জাতীয় দৈনিক, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক ও প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দলের পক্ষ থেকে সহযোগিতা চেয়ে বলেছেন, ‘যে অপশক্তির উত্থান সবাই এখানে আজকে প্রকাশ্যে বলেছেন। সেই অপশক্তির উত্থানটা, ৫ আগস্টের পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত। সেটার একটা স্বরূপ, চেহারা এবং কর্ম গত কয়েক দিন আমরা লক্ষ করেছি, প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং জাতীয় ঐক্যকে ধরে রাখতে হবে এবং জাতীয়ভাবে আমাদের সবাই এ বিষয়টায় যাতে সচেতন হতে পারি। সে বিষয়ে আপনাদের সংবাদপত্র এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখন জাতীয় ঐক্য জাতীয় স্বার্থে ধরে রাখার জন্য আপনাদের সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন, এ ছাড়া হবে না।’
গতকাল রবিবার দুপুরে রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু, ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনের বিএনপির উদ্যোগে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে গণমাধ্যমের সম্পাদক ও নির্বাহী প্রধানের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমের কাছে গঠনমূলক সমালোচনা ও সর্বাত্মক সহযোগিতাও কামনা করেন।
পরে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদদু আলমগীর পাভেল বক্তব্য রাখেন।
যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, ‘সাংবাদিকদের দায়িত্ব সমালোচনা করা... ঠিক আছে কিন্তু প্রশংসা করাও তাদের দায়িত্ব এটা আমার মনে রাখতে হবে। আমি যখন আবার ফিরে পেলাম যায়যায়দিন, আমি সম্পাদক বিভাগকে বলেছি, তোমরা খেয়াল রাখবে একটা ছোটখাটো প্রশংসার কাজও হয় যদি ব্যক্তিগতভাবে সরকারিভাবে ওই কথাটা সম্পাদকীয়তে লিখবে। খালি সমালোচনা করো না। সাংবাদিকদের দায়িত্ব কিন্তু প্রশংসা এবং সমালোচনা দুটো করাই উচিত। আপনাদের অনুরোধ করছি, সাংবাদিক হয়ে যাওয়া মানে ফ্রি লাইসেন্স পেয়ে যাওয়া সরকারের সমালোচনা করা, ইউনূস সাহেবের সমালোচনা এটা কিন্তু নয়। আমি কিন্তু সরকারকে টেনেই বলছি।’
তিনি বলেন, ‘এখানে মাহফুজ সাহেবের (মাহফুজ আনাম) একটা কথা বলতে চাই... উনি চলে গেছেন। আশা করি তার সহযোগী মিস্টার মতিউর রহমান আমার কথাটা তার কাছে পৌঁছে দেবেন। তিনি বলেছেন যে, সাংবাদিক ভুল করতে পারে। ধন্যবাদ এ কথাটা বলার জন্য। সরকারও ভুল করতে পারে, সাংবাদিকও ভুল করতে পারে। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এ ভুলটা স্বীকার করার সাহস থাকতে হবে। মাহফুজ সাহেব বিশাল ভুল করেছিলেন ওয়ান ইলেভেন হওয়ার পর এবং সেই ভুল তিনি কিন্তু টেলিভিশনে সবার সামনে স্বীকার করেছিলেন।’
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘আমি মনে করি, দেশে একটা রাজনৈতিক শূন্যতা রয়েছে, চলছে। এটা একটা বিপজ্জনক এবং সেটা বিএনপির জন্যও কিছুটা কঠিন অবস্থা। আমি সবসময় ভাবতাম বা এখনো মনে করি যে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বেশ একটু আগে যদি আসতে পারতেন তাহলে এ ক্ষেত্রে হয়তো বিএনপি এবং দেশের মধ্যে একটা ভালো সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি হতে পারত। ওনার অনুপস্থিতিটা কিছুটা আপনাদের জন্য প্রশ্ন তৈরি করেছে, কিছু নানারকম বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার সুযোগ হয়েছে। সেটা একটা আপনাদের জন্য নীতিবাচক হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে যদি বলি এই একটা বছর বা ১৫টা মাস ধরেও বিএনপির সব কর্মকাণ্ড নানা স্তরে নানাভাবে নানা ক্ষেত্রে যেভাবে হয়েছে যতটুকু জানি বা যতটুকু জানি না সেটুকু কিন্তু বিএনপির জন্য খুব ভালো হয়নি। সেগুলো এখনো সংশোধন করার ভালো করার সুযোগ সম্ভাবনা আছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এখন পর্যন্ত বিএনপি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ দল, এটা স্বীকৃত। আর আমাদের জরিপ যেটা আমরা করেছি। আমরা এটা বিশ্বাস করি যে, জরিপ এটা মোটামুটি সত্যের কাছাকাছি বা মানুষের চিন্তা জগতের কাছাকাছি। সেখানে বিএনপি কিন্তু বৃহত্তম দল হিসেবে এসেছে এবং নির্বাচনে অনেক বেশি ভোট পেয়ে তারা বিজয়ী হবেন। আমরা এটা বিশ্বাস করতে চাই বা এটা হয়তো আমরা এটা ভাবতে পারি যে, আপনারা ক্ষমতায় আসছেন। ক্ষমতায় আসছেন যে দল, সে দলের নেতৃত্ব সে দলের সব পর্যায়ের নেতৃত্ব কর্মী বাহিনীর সব কর্মকাণ্ডের মধ্যে সেই আচরণ বিনয়ী, সৌজন্য, অভদ্রতার অনেক বেশি করে প্রতিফলিত হওয়া দরকার।’
