শীতে পুরনো পোশাকের কদর

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:১৩ এএম

শীত আসলেই আমদানি করা পুরনো পোশাকের চাহিদা বাড়ে। দেশের নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের নজর থাকে ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ দোকান কিংবা গাইডে। তবে এই চিত্র এখন পাল্টে গেছে। এখন আর পুরনো কাপড়ের সেই বাজারটা নেই। একদিকে আমদানি ও আমদানিকারক কমেছে অন্যদিকে দেশেই তৈরি হচ্ছে কমদামে শীতবস্ত্র। ফলে বাজারে পুরনো শীতবস্ত্রের চাহিদা নেমে এসেছে অর্ধেকে। খাতসংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য জানা গেছে।

পুরনো কাপড় আমদানিকারকরা বলছেন, আমদানি জটিলতা ও সরকারের নির্দেশনা পরিপালনের কারণে এখন আর পুরনো কাপড়ের সেই বাজার নেই। পুরনো শীতবস্ত্রের চাহিদা নেমে এসেছে অর্ধেকে। যে কেউ চাইলে এই কাপড় আমদানি করতে পারে না।

সরকারের আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের তথ্য মতে, আমদানি আদেশ ২০১৫-২০১৮ ও ২০২১-২০২৪ অনুসারে, বর্তমানে আমদানিকারকরা ২ টন পুরনো কম্বলের পরিবর্তে আমদানি করছেন ১ টন; এ ছাড়া সুয়েটার, লেডিস কার্ডিগান, জিপার জ্যাকেটসহ পুরুষের জ্যাকেট এবং পুরুষের ট্রাউজার ৬ টনের পরিবর্তে বর্তমানে আমদানি হচ্ছে ৩ টন করে। ২ টন সিনথেটিক ও ব্লেন্ডেড কাপড়ের শার্ট এখন আমদানি করতে পারেন ১ টন করে।

ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একদিকে দেশের বাজারে পুরনো পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়া, অন্যদিকে সরকারের বিধিনিষেধ কঠোর করার কারণে এ ধরনের কাপড় আমদানি কমেছে। এ ছাড়া এখন দেশেও তৈরি হচ্ছে ভালোমানের শীতবস্ত্র। আগে কম দামের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলে পুরনো কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা ছিল। এখন দেশে উৎপাদিত শীতবস্ত্রই কম দামে মিলছে। তাই চাহিদা থাকছে না আমদানি পুরনো কাপড়ের।

গত শনিবার রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন, গুলিস্তান, নিউমার্কেট ও ফার্মগেট ঘুরে দেখো গেছে, অনেকে রাস্তার পাশের হকারদের কাছ থেকে গরম জামা কিনছেন। পুরানা পল্টনের মৌসুমি ব্যবসায়ী আরমান হোসেন। এই মৌসুমে তিনি ফুটপাতে কম্বল ও পর্দা বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, ‘ব্যবসা আগের মতো নেই। তিন থেকে পাঁচ বছর আগে আমি দিনে অন্তত ২০ থেকে ২৫টি কম্বল বিক্রি করতাম। এখন আমি ১০টিও বিক্রি করতে পারি না।’

মতিঝিলের কাপড় ব্যবসায়ী আফজাদ হোসেন বলেন, ‘শীত না থাকলেও আমরা নভেম্বর থেকে বেল সংগ্রহ করে ভালোমানের কাপড়গুলো দোকানে উঠাই। অল্প-স্বল্প বিক্রি আছে। তবে গত বছরের তুলনায় বিক্রি নেই।’

তিনি আরও বলেন, এখন পুরনো কাপড়েরও দাম বেশি। সুয়েটার, লেডিস কার্ডিগান, জিপার জ্যাকেট মানভেদে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার কমে পুরনো কাপড় বিক্রি করা যায় না। দেশের পোশাক কারখানাগুলো এখন কম দামে শীতের কাপড় তৈরি করছে। ফলে অনেক ক্রেতা নতুন কাপড়ই কিনছেন। তাই পুরনো কাপড়ের পাশাপাশি নতুন কাপড় বিক্রি করছি।

এদিকে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নতুন সুয়েটার, লেডিস কার্ডিগান, জিপার জ্যাকেট ও সোয়েটার ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা, হুডি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা, সুইট শার্ট ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, কার্ডিগান ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, উলেন শার্ট ৪০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

নিউমার্কেটে শীত পোশাক কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী ফিরোজ আহমেদ বলেন, তীব্র শীত পড়ছে। ভালো ও কমদামে পুরনো শীত কাপড়ের জন্য মতিঝিল ও হলিডে মার্কেট গিয়েছি। একটু ফ্রেশ হলেই ৪০০/৫০০ টাকার দাম হাঁকায়। নিউমার্কেটে ওই দামে বা অল্প কিছু বাড়তি টাকা দিয়ে নতুন পোশাক কিনেছি। এখন দেশি শীতের কাপড়গুলোরও দাম কম।

পুরনো কাপড় আমদানিকারক আফছার আহমেদ বলেন, বছরের শুরুতে ব্যবসায়ীরা কাপড় আমদানির জন্য এলসি খোলেন। শীতের আগে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের মধ্যে কাপড় চলে আসে। এখন আর পুরনো কাপড়ের সেই বাজারটা নেই। বাজারে পুরনো শীতবস্ত্রের চাহিদা নেমে এসেছে অর্ধেকে।

যেসব পুরনো কাপড় আমদানি হয় : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, শীতের গরম পোশাক, কম্বল, সোয়েটার, লেডিস কার্ডিগান, জিপার জ্যাকেটসহ পুরুষের জ্যাকেট, পুরুষের ট্রাউজার, সিনথেটিক ও ব্লেন্ডেড কাপড়ের শার্ট প্রতিবছর আমদানি করা যায়। সারা দেশের তিন হাজার ক্ষুদ্র আমদানিকারক আছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা প্রধান আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় এ অনুমতি দিয়ে থাকে। বর্তমানে আমদানিকারকরা এক টন কম্বল, ৩ টন সোয়েটার, ৩ টন লেডিস কার্ডিগান, ৩ টন জিপার জ্যাকেটসহ পুরুষের জ্যাকেট, ৩ টন পুরুষের ট্রাউজার ও ২ টন সিনথেটিক এবং ব্লেন্ডেড কাপড়ের শার্টসহ মোট ১৪ টন আমদানি করতে পারেন।

আগে এসব পণ্য দ্বিগুণ আমদানি করা যেত। আগের আমদানি আদেশ ২০১৫-২০১৮ অনুযায়ী, একজন আমদানিকারক সর্বোচ্চ দুই টন পুরনো কম্বল আমদানি করতে পারতেন। নতুন নীতি অনুযায়ী তা অর্ধেক কমিয়ে এক টনে নামিয়ে আনা হয়েছে।

এ ছাড়া আমদানি আদেশ ২০১৫-২০১৮ অনুযায়ী পুরনো পোশাক আমদানি করতে পারত ৫ হাজার ব্যবসায়ী। এখন সরকার নির্ধারিত সেই সংখ্যা ৩ হাজার।

বৃহৎ বাজার চট্টগ্রাম : ঢাকার খুচরা বিক্রেতারা বেশিরভাগই সদরঘাটের নর্থব্রুক হল রোডের বাজার এবং বাংলাবাজার মোড়ের কাছে মল্লিক টাওয়ার থেকে কাপড় সংগ্রহ করেন। কিছু বিক্রেতা বিশ্বস্ত সরবরাহকারীদের মাধ্যমে সরাসরি চট্টগ্রাম থেকে পোশাক সংগ্রহ করেন।

তবে সারা দেশের এই বৃহৎ পরিমাণের পুরনো কাপড়ের চাহিদা মেটানো হয় চট্টগ্রাম থেকে। জাপান, কোরিয়া, চীন ও তাইওয়ান থেকে মূলত আমদানি করা হয় এই কাপড়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে নিলামে কেনা পুরনো কাপড় চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে আসে খাতুনগঞ্জের কয়েকটি মার্কেটে। চট্টগ্রামে এই কাপড়ের আমদানিকারক আছেন ১৬৭ জন। গত বছর এই বাজার ছিল প্রায় হাজার কোটি টাকার। কিন্তু এবার নানা ইস্যুর কারণে ছোট হয়েছে এই বিনিয়োগ। এবার সর্বোচ্চ শতকোটি টাকা ছুঁয়েছে এই খাতে বিনিয়োগ।

বাংলাদেশ পুরনো কাপড় আমদানিকারক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, ‘আগে সরকার পাঁচ হাজার আমদানিকারককে অনুমতি দিয়েছিল। এখন সেটা নেমেছে তিন হাজারে। আর শর্ত দেওয়া হয়েছে, সর্বোচ্চ ১৪ টন আর ৫০ হাজার টাকার বেশি কাপড় আমদানি করা যাবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত