বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বিবেচনায় সামনের দিনে বাংলাদেশ বহুমুখী মন্দার (স্ট্যাগফ্লেশন) ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও রিজার্ভ কিছুটা স্থিতিশীল হলেও ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং বেকারত্ব বৃদ্ধির ফলে এমন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নিজস্ব কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এমন মতামত এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের (ডিএফএটি) সহযোগিতায় ‘মান্থলি ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস (এমএমআই)’ প্রতিবেদন প্রকাশের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক এবং বেসরকারি পর্যায়ের নেতারা।
স্ট্যাগফ্লেশন হলো এমন একটি অর্থনৈতিক অবস্থা, যার প্রভাবে ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উচ্চ-মুদ্রাস্ফীতি এবং উচ্চ-বেকারত্ব বিরাজ করে। যা সাধারণ মন্দা থেকে ভিন্ন। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
প্রতিবেদনে উন্নত মুদ্রাবিনিময় স্থিতিশীলতা, উচ্চ-বৈদেশিক রিজার্ভ এবং মন্দাক্রান্ত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে একটি মন্থর স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। তবে, বিনিয়োগের নিম্নমুখিতা, বেকারত্বের বৃদ্ধি, প্রকৃত মজুরির পতন এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধিসহ বৃদ্ধির হার প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, যা কম বিনিয়োগ, বেকারত্ব বৃদ্ধি, প্রকৃত মজুরি হ্রাস এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রতিফলন।
খাদ্য ও চালের উচ্চমূল্যের চাপে মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে রয়ে গেছে। ব্যাংকিং খাতের তীব্র চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান। সভাপতিত্ব করেন পিআরআই চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান। অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ, পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক খুরশিদ আলম, গবেষণা পরিচালক বজলুল হক খন্দকার প্রমুখ।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসী আয় ও মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের ফলে অর্থনীতিতে প্রাথমিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে, বিনিয়োগ প্রবণতা দুর্বল থাকা, বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়া এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসায়িক আস্থাকে ক্ষুন্ন করায় সামগ্রিক পুনরুদ্ধার এখনো নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ফলে স্থবির বিনিয়োগ, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং প্রকৃত মজুরি কমেছে। এ পরিস্থিতিতে ২০২৪-২০২৫ সালে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন ৪৮ লাখ মানুষ। ফলে বাংলাদেশ বর্তমানে স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
কামরান টি রহমান বলেন, ‘বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে ঠিক। কিন্তু দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগে মন্থরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ-মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণ ও অত্যন্ত নিম্ন হারের কর-জিডিপি অনুপাতে বিষয়গুলো অর্থনীতির সংকট।
ব্যবসায়িক আস্থা ফেরাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও নীতিগত নিশ্চয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে কামরান রহমান বলেন, ‘অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল পরিবেশের ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হন। তাই সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিকে টেকসই করতে শুধু সাময়িক সমাধান নয়, তার পরিবর্তে সুদূরপ্রসারী ও কার্যকর মধ্যমেয়াদি সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতির ও বুদ্ধিদীপ্ত বাণিজ্যনীতি প্রয়োজন। পাশাপাশি অর্থবহ কর সংস্কার ছাড়া আর্থিক সক্ষমতা সীমিতই থেকে যাবে।’
সভাপতির বক্তব্যে পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান বলেন, ‘নামমাত্র মুদ্রাবিনিময় হার প্রায় ১২২ টাকা প্রতি ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে, কিন্তু আমাদের প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার, যা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলকতাকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে নির্ধারণ করে, গত ৪ মাসে ৬ থেকে ৭ শতাংশ আরইইআর-এর তীব্র মূল্যবৃদ্ধি দেখিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নমনীয় মুদ্রাবিনিময় ব্যবস্থায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদে নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থায় মূল্যায়ন ও অবমূল্যায়ন দুটোই হতে পারে। অবমূল্যায়ন রপ্তানি বাড়ায় ও আমদানি কমায়, আর মূল্যায়ন আমদানি বাড়াতে ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। ফলে এখানে স্পষ্ট বাণিজ্য-সমঝোতা রয়েছে। বিনিময় বাজারে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে, যা পুরোপুরি নমনীয় বিনিময় হার নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।’
ড. সাত্তার বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতি এটি সংকুচিত হয় না, বরং প্রবৃদ্ধি কমে যায়। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ গতি রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ থেকে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, কিন্তু পরবর্তী প্রতিটি দশকে গড় প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে ১ শতাংশ করে বেড়েছে। অর্থাৎ অন্তর্নিহিত প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রায় ৬ শতাংশ। বর্তমানে ৪ শতাংশের নিচে প্রবৃদ্ধি মূলত বিনিয়োগ হ্রাসের ফল। আমাদের প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগ-নির্ভর; ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত ৩০ শতাংশ প্রয়োজন, অথচ বর্তমানে তা প্রায় ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন লুটপাট সত্ত্বেও সেই রক্তক্ষরণ থামানো গেছে, যদিও খেলাপি ঋণ প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে যার একটি অংশ পুনঃশ্রেণিবিন্যাসের ফল। তবুও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় দিক থেকেই সামষ্টিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার হয়েছে। অভ্যন্তরীণভাবে প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে মূল্যস্ফীতি, যা প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এটি আরও বেশি হতে পারত, যদি সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরত না। মূল্যস্ফীতি ধীরে কমছে, আংশিকভাবে দুর্বল মুদ্রানীতি সঞ্চালন ব্যবস্থার কারণে।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘বৈদেশিক খাতে ২০২২ সালের ধাক্কার পর ব্যবস্থাপনার ঘাটতি থাকলেও এখন ভারসাম্য পুনরুদ্ধার হয়েছে। বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক ভারসাম্য ইতিবাচক, এবং চলতি হিসাব ঘাটতি জিডিপির ১ শতাংশের নিচে যা টেকসই। উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য টেকসই চলতি হিসাব ঘাটতি গ্রহণযোগ্য, কারণ এটি সঞ্চয়-বিনিয়োগ ঘাটতির প্রতিফলন। সামষ্টিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হলেও প্রবৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কম এটি স্বীকার করা জরুরি।’
পিআরআই-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান মূল উপস্থাপনা প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ শিগগিরই স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে ধরে নিতে পারে না। বরং, এটিকে অবশ্যই অনিশ্চয়তাকে একটি নির্ধারক অবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং তার চারপাশে কৌশল গড়ে তুলতে হবে। নীতি কাঠামোগুলো নমনীয় হতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাস্তব-সময়ের প্রতিক্রিয়া জোগাড় করতে সক্ষম হতে হবে। সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই সময়োপযোগী, বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রস্তুতিতে নিহিত হতে হবে।
অনিশ্চিত বিশ্বে টিকে থাকতে ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি পুনর্গঠন করতে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের ‘হরিণের মতো সতর্ক’ ও দ্রুত অভিযোজনযোগ্য হতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও জনগণের ওপর সহিংসতা অর্থনৈতিক টেকসইতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ছাড়া প্রবৃদ্ধি ভঙ্গুরই থাকবে।’ এনবিআর পৃথককরণের স্বাগত জানালেও তিনি অধ্যাদেশে দুর্বলতা ও দুর্বল রাজস্ব প্রশাসনের দিকে ইঙ্গিত করেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকিতে, যেখানে প্রবৃদ্ধি কমছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে। কঠোর মুদ্রা ও রাজস্বনীতি, ব্যাংকিং খাতের চাপ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ফলে ঋণ সংকোচন তীব্র হয়েছে।’ তিনি বলেন, ব্যর্থ ব্যাংককে সহায়তার বদলে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর মূলধন জোরদার করাই হওয়া উচিত।
