নতুন বছরের আগমন মানে হলো জীবন থেকে ৩৬৫ দিন হারিয়ে যাওয়ার। মানুষ এগিয়ে যায় মৃত্যুর পথের দিকে। জীবন থেকে হারিয়ে যায় সময়। সময় মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মহান আল্লাহর স্মরণে ঈমান বৃদ্ধি পায়। আল্লাহর স্মরণে জীবন পরিচালিত হলে ঈমান নবায়ন হয়। ফলে জীবন-মৃত্যু প্রশান্তিপূর্ণ ও সৌভাগ্যময় হয়। নতুন বছরকে ঈমান নবায়নের সূচনায় পরিণত করা চাই।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন
مسند أحمد ٨٧٠١: حَدَّثَنَا أَسْوَدُ بْنُ عَامِرٍ حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ عَيَّاشٍ عَنْ أَبِي حَصِينٍ عَنْ أَبِي صَالِحٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ وَلَكِنَّ الْغِنَى غِنَى النَّفْسِتَا
তোমরা তোমাদের ঈমান নবায়ন কর। সাহাবিরা জানতে চাইলেন, কীভাবে তা নবায়ন করব?
তিনি বললেন, বেশি বেশি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়তে থাক। (মুসনাদে আহমদ: ৮৭১০)।
আল্লাহর কাছে ঈমান নবায়নের প্রার্থনা করতে হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, অবশ্যই তোমাদের হৃদয়ে ঈমান জীর্ণ হয়, যেমন জীর্ণ হয় পুরোনো কাপড়। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা কর; যেন তিনি তোমাদের হৃদয়ে তোমাদের ঈমান নবায়ন করে দেন। (মুসতাদরাকে হাকেম : ৫)।
بَاب ذِكْرِ التَّوْبَةِ
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ سَعِيدٍ الدَّارِمِيُّ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ الرَّقَاشِيُّ، حَدَّثَنَا وُهَيْبُ بْنُ خَالِدٍ، حَدَّثَنَا مَعْمَرٌ، عَنْ عَبْدِ الْكَرِيمِ، عَنْ أَبِي عُبَيْدَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ : " التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لاَ ذَنْبَ لَهُ " .
গোনাহ থেকে তওবা
অতীত মন্দ কাজের জন্য বিশেষভাবে অনুতপ্ত হওয়াকে তওবা বলে। বিশুদ্ধ তওবা হলো, কৃত গোনাহের জন্য অনুশোচনা করা, আল্লাহর দরবারে কায়মনো বাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং ভবিষ্যতে এসব গোনাহ না করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়া।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, গোনাহ থেকে তওবাকারী নিষ্পাপ ব্যক্তির মতো হয়ে যায়। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৫০)।
অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘তওবাকারী ওই ব্যক্তির মতো, যার কোনো গোনাহ নেই।’ (সুনানে বাইহাকি: ২০৩৫০)।
যদি গোনাহ করার যোগ্যতা মানুষের মাঝে না থাকত, তাহলে মানবসৃষ্টির কোনো প্রয়োজনই ছিল না। শুধু ইবাদতের জন্য ফেরেশতারাই যথেষ্ট ছিল। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ!
আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা
নতুন বছরের আগমনে মহান আল্লাহর কাছে ইহকালীন ও পরকালীন সুখ-শান্তি, সফলতা এবং কল্যাণ কামনা করা চাই।
কুরআনে সুরা ইয়াসিন: ২৩-২৪ আয়াতে বলা হয়েছে
ءَاَتَّخِذُ مِنۡ دُوۡنِهٖۤ اٰلِهَۃً اِنۡ یُّرِدۡنِ الرَّحۡمٰنُ بِضُرٍّ لَّا تُغۡنِ عَنِّیۡ شَفَاعَتُهُمۡ شَیۡئًا وَّ لَا یُنۡقِذُوۡنِ ﴿ۚ۲۳﴾
اِنِّیۡۤ اِذًا لَّفِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ ﴿۲۴﴾
আল্লাহই বান্দার সুখ-শান্তি, সফলতা ও কল্যাণ দান করেন। কুরআনে এসেছে, ‘আমি কি তার (আল্লাহর) পরিবর্তে অন্যদের উপাস্যরূপে গ্রহণ করব? করুণাময় যদি আমাকে কষ্টে ফেলতে চান, তবে তাদের সুপারিশ আমার কোনো কাজে আসবে না এবং তারা আমাকে রক্ষাও করতে পারবে না। এরূপ করলে আমি প্রকাশ্য পথভ্রষ্ট হব। (সুরা ইয়াসিন : ২৩-২৪)।
জীবনের হিসাব-নিকাশ
আল্লাহতায়ালা মানুষকে সুনির্দিষ্ট একটি সময়কাল দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান। এ সময়কালের কোনো হেরফের বা কমবেশি হয় না। যার জন্য যতটুকু সময় নির্ধারিত, ততটুকু ফুরিয়ে গেলেই জীবন শেষ হয়ে মৃত্যুর ডাক এসে যায়। কাজেই পরকালে আল্লাহর সামনে হিসাব-নিকাশের মুখোমুখি হওয়ার আগে পৃথিবীতেই জীবনের হিসাব-নিকাশ করে নিতে হবে।
একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) কে প্রশ্ন করা হলো, সৌভাগ্যবান কারা? তিনি বললেন, যারা দীর্ঘায়ু লাভ করে তা নেক আমলের মাধ্যমে অতিবাহিত করেছে। পুনরায় জিজ্ঞেস করা হলো, দুর্ভাগা কারা? তিনি বললেন
باب مَا جَاءَ فِي طُولِ الْعُمُرِ لِلْمُؤْمِنِ
حَدَّثَنَا أَبُو كُرَيْبٍ، حَدَّثَنَا زَيْدُ بْنُ حُبَابٍ، عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ صَالِحٍ، عَنْ عَمْرِو بْنِ قَيْسٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُسْرٍ، أَنَّ أَعْرَابِيًّا، قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ خَيْرُ النَّاسِ قَالَ " مَنْ طَالَ عُمُرُهُ وَحَسُنَ عَمَلُهُ " . وَفِي الْبَابِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَجَابِرٍ . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ مِنْ هَذَا
যারা দীর্ঘায়ু পেয়ে তা বদ আমলে কাটিয়েছে বা আমলহীন অতিবাহিত করেছে। (সুনানে তিরমিজি : ২৩২৯)।
حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ وَكِيعٍ، حَدَّثَنَا عِيسَى بْنُ يُونُسَ، عَنْ
أَبِي بَكْرِ بْنِ أَبِي مَرْيَمَ، ح وَحَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، أَخْبَرَنَا عَمْرُو بْنُ عَوْنٍ، أَخْبَرَنَا ابْنُ الْمُبَارَكِ، عَنْ أَبِي بَكْرِ بْنِ أَبِي مَرْيَمَ، عَنْ ضَمْرَةَ بْنِ حَبِيبٍ، عَنْ شَدَّادِ بْنِ أَوْسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ " . قَالَ هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ . قَالَ وَمَعْنَى قَوْلِهِ " مَنْ دَانَ نَفْسَهُ " . يَقُولُ حَاسَبَ نَفْسَهُ فِي الدُّنْيَا قَبْلَ أَنْ يُحَاسَبَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ . وَيُرْوَى عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا وَتَزَيَّنُوا لِلْعَرْضِ الأَكْبَرِ وَإِنَّمَا يَخِفُّ الْحِسَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى مَنْ حَاسَبَ نَفْسَهُ فِي الدُّنْيَا . وَيُرْوَى عَنْ مَيْمُونِ بْنِ مِهْرَانَ قَالَ لاَ يَكُونُ الْعَبْدُ تَقِيًّا حَتَّى يُحَاسِبَ نَفْسَهُ كَمَا يُحَاسِبُ شَرِيكَهُ مِنْ أَيْنَ مَطْعَمُهُ وَمَلْبَسُهُ .
