে ভালো থাকতে বলে আজই চলে গেল।’
স্ত্রী আসমাউল হুসনা আঁখিও স্বামীর মৃত্যুতে শোকে বাকরুদ্ধ। কথা বলতে গিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। প্রতিবেশীরা জানান, মাসুদ রানা ছিলেন শান্ত ও মিশুক স্বভাবের মানুষ। একসময় পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তিন ভাই সেনাবাহিনীতে চাকরি পাওয়ার পর পরিবারে কিছুটা সচ্ছলতা আসে। পরিবারের সুখের স্বপ্ন নিয়েই তিনি শান্তিরক্ষী মিশনে গিয়েছিলেন। শহীদের ছোট ভাই রনি আলম বলেন, ‘দেশের জন্য আমার ভাই শহীদ হয়েছেন এতে আমরা গর্বিত। তবে এই শোক ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।’ লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, ‘ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ পরিবারের পাশে থাকার সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন সৈনিক শামীম রেজা (২৫) । শনিবার রাত ১২ টার দিকে শামীম রেজার মারা যাওয়ার খবর পায় পরিবার। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্বজনরা। এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহত সৈনিক শামীম রেজার গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার মৃগী ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গিতে। তার বাবার নাম আলমগীর ফকির। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে শামীম রেজা ছিলেন সবার বড়। দেড় বছর আগে তিনি বিয়ে করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শামীম রেজা ২০১৭ সালে সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। চলতি বছরের ৭ নভেম্বর তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকে সুদানে যান। রবিবার বিকেলে শামীম রেজার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কালুখালী উপজেলার মৃগী ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গি গ্রামে কলকলিয়া বাজারের পাশেই শামীম শেখের বাড়ি। বাড়িতে প্রবেশ করতেই একটি কাঁচা টিনশেড ঘর। তার পাশেই একটি নির্মাণাধীন একতলা ভবন। উঠান জুড়ে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। ঘরের বাইরে বসে বিলাপ করছেন পরিবারের সদস্যরা। সদ্য নির্মিত একতলা বাড়ির ভেতরে শোকাহত মা ও স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। শোকের ভারে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিদলের সদস্যরা এসেছেন। তারা পরিবারের লোকজনকে সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করছেন। নিহত শামীম রেজার বাবা আলমগীর ফকির কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমার ছেলে দেড় বছর আগে বিয়ে করেছে। এখনো তার কোনো সন্তান হয়নি। কত স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে। অন্তত শেষবারের মতো আমার ছেলের লাশটা দেখতে চাই।’ নিহত সৈনিকের ছোট ভাই সোহান ফকির বলেন, ‘গতকাল টেলিভিশনে সুদানের ঘটনার খবর দেখার পর থেকেই আমরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলাম। ভাইয়ের মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। রাত ১২টার পর আমরা নিশ্চিত হই ভাই আর নেই। গত শুক্রবারই সে বাড়িতে ভিডিও কলে কথা বলেছিল। তখনো কিছু বুঝতে পারিনি।’ শামীম রেজার মৃত্যুর খবরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতারাও শোক প্রকাশ করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। কালুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ( ইউএনও) মো. মেজবাহ উদ্দিন বলেন, আমরা নিহত শামীম রেজার বাড়ি পরিদর্শন করেছি। উপজেলা প্রশাসন সবসময় তার পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করবে। আমি জানতে পেরেছি আগামি ১৭ ডিসেম্বর মরদেহ দেশে আসবে। আগামীকাল (আজ) নিশ্চিতভাবে এই বিষয়ে বলা যাবে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, ড্রোন হামলায় নিহত লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়ার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর ছোট ভগবানপুর এলাকায়। তার বাবার নাম মৃত হাবিদুল ইসলাম। এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে ছোট ভগবানপুর গ্রাম। গতকাল রবিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, বাড়িতে আহাজারি চলছে। আত্মীয়-স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তাদের সান্ত¡না দিতে আশপাশের লোকজন ভিড় করছেন। স্ত্রী নূপুর আক্তার আহাজারি করছেন। বারবার লুটিয়ে পড়ছেন মাটিতে।
নূপুর আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘আমাদের নতুন সংসার। অনেক স্বপ্ন ছিল। সব স্বপ্ন ভেঙে গেল, এখন স্বামীকেই হারালাম। আমি টাকা চাই না, আপনারা আমার স্বামীকে এনে দেন’। এ সময় তার বৃদ্ধা মা ছকিনা বেগম কখনো কাঁদছেন, কখনো সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছেন। তিনি ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে নিজের ভাষায় বলছিলেন, ‘হামার একন্যা ব্যাটা। তাই কিসোক বিদেশোত গ্যালো। বিদেশোত না গ্যালে মরলো না হয়, তোমরা হামার ব্যাটাক আনি দেও’।
