এখনো বিভ্রান্তিতে ভোটাররা গণভোট প্রচারে উদাসীনতা

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:২৪ এএম

দেশে চতুর্থবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গণভোট। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার গণভোটের সিদ্ধান্ত নিলেও মাঠপর্যায়ে ভোটারদের সচেতন করতে প্রচার-প্রচারণায় স্পষ্ট ঘাটতি চোখে পড়ছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার-প্রচারণায়ও গণভোট যেন প্রায় অনুপস্থিত।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের গণভোটগুলোর সঙ্গে এবারের গণভোটের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। গণভোটের বিষয়ে সরকারের যেমন ‘ম্যাসিভ প্রচারণা’ করতে হবে। তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। না হলে গণভোট গুরুত্ব হারাবে।

নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, গণভোট প্রচারের দায়িত্ব সরকারের। রাজনৈতিক দলগুলোরও প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেওয়া উচিত বলে মনে করি। তবে এখন পর্যন্ত আমরা দেখছি, মূলত সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও তথ্য মন্ত্রণালয়ই এই দায়িত্ব পালন করছে।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা ও তদারকি করে, আর সরকারের এই দুটি বিভাগ গণভোট সংক্রান্ত প্রচারণার কাজ করছে। আমাদের পক্ষ থেকেও কিছু প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের প্রচার-প্রচারণা রয়েছে, তবে তা সীমিত পরিসরে।

ইসি সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, যদি মাঠপর্যায়ে প্রচার কার্যক্রম পর্যাপ্ত নয় বলে মনে হয়, তাহলে সে বিষয়টি আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানাতে পারি। যাতে তারা প্রচার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করে। রাজনৈতিক দলগুলোকে এই প্রচারে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আমার জানা নেই। এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা এখনো হয়নি। তবে এটি একটি ভালো প্রস্তাব। এটা সংশ্লিষ্টদের জানানো যেতে পারে।

গণভোটের প্রচারের বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মাহবুবা ফারজানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশের ৬৪টি জেলা ও চারটি উপজেলায় তথ্য কর্মকর্তা রয়েছেন। গণভোট বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা একেবারে লামা ও বান্দরবান পর্যন্ত চলে গেছে। একইভাবে দেশের উত্তর প্রান্ত তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আমাদের প্রচার কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে।

রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে গণভোটের বিষয়ে তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা নেই। অনেক ভোটার গণভোট সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না। ঢাকা-১২ আসনের কামরাঙ্গীরচরের রহমতবাগ এলাকার বাসিন্দা শাহিন আলম (৪৮)। পেশায় মুদি দোকানদার। সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিলেও পরবর্তী নির্বাচনে ভোট দেননি তিনি। আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেবেন কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ভোট তো অবশ্যই দিতে যাব। পরিবারের সবাইকে নিয়েই যাব।

তবে গণভোট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কিছুটা দ্বিধায় পড়েন। তিনি বলেন, শুনেছি এবার গণভোট হবে। টিভিতে আলোচনা শুনেছি। কিন্তু ভালো করে বুঝি না।

সরকারের পক্ষ থেকে গণভোট নিয়ে কোনো প্রচার দেখেছেন কি না জানতে চাইলে শাহিন আলম বলেন, এলাকায় তো এমন কিছু দেখি না। তবে প্রার্থী ও দলের পক্ষ থেকে অনেকে ভোট চাইতে আসেন। তারা শুধু মার্কা আর প্রার্থীর কথাই বলেন।

একই এলাকার আরেক বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম (২৮)। স্থানীয় একটি কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। গণভোট নিয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি সোজাসাপ্টা বলেন, গণভোটের বিষয়ে আমি তো কিছুই জানি না। ভোট দিতে যাব পছন্দের মার্কায় ভোট দিয়ে আসব।

ঢাকা-১২ আসনের নিউ ইস্কাটন এলাকার দিলু রোডের বাসিন্দা ও ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী ফারজানা ইসলাম এবারই প্রথম ভোটার হয়েছেন। গণভোটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গণভোট হবে জানি। তবে গণভোট নিয়ে মহল্লায় কোনো প্রচার-প্রচারণা দেখিনি। গণভোট নিয়ে টিভিতে সংবাদ দেখেছি। নেগেটিভ না পজিটিভ সেটা জানি না। ভোটের আগে জেনে নেব।

একই এলাকার ভোটার আশরাফুল ইসলাম বলেন, আগেও গণভোট হয়েছে। কিন্তু এবার প্রথমবার এর সাক্ষী হব। আমার মনে হয় গণভোট সম্পর্কে খুব বেশি মানুষ জানে না। কারণ এর পক্ষে তেমন প্রচার নেই।

প্রায় দুই যুগ পর দেশে চতুর্থবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গণভোট। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার মধ্যে গণভোট একটি। যদিও এ নিয়ে শুরুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক শুরু হয়। বিএনপিসহ বেশ কিছু দলের দাবি ছিল, জাতীয় নির্বাচনের পর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তবে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বেশ কিছু দল জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দাবি করেছে। এ নিয়ে সভা-সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন একযোগে নির্বাচনের ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা করেন।

নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে গণভোট নিয়ে মক ভোট, ব্যানার, লিফলেটসহ, উঠান বৈঠক ও তথ্য অফিসগুলোর উদ্যোগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণভোটে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করতে নানা কর্মসূচি নেওয়া হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ভিন্ন। দলগুলো নিজ নিজ দলের পক্ষে প্রচারে ব্যস্ত থাকলেও গণভোট নিয়ে তাদের তৎপরতা প্রায় নেই বললেই চলে।

গণভোটের প্রচার-প্রচারণার ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে ডিসি-এসপি, বিভাগীয় কমিশনার ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্মেলনে। এ সময় বেশ কয়েকজন জেলা প্রশাসক বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা যথেষ্ট নয়।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলিম বলেন, আগের গণভোটগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এবার সেটা নাও থাকতে পারে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে একটি ব্যাপক ও পরিকল্পিত জনসচেতনতা কর্মসূচি নেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের গণভোটে ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র ২৯ শতাংশ। এবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট যুক্ত হওয়ায় টার্নআউট বাড়বে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভোটাররা সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে আসবেনই। ফলে গণভোটে ভোট দেওয়া কার্যত এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। এটি একটি কৌশলগত প্লাস পয়েন্ট।

জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত টার্নআউট বাড়াতে সহায়ক হলেও, ভোটারদের সচেতনতা ছাড়া সেই অংশগ্রহণ কতটা অর্থবহ হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করেন এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা এবং সাধারণ ভোটারদের অজ্ঞতা নির্বাচন ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) সভাপতি মুনিরা খান বলে, গণভোট সফল করতে হলে অবশ্যই প্রচার করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু এখনো দলগুলো প্রার্থী ঠিক করা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে, যখন মূল ভোটের প্রচার-প্রচারণা শুরু হবে তখন গণভোটের বিষয়টিও সামনে চলে আসবে। আমার প্রত্যাশা সরকারের পাশাপাশি প্রার্থীরা গণভোটের বিষয়ে জনগণকে সচেতন করবেন।

প্রসঙ্গত, গণভোট করতে চারটি বিষয়ের ওপর প্রশ্নটি নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রশ্নগুলো হলো  ১. নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। ২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। ৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। এবং ৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে সাধারণ মানুষ তাদের মতামত জানাবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত