দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় দেশ জুড়ে শীতের অনুভূতি বাড়লেও শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে রাজশাহীতে ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুরে ১০ দশমিক ৪, দিনাজপুরে ১০ দশমিক ৫ ও তেঁতুলিয়ায় ১০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা নেমে এলেও কোথাও শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়নি। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, চলতি বছরে হয়তো শৈত্যপ্রবাহ হওয়ার মতো নিচে নামবে না তাপমাত্রা। নতুন বছরের শুরুতে দেশের উত্তরবঙ্গে দেখা দিতে পারে শৈত্যপ্রবাহ।
সাধারণত কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে ওই এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ বিরাজ করে। চলতি মাসে তেঁতুলিয়ায় বিক্ষিপ্তভাবে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলেও আশপাশের কোনো এলাকায় তাপমাত্রা কমেনি। তাই শৈত্যপ্রবাহ হয়নি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে চলতি মাসের শেষার্ধে এক বা দুটি মৃদু বা মাঝারিমাত্রার শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে বলা হয়েছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, ‘চলতি মাসে আর শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। তবে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।’
শৈত্যপ্রবাহ প্রসঙ্গে সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘দেশের কয়েকটি এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলেও আমরা শৈত্যপ্রবাহ বলি না। সাধারণত যদি আশপাশের কমপক্ষে দুটি স্টেশনের তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামে, কমপক্ষে দুদিন এমন নিম্নমুখী তাপমাত্রা অব্যাহত থাকে এবং স্বাভাবিক সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থেকে যদি ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে, তখন আমরা শৈত্যপ্রবাহ বলে থাকি। এ মৌসুমে এখনো এই পরিস্থিতি হয়নি, আগামী বছরের শুরুতে হয়তো তাপমাত্রার পারদ নিচে নামতে পারে।’
এদিকে শৈত্যপ্রবাহ না হলেও কম তাপমাত্রায়, ঘন কুয়াশায় বাড়ছে শীতের অনুভূতি। ভারতের উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, উত্তরাখণ্ড ও বিহার থেকে আসা কুয়াশার চাদর দেশের উত্তরবঙ্গ, সিলেট, ঢাকার উত্তরাংশ হয়ে কুমিল্লা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া কুয়াশায় সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারছে না। এতে দিনের তাপমাত্রা বাড়ছে না বলে শীতের অনুভূতি বাড়ছে।
ঘন কুয়াশার পরিমাপ কী হতে পারে? কীভাবে আমরা বুঝব যে ঘন কুয়াশা পড়ছে? এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় আবহাওয়াবিদদের সঙ্গে। তাদের মতে, দৃষ্টিসীমার দূরত্বের ওপর নির্ভর করে কুয়াশা ঘন না পাতলা হবে। সাধারণত দৃষ্টিসীমা (ভিজিবিলিটি) ১০০০ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত দেখা গেলেই বিমান ওঠানামার অনুমোদন পেয়ে থাকে। এর নিচে নামলেই বিমান ওঠানামায় সমস্যা দেখা দেয়। ভিজিবিলিটির উপাত্ত জানতে কথা হয় ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আবহাওয়া স্টেশনের ইনচার্জ আতিকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ মৌসুমে বুধবার সকাল ৬টা ৩০ মিনিট থেকে ৯টা পর্যন্ত ভিজিবিলিটি ছিল ৮০০ মিটার। যদিও পরবর্তীকালে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিজিবিলিটি বেড়েছে।’
কোথায় কত ভিজিবিলিটি : দেশের ৬২টি আবহাওয়া স্টেশনে ভিজিবিলিটি উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। আবহাওয়াবিদরা জানান, দিনের সবচেয়ে বেশি কুয়াশা থাকে সূর্যোদয়ের সময়। এর কারণ জানতে চাইলে ঢাকা বিমানবন্দর আবহাওয়া স্টেশনের পূর্বাভাস কর্মকর্তা এসএইচএম মোসাদ্দেক বলেন, ‘রাত ৩টার পর থেকেই ঘন কুয়াশা বাড়তে থাকে। তবে এই কুয়াশার সঙ্গে সূর্যোদয়ের সময় একটি লেয়ার যুক্ত হলে কুয়াশার ঘনত্ব দ্রুত বেড়ে যায়। এজন্য সূর্যোদয়ের আগ থেকে শুরু করে সকাল প্রায় ৯টা পর্যন্ত ঘন কুয়াশা বেশি থাকে।’
