মাটি ভরাট দেখিয়ে অর্থ লোপাট

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৬ এএম

দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকার প্রতি বছর টেস্ট রিলিফ (টিআর) ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচির মাধ্যমে সারা দেশে বিপুল বরাদ্দ দিয়ে থাকে। ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলায়ও এসব কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ আছে। তবে উপজেলাটিতে কাজ ছাড়াই বরাদ্দের একটি অংশ দুর্নীতিবাজদের পকেটে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের নামে কাজ না করেই অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে। পাকা রাস্তায় মাটি ভরাট বা খেলার মাঠে সংস্কার দেখিয়ে এ ধরনের অনিয়ম চলছে। এতে হতাশ স্থানীয় বাসিন্দারা।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আগানগর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নামাপাড়ায় টুইন টাওয়ার হোটেল থেকে আলমগীরের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তায় মাটি ভরাটের নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এতে বরাদ্দ ছিল ৪ লাখ টাকা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই রাস্তাটি তিন বছর আগে সিসি ঢালাই করে পাকা করা হয়েছে। মাটি ভরাটের কাজও প্রায় দুই যুগ আগে সম্পন্ন হয়েছিল।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাস্তায় কোনো সংস্কার বা মাটি ভরাটের কাজ হয়নি। প্রকল্পের ঠিকাদার মো. ইমরান শেখের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, এটি মাটি ভরাটের প্রকল্প নয় বরং রাস্তার হালকা সংস্কারের জন্য সামান্য বরাদ্দ ছিল। তিনি প্রথমে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দের কথা বললেও পরে স্বীকার করেন যে বরাদ্দ ৪ লাখ টাকা ছিল, তবে পুরো টাকা পাননি। কিছু ‘খরচ’ করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি দাবি করেন, যা পেয়েছেন তা রাস্তা সংস্কারে ব্যয় করেছেন। কিন্তু সরেজমিন পরিদর্শনে কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কারের চিহ্ন চোখে পড়েনি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. জসিম বলেন, ‘তিন বছরের মধ্যে এ রাস্তায় কোনো কাজ হয়নি। ২০২২ সালে সিসি ঢালাই করা হয়েছে। এলাকার ভেতরের রাস্তা হওয়ায় বড় গাড়ি চলে না, তাই এখনো ভালো আছে।’

দোকানি ওয়াদুদ মিয়া জানান, ‘গত এক থেকে দুবছরে কোনো কাজ দেখিনি। আমি ১০ বছর ধরে এখানে দোকান করি। কাজ হলে চোখে পড়তই।’ বাড়ির মালিক মো. সোহেল বলেন, ‘২০ বছর আগে মাটি ফেলা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২২ সালে সিসি ঢালাই করা হয়। এরপর আর কোনো কাজ হয়নি।’

একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে কালিন্দী খেলার মাঠ নিয়েও। গত এক যুগ ধরে মাঠটির কোনো সংস্কার হয়নি। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাবিখা কর্মসূচির আওতায় কালিন্দী ইউনিয়নে মাঠ সংস্কারের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫.৯৯৩ টন গমের সমমূল্যের নগদ অর্থ, যা প্রায় ২ লাখ টাকার কাছাকাছি। বরাদ্দ পাস হলেও মাঠে কোনো কাক্সিক্ষত সংস্কার হয়নি। মাঠের প্রবেশপথে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একটি স্মারকফলক থাকলেও স্থানীয় খেলোয়াড়রা জানান, গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়নি।

খেলোয়াড় মো. রনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে এ মাঠে খেলি। এটি কেরানীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মাঠ। অযত্নে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কয়েকবার প্রকল্পের কথা শুনেছি, কিন্তু কাজ হয়নি। আমরা চাই মাঠটি সংস্কার করে রক্ষা করা হোক।’

মো. সামিউল নামের আরেকজন বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে সংস্কারের কথা শুনি, কিন্তু কাজ হয়নি। শুধু গত বছর একটি টুর্নামেন্টের সময় কয়েকটি গর্তে নামমাত্র মাটি ভরা হয়েছে।’

মো. কায়েস নামের আরেকজন বলেন, ‘কেরানীগঞ্জ থেকে মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে। গত বছর মাটি ভরাটের কথা শুনেছি, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। পিচও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত পদক্ষেপ দরকার।’

এ ধরনের অনিয়মে হতাশ সাধারণ মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলম বলেন, ‘২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পরেও যদি এমন লুটপাট চলে, তাহলে পরিবর্তন কোথায়? আগে যারা লুট করত, এখন অন্যরা করছে। সব আগের মতোই।’

প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাসেদ খান বলেন, ‘নামাপাড়ার প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা দেখে বলতে পারব। কালিন্দী মাঠে পিচের কিছু কাজ হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সঙ্গে কথা বলুন।’

উপজেলা নির্বাহী অফিসার উমর ফারুক বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি। অনিয়মের বিষয়গুলো আপনার কাছ থেকে শুনলাম। খতিয়ে দেখব। অনিয়ম প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত