২০২৫ সাল আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে রূপান্তরের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই বছরে বিশ্ব ফুটবল একদিকে দেখেছে কিংবদন্তিদের শেষ অধ্যায়, অন্যদিকে উত্থান হয়েছে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের। বড় কোনো বৈশ্বিক আসর বা টুর্নামেন্ট না থাকলেও ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বিদায়ী বছরটি ছিল প্রস্তুতি, পুনর্গঠন ও পরীক্ষার বছর।
বিদায়ী বছরের শুরুতেই আলোচনায় চলে আসে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। স্পেনকে পরাস্ত করে দ্বিতীয়বার উয়েফা নেশনস লিগ জয়ের গৌরব অর্জন করে দেশটি। রোনালদোর হাতে ওঠে আরেকটি শিরোপা। এছাড়া অনূর্ধ্ব-১৭ ইউরো ও অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটসাল ইউরোতেও পর্তুগাল চ্যাম্পিয়ন হয়। জাতীয় দল এবং ক্লাব মিলিয়ে গোলের পর গোল করে গেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। হাজার গোলের পথে ছুটতে থাকা পর্তুগিজ মহাতারকার গোলসংখ্যা বছর শেষে ৯৫৪টি। দুর্দান্ত পারফরমেন্সের সৌজন্যে সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসর তার সঙ্গে ২০২৭ সাল পর্যন্ত চুক্তি নবায়নও করেছে। আগামী ২০২৬ বিশ্বকাপে সিআর সেভেনকে দেখা যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। ম্যানেজার রবার্তো মার্তিনেজের বিশ্বকাপ পরিকল্পনাতেও বেশ ভালোভাবেই আছেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর-জয়ী।
ক্লাব ফুটবলে এই বছর বড় ঘটনা ঘটিয়ে দিয়েছে পিএসজি। বছরের পর বছর বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিশ্বের বাঘা বাঘা সব তারকাকে নিয়েও প্যারিসের ক্লাবটি ইউরোপ-সেরার মুকুট পরতে পারেনি। তবে লিওনেল মেসি, নেইমার কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো বড় কোনো নাম ছাড়াই এ বছর তারা চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে নেয়। গত জুনে অনুষ্ঠিত ফাইনালে তারা ইন্টার মিলানকে ৫-০ গোলে হারিয়ে ইউরোপের সেরা দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। যদিও এক মাস পর এই পিএসজিকেই ৩-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নেয় চেলসি। বছর জুড়ে ৬টি শিরোপা জিতেছে পিএসজি। লুইস এনরিকের অর্জনের তালিকায় একে একে যুক্ত হয়েছে ফরাসি কাপ, লিগ আঁ, ফরাসি কাপ, উয়েফা সুপার কাপ, ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপের শিরোপা। দলের সাফল্যের আবহে ব্যক্তিগত অর্জনও সমৃদ্ধ হয়েছে। প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতে ফুটবল বিশ্বে নিজেকে জানান দিয়েছেন উসমান দেম্বেলে। অন্যদিকে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পার ৪১ বছরের শিরোপা-খরা ঘুচিয়ে জিতেছে ইউরোপা লিগের শিরোপা।
২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বেও ছিল চমক আর চমক। ফিফা বিশ্বকাপের কোনো আসরে এবারে প্রথমবারের মতো খেলবে কেপ ভার্দে। মাত্র ৫ লাখ ২৫ হাজার জনসংখ্যার দেশটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলা জনসংখ্যার হিসাবে দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। আর সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে আগামী বিশ্বকাপে খেলবে কুরাসাও। কনক্যাকাফ অঞ্চলের এই দেশটির জনসংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার এবং আয়তন মাত্র ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার। এ ছাড়া প্রথমবার ফিফা বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে জর্ডান ও উজবেকিস্তান।