প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের হামলা-অগ্নিকা-ে সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণি-পেশার মানুষ পাশে দাঁড়ানোর জন্য তাদের প্রতি কতৃজ্ঞতাও প্রকাশ করেন মতিউর রহমান।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আপনারা প্লিজ মনে রাখবেন যে, বাংলাদেশের ৫৩ বছর বয়সে কোনো মিডিয়ার অফিসে আগুন জ্বালানো হয়নি। সর্বপ্রথমবার প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের অফিসে আগুন জ্বালানো, কেন? আমরা কী অপরাধ করলাম? আমি এটা অনুরোধ করব সব মিডিয়াকে যে, সত্যিকার অর্থে আপনারা এটা প্রশ্ন করবেন। তবে ভবিষ্যতের দিকে আমি তাকাতে চাই। আমি সুন্দর একটি সম্পর্ক আমি মিডিয়ার সঙ্গে তুলতে চাই। সেখানে আমার অনুরোধ থাকবে। প্রথমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হচ্ছে স্টেপ ওয়ান। এটা রাজনীতির দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণই অবস্থান হবে। ক্রিটিক্যাল মত প্রকাশের স্বাধীনতা। মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে কিন্তু আপনার আমি সমালোচনা করব সেটা স্বাধীনতা। এখন সালাহউদ্দিন ভাই ইউ আর ভেরি ফ্রেন্ডলি টু মিডিয়া বিকজ ইউ আউট অফ পাওয়ার। আপনি ক্ষমতায় গেলে আপনি কেমন হবেন সেটা আমরা যখন দেখব যে আপনি একই রকম উদার, একই রকমভাবে আপনি গ্রহণ করছেন সমালোচনা। আমাদের এই ৫৩ বছরের রাজনীতিতে বড় অভিজ্ঞতা হলো যে, কোনো সরকার কোনো দিন তারা ক্রিটিক্যাল জার্নালিজম এক্সেপ্ট করেনি।’
তিনি বলেন, ‘আমি আশা করব নতুন বাংলাদেশে এই ক্রিটিক্যাল জার্নালিজম আপনারা নেবেন এবং সেখানে ক্রিটিক্যাল নট অনলি ফর ফ্রিডম অফ জার্নালিজম, ইট ইজ এ চান্স ফর গুড গভর্নেন্স আপনি স্বাধীন সাংবাদিকতাকে আপনি করবেন নারচার করবেন। অবশ্যই আমাদের ইন্টেস্ট কিন্তু আমরা যদি সত্য কথা শুনতে না চাই, আই উইলগ্রেট মিসটেক। আমার অনুরোধ থাকবে যে, নতুন যে বাংলাদেশ আমরা চাচ্ছি, আমরা তারেক রহমানের নেতৃত্বে যেটা ভবিষ্যৎ দেখছি সেখানে যেন ক্রিটিক্যাল জার্নালিজম, ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিডিয়া থাকে।’
মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘একটা অস্থির সময় কঠিন সময়। দেশটা দুভাগে বিভক্ত। বিভাজনের মধ্যে কথা বলাও খুব ডিফিকাল্ট। তবে আজকের এ অনুষ্ঠানে এসে আমার খুবই ভালো লেগেছে। আগামী দিনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে মিডিয়া পলিসি কী হবে সালাহউদ্দিন আহমেদ, রিজভী আহমেদ দুজনের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। আমি খুবই আশাবাদী হতে চাই, আগামী দিনে যদি এর শিকিভাগ বাস্তবায়িত হয়। মিডিয়া পলিসি যেটা বলা হয়েছে, তারা যদি সেটা বাস্তবায়ন করেন তাহলেই বোধহয় বাংলাদেশের মিডিয়া সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘অনেক চ্যালেঞ্জ সামনে। তারেক রহমান এমন এক সময় আসছেন যখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিরাপত্তা। মানুষ নিজেকে নিরাপদ ভাবতে চায়। কিন্তু মানুষ কিন্তু এখন নিরাপদ ভাবতে পারছে না। চারদিকের পরিস্থিতি যেদিক যেভাবে যাচ্ছে আমরা যখন কথা বলছি এখন ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ, দিল্লিতে আমাদের হাইকমিশনারের বাসভবনে হামলা হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছে প্রহরীরা। চারদিকে কিন্তু আমি খবরাখবর যা দেখছি, ডেইলি স্টার, প্রথম আলোর ওপর হামলা হলো, এরপর কী হবে কেউ জানে না। সেই কারণ এ অবস্থায় বিএনপির কাছে মানুষের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি। বিএনপি মানুষের পাশে থাকবে, তারেক রহমান আসবেন সেই প্রতিশ্রুতি দেবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী দিনে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কিন্তু বিপন্ন হতে পারে। যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ না হই। তারেক রহমানের আগমনে বাংলাদেশের চেহারা হয়তোবা পাল্টে যাবে।’
গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব কামাল আহমেদ বলেন, ‘কৌতুক করার অধিকার মানুষকে দিতে হবে। তারেক রহমানকে আমি প্রশংসা করি এই কারণে যে, তিনি একটি দিকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ভবিষ্যতে যাতে আরও কার্টুন হয় এবং সেই কার্টুন হওয়ার কৌতুক করার সুযোগটা থাকে যাতে থাকে আপনাদের মাঠপর্যায়ের সমর্থকরা কিংবা মধ্যম, নিম্নসারির নেতারা যেন তেড়ে না আসেন, সেটাও আপনাদের তাদের শেখাতে হবে। আর যেন নিরাপত্তা সংস্থার থেকে ফোন করে বলা হবে যেকোনো টকশোতে কাকে ডাকা হবে এই চর্চাটা যেন বন্ধ হয়। খুবই আশার কথা যে, ১৭ বা ১৮ বছরের প্রবাসী জীবন থেকে বা নির্বাসিত জীবন থেকে বিএনপির প্রধান তারেক রহমান তিনি আসছেন। ব্রিটেনের গণতন্ত্র কেমন করে কাজ করে? সেটা তার খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হচ্ছে। সেখানে গণতন্ত্র কীভাবে কাজ করে বিশেষ করে পত্রিকা সেটাও তার দেখার সুযোগ হয়েছে। আমরা আশা করব তিনি সেটা এখানে প্রয়োগের সুযোগটা করে দেবেন। আমরা সেটা চর্চা করতে চাই।’
দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলে সামনে ‘মহাবিপদ’ অপেক্ষা করছে এমন সতর্কবার্তা দিয়ে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াবের সভাপতি এ. কে. আজাদ বলেছেন, ‘বিদেশিরা বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছে। নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়, তার ওপর দেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।’
প্রথম আলো, ডেইলি স্টারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে মন্তব্য করে সালাহউদ্দিন আহমদ সরকারের দুর্বলতার কারণেই ‘মবতন্ত্র’ প্রশ্রয় পেয়েছে এবং এটি কঠোর হাতে দমন করা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
এ ঘটনায় সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি ছিল বলে মন্তব্য করেন বিএনপির এ নেতা। তিনি বলেন, ‘এরকম একটা প্রেডিকশন ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে থাকে... আমরাও জেনেছি সে ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট। কিন্তু সেটা আমলে নেওয়া হলো না কেন?’
গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘পত্রিকা হচ্ছে সমাজের দর্পণ। এই মুহূর্তে সমাজের সেই দর্পণ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু সাংবাদিকদের দর্পণ যেন চূর্ণ না হয়। আমরা তো চেয়েছিলাম ডেমোক্রেসি। কিন্তু কেন হয়ে যাবে মবোক্রেসি? তাকে কেন লালন করতে দেওয়া হবে?’ ব্যক্তিতান্ত্রিক বা দলতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রকে বিএনপি উৎসাহিত করবে না বলে জানান তিনি।
সভায় ইনকিলাবের সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দিন, যুগান্তর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, ইউএনবির সম্পাদক মাহফুজুর রহমান, নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহ উদ্দিন বাবর, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের শামসুল হক জাহিদ, দেশ রূপান্তরের কামাল উদ্দিন সবুজসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদসহ কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেন।