এদিকে দেশের কুয়াশার ভিজিবিলিটি উপাত্ত নিয়ে থাকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৬২টি স্টেশন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা এসব স্টেশন থেকে কী উপাত্ত পাওয়া গেছে জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক বলেন, বিকেলের তুলনায় সকালে ভিজিবিলিটি সবচেয়ে কম থাকে। উপাত্তে দেখা যায়, গত বুধবার সকাল ৬টায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ও ময়মনসিংহে সবচেয়ে কম ভিজিবিলিটি ছিল। এই দুই স্থানে রেকর্ড হয়েছে মাত্র ২০০ মিটার। অর্থাৎ, সকাল ৬টায় ২০০ মিটারের দূরে আর কিছু দেখা যায়নি।
গতকাল বৃহস্পতিবারের ভিজিবিলিটি কেমন ছিল জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, গতকাল সকাল ৬টায় পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় ভিজিবিলিটি ২০০ মিটারে নেমে এসেছিল। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গের রাজারহাটে ৩০০ মিটার, রংপুরে ৩০০ মিটার ও ময়মনসিংহে ৫০০ মিটার পর্যন্ত ভিজিবিলিটি রেকর্ড হয়েছে।
কখন ঘন কুয়াশা হয় : কুয়াশা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ আতিকুর রহমান বলেন, ‘সূর্য ডোবার পর থেকেই ধীরে ধীরে কুয়াশা বাড়তে থাকে। মধ্যরাতের পর এর পরিমাণ আরও বাড়ে এবং তা সকাল পর্যন্ত বহাল থাকে।’
২৩ বছরের বেশি সময় ধরে ট্রেন পরিচালনা করে আসছেন সিনিয়র লোকোমাস্টার আবদুল আউয়াল রানা। তিনি বলেন, ভোরের দিকে সবচেয়ে ঘন কুয়াশা বেশি দেখা যায়। আর রেললাইনের ওপরে যেন কুয়াশার পরিমাণ বেশি থাকে। এতে অনেকে রেললাইনে বসে থাকলেও ট্রেন দেখতে পায় না এবং ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুবরণের ঘটনা ঘটছে।
রেললাইন ও মহাসড়কে ঘন কুয়াশা প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক বলেন, ‘রেললাইন বা মহাসড়কের উভয় পাশে গাছপালা থেকে। ট্রান্সপিরেশন প্রক্রিয়ায় এসব গাছপালা বায়ুমণ্ডলে পানি ছেড়ে কুয়াশার ঘনত্ব বাড়িয়ে দেয়। আর এ কারণে পার্বত্য এলাকায় উপত্যকাগুলোতে কুয়াশার মতো মেঘ ভেসে থাকতে দেখা যায়।’
ঘন কুয়াশা কতদিন থাকবে : দেশের এই ঘন কুয়াশা কিন্তু আমাদের নয়। এগুলো ভারতের উত্তরাখণ্ড, উত্তর-পূর্ব ঝাড়খণ্ড, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি ও বিহার হয়ে আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে বলে মন্তব্য করেন সাউথ এশিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশ। তিনি বলেন, এই ঘন কুয়াশা আমাদের দেশের উত্তরবঙ্গ, সিলেট, ঢাকার উত্তরাংশ ও কুমিল্লা এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গেছে। তবে তা বড়জোর দেশের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এর বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। কবে নাগাদ এই ঘন কুয়াশা কেটে যেতে পারে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এখনই ঘন কুয়াশা কেটে যাওয়ার সুযোগ নেই। সাধারণত কোথাও বৃষ্টি হলে কিংবা বাতাসের গতিবেগ বাড়লে ঘন কুয়াশা কমে যায়। কিন্তু এই মুহূর্তে তেমন হওয়ার কোনো পূর্বাভাস নেই। তাই কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
একই মন্তব্য করেন সিনিয়র আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ। তিনি বলেন, সাধারণত যেসব এলাকায় ঘন কুয়াশা রয়েছে, সেসব এলাকায় যদি বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হয় কিংবা বাতাসের প্রবাহ বাড়ে তাহলে হয়তো এই ঘন কুয়াশা কেটে যেতে পারে। তবে এখনই ভারতীয় উপমহাদেশের কোথাও বৃষ্টি হওয়ার লক্ষণ নেই, কিন্তু বাতাসের প্রবাহ বাড়তে পারে। সে হিসেবে আগামী দুই থেকে তিন দিন ঘন কুয়াশা থাকতে পারে।
দুই থেকে তিন দিন পর ঘন কুয়াশা কিছুটা কমে আসতে পারে বলে জানান আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ঘন কুয়াশার তীব্রতা কমলেও দেশ জুড়ে স্বাভাবিকভাবেই কুয়াশা থাকবে। উল্লেখ্য, কোনো অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যদি ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, তখন ওই এলাকায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। আর যদি তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয় তখন ওই এলাকায় মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৫ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, তখন তাকে প্রবল শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। দেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল হলেও জানুয়ারি মাস বছরের সবচেয়ে শীতলতম মাস। বছরের এ সময়ে তাপমাত্রা সবচেয়ে কম থাকে। এ সময়ে সাধারণত উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে শীতল বাতাস প্রবেশ করে থাকে।