বছরের মাঝামাঝি ফুটবল বিশ্বের সমস্ত আলোচনা কেন্দ্রীভূত হয় কার্লো আনচেলত্তিকে ঘিরে। ‘ডন’ কার্লো নামে বিখ্যাত ইতালিয়ান এই কোচ রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে ব্রাজিল জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন। সান্তিয়াগো বার্নাব্যু থেকে তাকে আবেগঘন বিদায় দেয় রিয়াল মাদ্রিদ। কাতার বিশ্বকাপের পর থেকেই আনচেলত্তিকে পাওয়ার চেষ্টায় ছিল ব্রাজিল। প্রায় তিন বছর পর অবশেষে তারা সফল হয়। মুমূর্ষু ব্রাজিল আনচেলত্তির ছোঁয়ায় যেন দ্রুত বদলাতে থাকে। হারতে হারতে খাদের কিনারায় চলে যাওয়া দলটি পায় জয়ের দেখা। নিশ্চিত করে আগামী বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলা। তবে আনচেলত্তির দলে এখনো ঠাঁই হয়নি সুপারস্টার নেইমারের। সম্প্রতি চোটাক্রান্ত এই তারকার হাঁটুতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তিনি ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে আনচেলত্তির বিশ্বকাপ পরিকল্পনায় আপাতত নেইমারের জায়গা হয়নি। তাকে পারফরমেন্সের পাশাপাশি শতভাগ ফিট হওয়ার কঠোর শর্ত দিয়েছেন আনচেলত্তি। খ্যাতিমান এই কোচ অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের মিশেলে তৈরি করছেন আগামী বিশ্বকাপের রণপরিকল্পনা। এদিকে নেইমারের ক্লাব ক্যারিয়ার নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা। ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সান্তোস তাকে ধরে রাখবে কি না সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। নেইমারের প্রতি ইউরোপিয়ান কিছু ক্লাবের আগ্রহের কথা শোনা গেলেও সেটা গুঞ্জনের পর্যায়েই আছে।
ফুটবলের আলোচনায় অবধারিতভাবেই আসবেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাজপয়ী অধিনায়ক চোটাঘাত সামলেও এ বছর জাতীয় দল ও ক্লাবের হয়ে দুর্দান্ত পারফরমেন্স দেখিয়েছেন। মেজর সকার লিগের (এমএলএস) ২০২৫ মৌসুমে সর্বাধিক ২৯ গোল ও ১৯ অ্যাসিস্ট করে জিতে নিয়েছেন গোল্ডেন বুট। একই মৌসুমে তার ক্লাব ইন্টার মায়ামি এমএলএস কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়, যা মেসির ক্যারিয়ারের ৪৮তম শিরোপা। এ বছর এমএলএস নিয়মিত মৌসুমের শেষ দিনে ন্যাশভিলের বিপক্ষে তিনি হ্যাটট্রিকও করেছিলেন। এছাড়া প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এমএলএসে টানা পাঁচ ম্যাচে গোলে অবদান রাখার রেকর্ডও গড়েন। এ বছর তিনি মোট ৪৯টি ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ৪৩টি, আর অ্যাসিস্ট করেছেন ২৮টি। যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাবটির সঙ্গে তার চুক্তি নবায়ন হয়েছে ২০২৮ সাল পর্যন্ত। তবে পারফরমেন্স ছাপিয়ে বছর জুড়ে আলোচনা ছিল মেসি আগামী বিশ্বকাপে খেলবেন কিনা? আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী কোচ লিওনেল স্কালোনি বিষয়টি পুরোপুরি মেসির ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তবে গণমাধ্যমের সামনে বারবার এলেও আগামী বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে পরিষ্কারভাবে কিছু বলেননি মেসি। বছরের শেষ দিকে মায়ামি সতীর্থ লুইস সুয়ারেজ এবং রদ্রিগো ডি পলকে নিয়ে মেসি ভারত সফরে এসেছিলেন। তাকে ঘিরে কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে তুলকালাম ঘটে যায়। গ্রেপ্তার করা হয় এই সফরের উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তকে। তবে ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতে মেসির সফর সুষ্ঠুভাবেই সম্পন্ন হয়।
এ বছর মেসি-রোনালদোদের ছাপিয়ে বারবার সব আলো নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছেন এই প্রজন্মের দুই তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আর্লিং হালান্ড। বহুল আলোচনার জন্ম দিয়ে পিএসজি থেকে রিয়াল মাদ্রিদে আসা এমবাপ্পে ক্রমেই গোলমেশিন হয়ে উঠেছেন। বছরের শেষ ম্যাচে সেভিয়ার বিপক্ষে গোল করে ছুঁয়েছেন তার আদর্শ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর এক ক্যালেন্ডার বছরে সর্বাধিক ৫৯ গোলের রেকর্ড। ২০১৩ সালে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে মৌসুমে সর্বাধিক গোল করার এই রেকর্ড গড়েছিলেন রোনালদো। পুরো বছরে ৫৮টি ম্যাচ খেলে ১১টি জোড়া গোল করার পাশাপাশি ৪টি হ্যাটট্রিক এবং এক ম্যাচে একাই ৪ গোল করার অসাধারণ কীর্তি দেখিয়েছেন এমবাপ্পে। ইউরোপের শীর্ষ গোলদাতা হিসেবে জিতেছেন ক্যারিয়ারের প্রথম গোল্ডেন বুট। লা লিগার চলতি মৌসুমে ইতিমধ্যেই ১৮ গোল করে আছেন শীর্ষস্থানে। যদিও তার দল রিয়াল মাদ্রিদ খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। অন্যদিকে ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন খ্যাত আর্লিং হালান্ড এ বছর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে দ্রুততম সময়ে শততম গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। এতে তার লেগেছে ১১১ ম্যাচ। এতদিন এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার অ্যালান শিয়েরার। তিনি প্রিমিয়ার লিগে ১২৪ ম্যাচে শততম গোল করেছিলেন। চলতি মৌসুমে ১৪ ম্যাচে ইতিমধ্যে ১৫ গোল করে ফের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পথে আছেন ২৫ বছর বয়সী নরওয়েজিয়ান তারকা।
বার্সেলোনার নতুন স্প্যানিশ সেনসেশন লামিন ইয়ামাল এ বছর জিতেছেন লা লিগা। ব্যক্তিগত অর্জনে জিতেছেন সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার এবং ব্যালন ডি’অর পুরস্কারের লড়াইয়ে হয়েছেন রানার্সআপ। গড়েছেন সর্বাধিক জার্সি বিক্রির নতুন রেকর্ড। বছরের শেষভাগে এসে তুমুল বিতর্কের জন্ম দেওয়া লিভারপুলের মিসরীয় তারকা মোহাম্মদ সালাহও কম যাননি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে এখন নির্দিষ্ট কোনো ক্লাবের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোলে অবদানের নতুন রেকর্ড গড়েছেন। অ্যানফিল্ডের ক্লাবটির হয়ে ২৭৭টি গোলে অবদান রেখেছেন, যাতে আছে ১৮৮ গোল এবং ৮৯টি অ্যাসিস্ট। এতদিন এই রেকর্ড ছিল সাবেক ইংলিশ ফরোয়ার্ড ওয়েন রুনির। তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে ১৮৩ গোল ও ৯৩টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন। বছর শেষে লিডস ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচের শুরুর একাদশে জায়গা না পেয়ে তিনি কোচ আর্নে সøটকে উদ্দেশ্য করে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘আমাকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে’। এই ঘটনায় তিনি লিভারপুল স্কোয়াড থেকে বাদ পড়লেও পরে ক্ষমা চেয়ে ফিরে আসেন। সালাহর সেই বিতর্ক দিয়েই শেষ হয় ঘটনাবহুল ২০২৫ সাল।
