গেল বছর নানা অনিশ্চয়তায় তথা টালমাটাল পরিস্থিতিতে চলতে হয়েছে বাংলাদেশকে। দেশে চলছে অ্যান্টি ডেমোক্রেটিক রাজনীতি ও অ্যান্টি নির্বাচন রাজনীতি। দেশ-বিদেশে এক ধরনের ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। এগুলো কাটিয়ে উঠতে, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুন বছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করা। গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনবিরোধী শক্তিগুলোকে প্রতিহত করাও বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব মনে করে, নতুন বছরে বাংলাদেশে যেকোনোভাবেই নির্বাচন ভ-ুলের চক্রান্ত প্রতিহত করতে হবে। গত দেড় বছরে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনৈতিক যে বিষবাষ্প ছড়িয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সবার জন্য সম্প্রীতির বাংলাদেশ ও সহাবস্থানের রাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে। দেশের ইতিহাসে নতুন বছর বড় বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার বছর।
বিশ্লেষকরা বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায় করা সম্ভব হলে অন্য সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হয়ে উঠবে। নতুন বছরের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে তারা বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশে সৃষ্টি হওয়া ‘পাওয়ার সেন্টার’ ধ্বংস করে দিতে হবে। নতুন বছরের অন্যতম রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ পাওয়ার সেন্টার। আছে কূটনীতিক চ্যালেঞ্জ। সর্বোপরি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জও। রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতা নতুন বছরের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বলেন, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চা করতে হবে নতুন বছরে। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বাড়বে নতুন বছরে। সেটি মোকাবিলায় সতর্ক থাকতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে। এ বছরই নতুন রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠার বছর। সেই সরকারের ওপর মানুষের আকাক্সক্ষার চাপ থাকবে। এগুলো মোকাবিলা করতে হবে। সম্ভাব্য নতুন সরকারকে আগের চেয়ে আরও বেশি বড় করে দেখতে হবে দেশের ও দশের স্বার্থকে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন বছরের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো আসন্ন জাতীয় নির্বাচন আদায় করে নেওয়া। কোনোভাবেই নির্বাচন ভন্ডুল করার চক্রান্ত সফল করতে দেওয়া যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পর কর্তৃত্ববাদী সরকার বিদায় হয়েছে। আবার নতুন করে কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশে একাধিক পাওয়ার সেন্টার সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াত, এনসিপিসহ গড়ে ওঠা অন্য একাধিক পাওয়ার সেন্টার দেশকে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তার দাবি, পাওয়ার সেন্টার থাকতে হবে একটা।’
শাহ আলম বলেন, অ্যান্টি নির্বাচন গ্রুপ ও অ্যান্টি ডেমোক্রটিক চর্চার অবসান ঘটাতে হবে নতুন বছরে। সর্বোপরি গণতন্ত্র বেগবান করার লড়াই শক্তিশালী করে তুলতে হবে সবার সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশ জাসদ সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, ‘নতুন বছরের চ্যালেঞ্জ একটাই তা হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায় করে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একত্রিত হওয়া। নির্বাচন আদায় করার চ্যালেঞ্জ উতরে গেলে অন্য সব চ্যালেঞ্জ সরল ও সহজ হয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘যেসব সংস্কার করতে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে, তা নিশ্চিত হলে গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক রাশেদুজ্জামন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফরেন পলিসি’ নতুন বছরে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। কারণ, বিগত সময়ে ফরেন পলিসিতে এক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। নতুন বছরে কূটনীতির সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠে পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসের সম্পর্ক সৃষ্টি করতে হবে।
এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান। ফ্রি, ফেয়ার ও ক্রেডিবল ইলেকশন সম্ভব হয়ে গেলে অন্য সব চ্যালেঞ্জ সহজ হয়ে উঠবে।’ তিনি বলেন, ‘সংঘাতময় দেশে অনেক বাস্তবতা থাকে। ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে সরে এসে টেনশনবিরোধী কূটনীতির রাজনীতি করতে হবে। গ্লোবাল পলিটিকসে ও মধ্যপ্রাচ্যের পলিটিকস সাবধানে ও সতর্কভাবে হ্যান্ডেল করতে হবে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন বছরের নতুন চ্যালেঞ্জ হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। গণতন্ত্রে উত্তরণ ও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের মূলোৎপাটন করা।’ তিনি বলেন, ‘এগুলো বাংলাদেশকে পিছিয়ে রেখেছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চা নতুন বছরের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। আর এসবের জন্য দরকার রাজনৈতিক সরকার।’
