টিকে থাকার লড়াইয়ে গাজাবাসী

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৫ এএম

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার বাসিন্দাদের কাছে ২০২৫ সালের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ২০২৩ সালে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর টানা দুই বছর ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞ ও আগ্রাসনের পর গত বছর অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় উপত্যকাটিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। কাগজে কলমে সে অস্ত্রবিরতি চালু থাকলেও শান্তিতে নেই গাজাবাসী। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় এখনো হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। তবে সবকিছু সত্ত্বেও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজায় নতুন বছরে টিকে থাকার সংগ্রামের মুখোমুখি ফিলিস্তিনিরা। সাদা প্লাস্টিকের ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ছাদের নিচে, কাপড়ের চাদর দিয়ে তৈরি একটি তাঁবু। ভেতরে মেয়েদের নিয়ে একটু নিরিবিলি সময় কাটানোর চেষ্টা করছিলেন সানা ইসা। কিন্তু ভেজা কম্বলের ওপর শুয়ে থাকা সানার কাছে আশাবাদী হওয়ার মতো তেমন কোনো উপলক্ষ নেই। ৪১ বছর বয়সী সানা বলেন, বুঝতে পারছি না কাকে দোষ দেব যুদ্ধ, শীত নাকি ক্ষুধাকে। এক সংকট কাটতে না কাটতেই আরেকটি সামনে আসছে। যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর গাজায় ফিরেছে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা; যাদের বেশিরভাগেরই বাড়িঘর ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেকের নেই মাথা গোঁজার ঠাঁই। ফলে বাধ্য হয়েই তীব্র শীতে তাঁবুতে দিন পার করতে হচ্ছে তাদের। সানার মতো হাজারো ফিলিস্তিনির ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন যেন আটা, পানি সংগ্রহের লড়াই আর অবিরাম বোমাবর্ষণের মাঝে টিকা থাকার চেষ্টার সঙ্গে মিশে গেছে।

সানা ইসা একাই সাত সন্তানের দেখভাল করেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলে হামলায় তার স্বামী নিহত হন। সানা বলেন, সন্তানদের দায়িত্ব, বাস্তুচ্যুতি, খাবার-পানির ব্যবস্থা, একের পর এক কঠিন সিদ্ধান্ত- সবকিছুই একসঙ্গে তার কাঁধে গিয়ে পড়ে। পরিবারসহ এক সময় মধ্য গাজার আল-বুরেইজ থেকে দেইর এল-বালাহতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ২০২৫ সালে সানার সবচেয়ে বড় সংগ্রাম ছিল প্রতিদিন পরিবারের জন্য এক টুকরো রুটি জোগাড় করা এবং অন্তত এক কেজি আটা হাতে পাওয়া। সানা বলছিলেন, দুর্ভিক্ষের সময় আমি ঘুমাতে যেতাম আর ঘুম থেকে ওঠার পর একটাই কামনা করতাম অন্তত সেদিন যেন পর্যাপ্ত রুটি জোটে। আমার সন্তানরা চোখের সামনে অনাহারে কাতরাতো, আর আমি কিছুই করতে পারতাম না। মনে হতো, আমিই যেন ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত আটা খোঁজার তাগিদেই সানা যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত জিএইচএফ ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সানা বলেন, শুরুতে ভয় আর দ্বিধা কাজ করত। কিন্তু যে ক্ষুধার ভেতর আমরা বেঁচে আছি, তা মানুষকে এমন কাজ করতে বাধ্য করে, যা সে কখনো কল্পনাও করেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমর্থনে চালু হওয়া এসব ত্রাণকেন্দ্র ছিল বেশ বিপজ্জনক। জাতিসংঘের হিসাবে, গত নভেম্বরের আগপর্যন্ত জিএইচএফ কেন্দ্রের ভেতরে ও আশপাশে ২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন। সংস্থাটি তাদের কার্যক্রম শেষ করে নভেম্বর মাসে। জিএইচএফ- এর কেন্দ্রে যাওয়াটা সানার কাছে কেবল জীবনের ঝুঁকি ছিল না। এটি ছিল এমন এক পথ, যা তার মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে। একবার মধ্য গাজার নেতজারিম ত্রাণকেন্দ্রে সাহায্যের অপেক্ষায় থাকাকালে সানার হাতে শার্পনেলের (বোমা বা বুলেটের ছোট ধাতব টুকরো) আঘাত লাগে। আর রাফাহর পূর্বে মোরাগ কেন্দ্রে শার্পনেল আঘাত করে তার ১৭ বছর বয়সী মেয়ের বুকে। এসব আঘাত সত্ত্বেও ক্ষুধার যন্ত্রণায় তিনি বারবার ত্রাণ নিতে গেছেন।

এদিকে, ইসরায়েল নতুন বছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ৩৭টি আন্তর্জাতিক এনজিওর লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করছে। এই তালিকায় রয়েছে ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ), নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল, কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল এবং ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির মতো বড় বড় সংস্থাও। ইসরায়েলের দাবি, নতুন নিয়ম অনুযায়ী এসব সংস্থাকে তাদের কর্মী ও কাজের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটি মূলত মানবিক সংস্থাগুলোকে কোণঠাসা করার একটি কৌশল। ইতিপূর্বে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থাকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই হামাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার দায়ে অভিযুক্ত করেছে ইসরায়েল। গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হয় ২০২৩ সালের অক্টোবরে। সানা বলেন, দুই বছরই যথেষ্ট। প্রতি বছর আগের বছরের চেয়েও কঠিন হয়েছে। মানুষ এখনো এই দুর্বিষহ চক্রে আটকে আছে। তারা শীতে আশ্রয়ের জন্য উপযুক্ত তাঁবু চায়। কাঠ পুড়িয়ে রান্নার বদলে একটি গ্যাস সিলিন্ডার চায়। বড় কোনো প্রত্যাশা নয়, টিকে থাকার প্রয়োজনীয় উপকরণগুলোই এখন মানুষের স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত