শীতের ভোর। কুয়াশায় ঢাকা পরিবেশ। হিমশীতল বাতাসে তিরতির করে কাঁপছে গাছের সবুজ পাতা। ঘুম ভাঙা পাখিদের মিষ্টি কলরবে ঘুম ভাঙল ছোট্ট ফাহিমের। ফ্রেশ হয়ে হালকা নাশতা করে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল সে। প্রতিদিন সে বই নিয়েই স্কুলে যায়। তবে আজ তার বই নিয়ে স্কুলে যেতে হবে না। বরং আজ তার হাতে থাকবে ফুল। কারণ আজ ১৬ ডিসেম্বর, বিজয় দিবস।
ফাহিম লক্ষ করল, পাখিদের কণ্ঠে আজ ভিন্নরকম সুর। কেমন যেন তারাও গাইছে বিজয়ের গান। ফাহিমের মনে কৌতূহল জাগল বাংলাদেশের বিজয় ইতিহাস জানার। তাই সে তার আম্মুকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা আম্মু, আমাদের দেশ কীভাবে বিজয় হয়েছিল?
ফাহিমের অমন প্রশ্ন শুনে তার আম্মু একটু অবাকই হলেন। অতঃপর বললেন, সে তো অনেক লম্বা কাহিনি বাবা। এত বড় ঘটনা বলতে গেলে যে তোমার স্কুলের সময়ই শেষ হয়ে যাবে।
ফাহিম বলল, আম্মু, তাহলে একটু সংক্ষিপ্তভাবেই শোনাও। প্লিজ আম্মু! আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে।
ফাহিমের পীড়াপীড়িতে অবশেষে তার আম্মু রাজি হলেন। তারপর বললেন, আচ্ছা বাবা, শোন তাহলে। আমাদের এই বাংলাদেশ খুবই সুন্দর। মনোরম তার পরিবেশ। সবুজ-শ্যামলে ভরা প্রকৃতি। কবির ভাষায়, বাংলাদেশের মাটি নাকি সোনার চেয়েও খাঁটি। এ দেশ আমাদের মাতৃভূমি। এ দেশের মাটি আমাদের কাছে মা-তুল্য। এমন সুন্দর দেশের প্রতি সবার মনেই তো ভালোবাসা থাকবে, তাই না? এ দেশের জনগণও তাই বাংলাদেশকে খুব ভালোবাসত।
সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিয়ে বেশ ভালোই ছিল দেশের মানুষ। কিন্তু জানো খোকা? পশ্চিম পাকিস্তানিরা ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো ছুটে এলো আমাদের দেশে। দখল করতে চাইল মাতৃভূমিকে। অসহনীয় অত্যাচার আর জুলুম করতে লাগল ওরা বাঙালির ওপর। তাড়িয়ে দিতে চাইল স্বদেশ থেকে।
কিন্তু প্রকৃত সন্তানরা কি কখনো মাকে ছেড়ে যেতে পারে? পারে না। তাই বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরাও ছেড়ে যেতে চায়নি তাদের মাতৃভূমিকে। কারণ বাংলা মায়ের মতো অমন আদর করে কেউ যে তাদের আগলে রাখবে না। তাই দেশ বিজয়ের দৃঢ় সংকল্প নিল তারা। জালিমের বিরুদ্ধে বুক টান করে দাঁড়াল মুক্তিসেনারা। শুরু হলো তুমুল লড়াই। এ লড়াই চলতে থাকল দীর্ঘ নয় মাস।
দেশের জন্য অনেকে ঝরাল দেহের রক্ত। কেউ বিলিয়ে দিল নিজের প্রাণ। সন্তান হারানোর ব্যথায় অশ্রুশিক্ত হলো হাজারো মায়ের চোখ। বোন হারাল ভাইকে আর ভাই হারাল তার বোনকে। এভাবে অসংখ্য বাঙালি ত্যাগ স্বীকার করেছিল স্বদেশ রক্ষার জন্য। অবশেষে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরে স্বাধীন হলো আমাদের এই জন্মভূমি।
প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপন করা হয়। যুগ যুগ ধরে মানুষ এ দেশকে ভালোবেসে যাচ্ছে। এই তো গত চব্বিশের জুলাইয়েও কত মানুষ প্রাণ হারাল দেশের জন্য।
মা ফাহিমকে লক্ষ করে বললেন, ফাহিম, তুমিও এ দেশকে খুব ভালোবাসবে, বুঝলে? প্রয়োজনে দেশের জন্য নিজের প্রাণ বিলিয়ে দেবে। কী, পারবে না?
ফাহিমও বলল, অবশ্যই পারব, আম্মু। তোমার মতোই এ দেশও যে আমার কাছে মায়ের মতো। তাই আমার শহীদ ভাইদের মতো প্রয়োজনে আমিও দেশের জন্য প্রাণ বিলিয়ে দেব।
ছোট্ট ফাহিমের সাহসিকতায় আম্মু খুব খুশি হলেন আর মুচকি মুচকি হাসলেন। এরপর ফাহিম মাকে বলল, ঠিক আছে আম্মু, আমি এখন স্কুলে যাই। সব ছাত্র-শিক্ষকের সঙ্গে আমিও স্মৃতিসৌধে ফুল দেব। এই বলে সে ফুল হাতে নিয়ে দ্রুত স্কুলে গেল।
লেখক : শিক্ষার্থী, দশম শ্রেণি, আওলাকান্দি ই এম উচ্চ বিদ্যালয়, সারিয়াকান্দি, বগুড়া
