প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় সম্পাদক পরিষদ এবং নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) যৌথ আয়োজনে ‘মব ভায়োলেন্সে আক্রান্ত বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবাদ সভা হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এই প্রতিবাদ সভা হয়। সভায় নোয়াব সভাপতি এ কে আজাদ আগামী জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সারা দেশের সব সাংবাদিককে সঙ্গে নিয়ে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছেন। সভা শেষে হোটেলের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন অংশগ্রহণকারীরা।
সভায় দেশের প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের বরেণ্য নাগরিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
সভায় অংশ নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এটা গণতন্ত্রের ওপর আঘাত। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সরকারের ভেতরের একটি অংশের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সরকারের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেছেন।
সম্পাদক পরিষদ সভাপতি নূরুল কবীর বলেছেন, হামলাকারীরা মধ্যযুগীয় কায়দায় সাংবাদিকদের পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেছেন, সামনের দিনগুলো আরও কঠিন হতে পারে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, সরকার তার বৈধতা অনেক ক্ষেত্রেই হ্রাস করে ফেলেছে।
গণতন্ত্রের ওপর আঘাত : প্রতিবাদ সভায় সংহতি প্রকাশ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আজ প্রথম আলো নয়, ডেইলি স্টার নয় গণতন্ত্রের ওপর আঘাত এসেছে। স্বাধীনভাবে চিন্তা ও কথা বলার অধিকারের ওপর আবার আঘাত এসেছে। আমি সারাজীবন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, কিন্তু আজ যে বাংলাদেশ দেখছি, তা কল্পনার সঙ্গে মেলে না।’ তিনি বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের চিন্তা নয় সব গণতন্ত্রকামী মানুষের এখন এক হওয়ার সময় এসেছে। শুধু একাত্মতা জানালেই চলবে না, রুখে দাঁড়াতে হবে।’
সরকারের একটা অংশের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে : সভায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘হামলার ঘটনার পর আমরা বলেছি, এ ঘটনায় সরকারের ভেতরের একটা অংশের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সমাজে এটার পক্ষে সম্মতি তৈরি করা হয়েছিল অনেক দিন ধরেই এবং এটার সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যাকআপও আছে। এই তিনটি ঘটনা একসঙ্গে না ঘটলে এত বড় সাহস করা কারও পক্ষে সম্ভব হতো না। এটা যে কয়েক হাজার মানুষ গিয়ে ঘটিয়েছে, এ রকমও না। ফলে পুরো ঘটনাটাই পরিকল্পিত ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনাগুলো সম্পূর্ণ পরিকল্পিত অপরাধ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সেøাগান ও শহীদ শরিফ ওসমান হাদির নাম ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে। এতে সরকারের ভেতরের একটি অংশের সংশ্লিষ্টতা, রাজনৈতিক ব্যাকআপ এবং পূর্বপরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।’ এ সময় নাহিদ ইসলাম সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচার নিশ্চিত করতে সরকারকে বাধ্য করার আহ্বান জানান।
জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জামায়াতের : সভায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা এবং আগুন দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে গভীর ষড়যন্ত্র জড়িত মন্তব্য করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, ‘ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ভ-ুল করার জন্য, প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এ ধরনের একটি চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ আমাদের প্রত্যেকের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। কোনো অবস্থায় এটার ওপর হামলা কেউ গ্রহণ করবেন না। আমরা কেউ এটা মেনে নিতে পারি না। এটাই যাতে ফুলস্টপ হয়।’
সরকারের সমালোচনা করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশি, তারা সে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা মনে করি, এখানে অবশ্যই সরকারের দায়িত্ব ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করেছে, সেটা খতিয়ে দেখা উচিত।’
মধ্যযুগীয় কায়দায় পুড়িয়ে মারতে চেয়েছে : সম্পাদক পরিষদ সভাপতি ও নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেছেন, ‘হামলাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল সংবাদমাধ্যমের ভেতরে থাকা মানুষদের হত্যা করা। যখন অফিসে সবাই কাজ করছিলেন, তখন চারপাশ থেকে আগুন লাগানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসকে বাধা দিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় পুড়িয়ে মারতে চাওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমের নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতি থাকতে পারে, সেটি অপছন্দ হলেই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। এ ধরনের সহিংসতা রোধ করা না গেলে শুধু সংবাদপত্র নয়, গোটা সমাজব্যবস্থা ও উন্নতির সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যাবে।’