তাই তো ওমর (রা.) বলতেন, ‘তোমরা নিজেদের হিসেব করে নাও তোমাদের হিসেব নেওয়ার আগে।’ (সুনানে তিরমিজি : ২৪৫৯)।
অতীত থেকে শিক্ষা লাভ
নতুন বছর আগমনকালে বিগত বছরের পর্যালোচনা করা খুবই যৌক্তিক বিষয়। অতীতের ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে নতুন বছরে নির্ভুল এবং পাপমুক্ত জীবন কাটানোর জন্য প্রত্যয়ী হওয়া চাই। মানবেতিহাসে সংঘটিত সব ঘটনাই মানুষের জন্য শিক্ষণীয়। মানুষের উচিত, অতীত থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা। আল্লাহর অবাধ্য ব্যক্তি বা জাতিকে এ জগতেই কোনো না কোনোভাবে প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করতে হয়েছে। কোরআন-হাদিসে বিভিন্ন নবী-রাসুল ও অতীত অনেক জাতির ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে অতীত ইতিহাসের সত্য ও শিক্ষার দিকে ধাবিত করা। আল্লাহতায়ালা বলেন,
لَقَدۡ كَانَ فِیۡ قَصَصِهِمۡ عِبۡرَۃٌ لِّاُولِی الۡاَلۡبَابِ ؕ مَا كَانَ حَدِیۡثًا یُّفۡتَرٰی وَ لٰكِنۡ تَصۡدِیۡقَ الَّذِیۡ بَیۡنَ یَدَیۡهِ وَ تَفۡصِیۡلَ كُلِّ شَیۡءٍ وَّ هُدًی وَّ رَحۡمَۃً لِّقَوۡمٍ یُّؤۡمِنُوۡنَ ﴿۱۱۱﴾
‘তাদের ঘটনায় বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।’ (সুরা ইউসুফ : ১১১)।
নতুন বছরের কর্মপরিকল্পনা
নতুন বছর আগমনকালে নতুন বছরের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। সঠিক পরিকল্পনা সফলতার পথ দেখায়। আর সঠিক নিয়ত কাজের গতি বাড়ায়। কাজের শুরুতে নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
باب كَيْفَ كَانَ بَدْءُ الْوَحْىِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم
حَدَّثَنَا الْحُمَيْدِيُّ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ الزُّبَيْرِ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ الأَنْصَارِيُّ، قَالَ أَخْبَرَنِي مُحَمَّدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ التَّيْمِيُّ، أَنَّهُ سَمِعَ عَلْقَمَةَ بْنَ وَقَّاصٍ اللَّيْثِيَّ، يَقُولُ سَمِعْتُ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ ـ رضى الله عنه ـ عَلَى الْمِنْبَرِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ " إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ .
‘নিশ্চয় প্রতিটি কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বোখারি : ১)। নতুন বছর সামনে রেখে নিয়ত ঠিক করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে।
خِتٰمُهٗ مِسۡكٌ ؕ وَ فِیۡ ذٰلِكَ فَلۡیَتَنَافَسِ الۡمُتَنَافِسُوۡنَ ﴿ؕ۲۶﴾
আমল ও আখলাক নিয়ে ঈমানদারদের প্রথম পরিকল্পনা হওয়া চাই। বছরের প্রথম দিন থেকে নামাজ-রোজাসহ ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলো যথার্থভাবে আদায়ের পরিকল্পনা, কোরআন তেলাওয়াত ও ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের পরিকল্পনা, পরোপকার, দান-সদকা বৃদ্ধির পরিকল্পনা ইত্যাদি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক।’ (সুরা মুতাফফিফিন : ২৬)।
ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, নববর্ষ উপলক্ষে পরস্পর উপহার দেওয়া-নেওয়া এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের কোনো গুরুত্ব ইসলামে নেই। নতুন বছর, নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দুরীভূত হয় পুরনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি- এমন কোনো তত্ত্ব ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়। বরং মুসলিমের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান হীরকখণ্ড।