সবুজ মিয়ার পারিবারিক সূত্র জানায়, এক ভাই এক বোনের মধ্যে সবুজ মিয়া ছোট। একমাত্র বোন আরফিন বেগমের বিয়ে হয়েছে। সে ঢাকার একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করেন। সবুজ ২০১০ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তাদের কোনো সন্তান নেই। গত ৭ নভেম্বর সবুজ মিয়া সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যান। সবুজ মিয়ার চাচা শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রায় দেড় মাস আগে সবুজ বাড়িতে এসেছিল। সে বিদেশে যাওয়ার আগে বলেছিল, সুদানে শান্তিরক্ষা মিশনে গেলে অনেক টাকা ভাতা পাবে। সেই টাকা দিয়ে বাড়িতে অসমাপ্ত ঘর ঠিকঠাক করবে। বাড়ির জায়গায় বাড়ি থাকল, সে ফিরবে লাশ হয়ে। সবুজের লাশ যেন সরকার দ্রুত আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়। এটাই আমাদের দাবি। পলাশবাড়ী থানার ওসি সরোয়ার আলম খান মুঠোফোনে বলেন, সবুজ মিয়ার গ্রামের বাড়িতে খোঁজ খবর রাখা হচ্ছে। তার লাশ আসতে সময় লাগবে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের নিন্দা : যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে জাতিসংঘের এক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় ছয় শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও আটজন। গত শনিবার দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় করদোফান অঞ্চলের কাদুগলি শহরে অবস্থিত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা লজিস্টিক ঘাঁটিতে এ হামলা হয়। নিহত ও আহত সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
এক বিবৃতিতে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে গুতেরেস বলেন, কাদুগলিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের লক্ষ্য করে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। হতাহতরা জাতিসংঘের ‘ইউনাইটেড নেশনস ইন্টারিম সিকিউরিটি ফোর্স ফর আবেই’ (ইউনিসফা)-এর সদস্য হিসেবে কর্মরত ছিলেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আরও বলেন, দক্ষিণ করদোফানে শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সুদানের সেনাবাহিনী এ হামলার জন্য আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (আরএসএফ) দায়ী করেছে। তবে হামলার বিষয়ে আরএসএফের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে দুই বছরের বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। এক বিবৃতিতে সুদানের সেনাবাহিনী বলেছে, এ হামলা বিদ্রোহী মিলিশিয়া ও তাদের পেছনে থাকা শক্তির ধ্বংসাত্মক মনোভাব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। সেনাবাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে জাতিসংঘের স্থাপনা বলে দাবি করা একটি এলাকায় ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। গুতেরেস সুদানে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংঘাত নিরসনে একটি ব্যাপক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুদানি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সামরিক বাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রাজধানী খার্তুমসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়। এ সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে, যদিও মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। সাম্প্রতিককালে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে করদোফান অঞ্চল, বিশেষ করে আরএসএফ পশ্চিম দারফুর অঞ্চলে সেনাবাহিনীর শেষ ঘাঁটি এল-ফাশার দখলে নেওয়ার পর। এ যুদ্ধের ফলে শহরাঞ্চলগুলো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে এবং সংঘটিত হয়েছে ধর্ষণ ও জাতিগত সহিংসতাসহ ভয়াবহ অপরাধ। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব অপরাধ যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল বিশেষ করে দারফুরে। এ যুদ্ধ বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছে এবং দেশের কিছু অংশকে দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এ হামলার ঘটনা ঘটল এমন এক সময়, যখন মাত্র এক মাস আগে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইউনিসফা শান্তিরক্ষা মিশনের মেয়াদ আরও এক বছরের জন্য নবায়ন করেছে।
দুই বীর সেনাকে হারিয়ে স্তব্ধ কুড়িগ্রাম : সুদানের আবেই অঞ্চলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের একটি ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের ভয়াবহ হামলায় নিহত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয় শান্তিরক্ষীর মধ্যে দুজনের বাড়ি কুড়িগ্রামে। দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ উৎসর্গ করা এই দুই বীর সেনাকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ পুরো কুড়িগ্রাম জেলা। কান্নায় ভেঙে পড়েছে পরিবার, স্বজন ও গ্রামবাসী। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে নিহত দুই সেনাসদস্যের বাড়িতে গিয়ে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর আগে গত শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের আওতাধীন একটি ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীরা আকস্মিক হামলা চালায়। হামলার সময় ঘাঁটির ভেতরে ও আশপাশের এলাকায় তীব্র গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের ছয়জন সদস্য শহীদ হন এবং অন্তত আটজন আহত হন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক পোস্টে জানানো হয়, শনিবার স্থানীয় সময় দুপুর আনুমানিক ৩টা ৪০ মিনিট থেকে ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত কাদুগলি লজিস্টিক বেসে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ড্রোন হামলা চালায়। ওই হামলায় দায়িত্ব পালনরত ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী শহীদ হন।
সেনাবাহিনীর প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী শহীদ শান্তিরক্ষীরা হলেন করপোরাল মো. মাসুদ রানা, এএসসি (নাটোর), সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম, বীর (কুড়িগ্রাম), সৈনিক শামীম রেজা, বীর (রাজবাড়ী), সৈনিক শান্ত মন্ডল, বীর (কুড়িগ্রাম), মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (কিশোরগঞ্জ) এবং লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া (গাইবান্ধা)।
নিহত শান্তিরক্ষী সৈনিক শান্ত মন্ডল (২৬) কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাটমাধাই ডারারপাড় গ্রামের বাসিন্দা। তিনি সাবেক সেনাসদস্য (মৃত) নুর ইসলাম ম-লের ছেলে। তার মা সাহেরা বেগম। বড় ভাই সোহাগ মন্ডলও সেনাবাহিনীতে কর্মরত, বর্তমানে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ল্যান্স করপোরাল পদে রয়েছেন।
গতকাল রবিবার দুপুরে শান্ত মন্ডলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে বাকরুদ্ধ মা সাহেরা বেগম বিছানায় বসে আছেন। বড় ভাই সোহাগ মন্ডলের চোখ লাল হয়ে আছে অঝোর কান্নায়। স্বজন ও প্রতিবেশীরা একের পর এক এসে শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। সোহাগ মন্ডল জানান, শান্ত ২০১৮ সালে সৈনিক পদে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সর্বশেষ তিনি বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন। গত ৭ নভেম্বর শান্তিরক্ষী মিশনে সুদানে যান।
তিনি আরও বলেন, ‘গত এক বছর আগে শান্ত বিয়ে করে। তার স্ত্রী বর্তমানে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শনিবার সন্ধ্যায় শান্ত ভিডিও কলে পরিবারের সবার সঙ্গে কথা বলেছিল। রাত সাড়ে ১০টার দিকে জানতে পারি ওদের ক্যাম্পে হামলা হয়েছে। পরে নিশ্চিত হই, শান্ত আর নেই। আমরা এখন তার লাশের অপেক্ষায় আছি। বাবার কবরের পাশেই তাকে দাফন করতে চাই।’ মাত্র ৩৩ দিন আগে মিশনে গিয়েছিলেন। সন্ত্রাসী হামলায় নিহত আরেক শান্তিরক্ষী সৈনিক মমিনুল ইসলাম, বীর (৩৮) কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার পান্ডুল ইউনিয়নের পারুলেরপাড় গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আব্দুল করিমের ছেলে। তার পরিবারে বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই কন্যা রয়েছে। বড় মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে, ছোট মেয়ের বয়স মাত্র চার বছর।
জানা গেছে, মাত্র ৩৩ দিন আগে শান্তিরক্ষী মিশনে সুদানে যান মমিনুল। গত শনিবার বিকেলে ভিডিও কলে পরিবারের সবার সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলেন তিনি। রাত আনুমানিক ১১টার দিকে তার মৃত্যুর খবর পৌঁছে পরিবারে। মমিনুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকের মাতম চলছে। স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী ও মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। প্রতিবেশী ও স্বজনরা তাদের সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
মমিনুলের বাবা আব্দুল করিম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে খুব ভালো মানুষ ছিল। এলাকার সবাই তাকে ভালোবাসত। আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন বলেই হয়তো শহীদের মর্যাদা দিয়েছেন। এখন শুধু তার লাশের অপেক্ষায় আছি।’
দুই বীর সন্তানের মৃত্যুতে কুড়িগ্রামের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে শোক আর বেদনায়। দেশ ও জাতির জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা এই শহীদদের স্মরণে পুরো জেলায় নেমে এসেছে গভীর নীরবতা।