জানুয়ারিতে মহাসমাবেশের ঘোষণা : নিউজ পেপারস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি এ কে আজাদ অনুষ্ঠানে তার সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ‘আগামী জানুয়ারির মাঝামাঝি সারা দেশের সব সাংবাদিককে সঙ্গে নিয়ে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে মহাসমাবেশ করা হবে। সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এই হামলার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।’
সরকার তার বৈধতা অনেক ক্ষেত্রেই হ্রাস করে ফেলেছে : নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘সরকারের মনে রাখা উচিত, তারা কোনো নির্বাচিত সরকার নয়, বৈধ সরকার হয়তো। একটি অনির্বাচিত সরকারের শাসন করার যোগ্যতা-ক্ষমতা থাকে ততক্ষণ, যতক্ষণ তার নৈতিক বৈধতা থাকে। এ ঘটনার ভেতর দিয়ে বর্তমান সরকারের বৈধতা অনেক ক্ষেত্রেই হ্রাস করে ফেলেছে। এটি যদি তারা পুনঃস্থাপন করতে না পারে, তাহলে আগামী দিনে এই যে উত্তরণের প্রক্রিয়া, অভ্যুত্থানের আদর্শ তারা রক্ষা করতে পারবে কি না সে ক্ষেত্রে সন্দেহ আছে।’
সামনের দিনগুলো আরও কঠিন হতে পারে : প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনা উল্লেখ করে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ‘পরমতসহিষ্ণুতা গড়ে না উঠলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারবে না। বরং সামনের দিনগুলোয় আরও কঠিন হতে পারে।’
সব সরকারের সময়ই দেশে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত আসে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘মতের পার্থক্য যদি আমরা টলারেট (সহ্য) করতে না পারি, তাহলে কিন্তু সামনের দিনে আরও আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
বাংলাদেশে ভিন্নমত দমনের প্রবণতা তুলে ধরে আইসিসির সভাপতি বলেন, ‘আমাদের দেশে বা আরও হয়তো কিছু দেশ আছে, যেখানে গণতন্ত্রের অর্থ হলো আমি যা বলব, সেটাই গণতন্ত্র; তার কোনো প্রতিবাদ করা যাবে না। তার বিরূপ মন্তব্য করা যাবে না। বিরূপ মন্তব্য করলে তাকে খুন, গুম এবং বিভিন্নভাবে সেই মতবাদ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করা হবে।’
সভা পরিচালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। বক্তব্য দেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মানবাধিকারকর্মী রেহনুমা আহমেদ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ড. ইফতেখারুজ্জামান, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি।
স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান ৬ সংগঠনের : প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, ছায়ানট কার্যালয়সহ অন্যান্য সাংবাদিক, সংবাদমাধ্যমকর্মী এবং শিল্পীদের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশি-বিদেশি ছয় মানবাধিকার এবং সাংবাদিক সংগঠন। এসব ঘটনায় জড়িত সব অপরাধী, পরিকল্পনাকারী ও উসকানিদাতাদের যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনগুলো। বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ওপর আঘাতের নিন্দা জানিয়ে গতকাল সোমবার বিবৃতি দেয় সংগঠনগুলো। বিবৃতিদাতারা হলো এক্সেস নাউ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (আইটিজেপি), জার্নালিস্ট ফর ডেমোক্রেসি ইন শ্রীলঙ্কা (জেডিএস) এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট (টিজিআই)।
বিবৃতিতে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে হামলার নিন্দা জানিয়ে বলা হয়, স্পষ্টতই এসব সমন্বিত সহিংসতার ঘটনাগুলো বাংলাদেশের স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী আর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ওপর আঘাত জোরদার হওয়ার বিষয়টি মেলে ধরে। এতে ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সংগঠনগুলো। বিবৃতিতে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকা-ের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনীতিবিদ, অধিকারকর্মী, শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো লক্ষ্যবস্তু করা, বিশেষত ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে যখন রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে, সে সময় আইনের শাসনের অবক্ষয় এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক আলোচনা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের জায়গাগুলো সংকুচিত হয়ে আসা গুরুতর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এতে আরও বলা হয়, ‘এসব ঘটনা এটাই স্পষ্ট করে যে পুনরাবৃত্তিমূলক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অনলাইনে ছড়ানো ঘৃণা ও উসকানির বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর সাড়া দিতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা রয়েছে।
বিবৃতিতে ছয় সংগঠনের পক্ষে সারা দেশে সাংবাদিক, সংবাদমাধ্যম, সংবাদমাধ্যমের কর্মী, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং তাদের কর্মীদের জন্য তাৎক্ষণিক, কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত ও যেখানে বিশ্বাসযোগ্য হুমকি বিদ্যমান, সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এ ছাড়া বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংসতার প্ররোচনার বিরুদ্ধে সক্রিয় আর সময়োপযোগী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন প্রযুক্তি কোম্পানি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানানো হয় বিবৃতিতে।
