বিদেশে বসে হত্যার ছক

পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে অনেকেই বিদেশে

শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নিচ্ছে টেন্ডারের কমিশন

ব্যাংকক চলে গেছেন সুইডেন আসলাম 

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৩ এএম

টার্গেট করা হত্যাকা- (টার্গেটেড কিলিং) কমছেই না, বরং দিনে দিনে বাড়ছে। প্রকাশ্যেই টার্গেট করা লোকজনকে মেরে ফেলা হচ্ছে। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে হত্যা করা হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বিরকে। এর আগেও একাধিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ জাতীয় ঘটনার রহস্য উদঘাটনে মাঠে নেমেছে পুলিশ। তারা নিশ্চিত হয়েছে, বিদেশ থেকেই বেছে বেছে হত্যার টার্গেট করা হচ্ছে, আর কলকাঠি নাড়ছে বিদেশে থাকা আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। তাদের নির্দেশে সাঙ্গপাঙ্গরা হত্যার মিশনে নেমেছে। ইতিমধ্যে একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী পুলিশের চোখ গলে দেশের বাইরে চলে গেছে।

পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, গত বছরের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চলে যান। দীর্ঘদিন কারাবাসের পর গত বছর তিনি ছাড়া পেয়েছিলেন। সূত্র জানিয়েছে, ছাড়া পাওয়ার কয়েক মাস পরে তিনি আবার অপরাধে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। টেন্ডার বাণিজ্য থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধে যুক্ত ছিলেন। তার গ্রুপের সদস্যরা চাঁদাবাজি করছেন। মাস ছয়েক আগে ফার্মগেট এলাকার একটি গাড়ির শোরুম থেকে দামি মডেলের চারটি গাড়ি নিয়ে গেছেন সুইডেন আসলাম ও তার গ্রুপের সদস্যরা। তাছাড়া কারওয়ান বাজার এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে তার গ্রুপের সদস্যরা। খামারবাড়ি এলাকার সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারদের কাছ থেকে অন্তত ৫ শতাংশ কমিশন নিতেন আসলাম। মাস তিনেক আগে খামারবাড়ির একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সুইডেন আসলাম ১৮০ কোটি টাকা ভাগিয়ে নিয়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পেরেছে।

পুলিশ জেনেছ, কেউ কমিশন দিতে না চাইলে তার ওপর খড়গ নেমে আসে। স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বির হত্যাকা-েও সুইডেন আসলাম ও তার গ্রুপের সদস্যদের ইন্ধন থাকার বিষয়ে পুলিশ তথ্য পেয়েছে। সুইডেন আসলামের মতো বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন ও কিলার আব্বাস গ্রুপের সদস্যরা নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের আরও দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী ও মোল্লা মাসুদ গ্রেপ্তার হওয়ার পরেও তার গ্রুপের সদস্যরা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। জিসান এবং ফ্রিডম মানিকও একই কায়দায় অপরাধ চালাচ্ছে।

পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (অপারেশনস) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা নানা কৌশল নিয়েছি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ অন্য অপরাধীদের ধরার চেষ্টা চলছে। সমন্বয় করে আমরা কাজ করছি। সন্ত্রাসীদের বিষয়ে পুলিশের ইউনিটগুলোতে বিশেষ চিঠি পাঠানো হয়েছে। জামিনে যেসব সন্ত্রাসী মুক্ত হয়েছে তাদের কেউ কেউ দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে বলে আমরা অনেকটা নিশ্চিত হয়েছি।’

পুলিশ সূত্র জানায়, অপরাধীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চিন্তিত। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে পুলিশ সদর দপ্তরে বিশেষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে রাজনৈতিক হত্যাকা- নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। গত বুধবার রাতে  মোসাব্বির হত্যাকা-ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততা থাকায় নড়েচড়ে বসেন অনেক কর্মকর্তা। কোনো কোনো কর্মকর্তা বৈঠকে বলেন, নামকরা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় তাদের আটকানোর দরকার ছিল। বিদেশে পালিয়ে যাওয়া সন্ত্রাসীরা টার্গেটেড কিলিং মিশনে নেমেছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, দেশের বাইরে যেসব শীর্ষ সন্ত্রাসী আছে তাদের ইন্টারপোলের মাধ্যমে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশে থাকা তাদের সাঙ্গপাঙ্গদেরও দ্রুত ধরতে হবে।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের খোঁজে পুলিশ তৎপর হচ্ছে। তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর সংশ্লিষ্টদের কাছে বিশেষ চিঠি পাঠিয়েছে। অনেকেই এখন ঘাপটি মেরে আছে। জামিনে বের হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আত্মগোপনে থেকে কলকাঠি নাড়ছে। রাজনৈতিক নেতারাও তাদের সহায়তা করছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘সুইডেন আসলাম ব্যাংককে পালিয়ে গেছেন। নিজস্ব পাসপোর্ট দিয়েই তিনি চলে যান। বিষয়টি আমাদের গোচরে আসায় তদন্ত চালানো হচ্ছে।’  

সংশ্লিষ্টরা জানায়, নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই আন্ডারওয়ার্ল্ডের তৎপর হওয়ার আশঙ্কা করছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। বিদেশে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তারে উঠেপড়ে লেগেছে। এ কারণে সন্ত্রাসীদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে পুলিশ সদর দপ্তর সব ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপিদের কাছে গতকাল বিকেলে বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছে। তাছাড়া ইন্টারপোলের সদর দপ্তরে আত্মগোপনে থাকা সন্ত্রাসীদের বিষয়ে আবারও চিঠি পাঠানো হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জামিনে মুক্ত হতে নানা চেষ্টা করে সন্ত্রাসীরা। প্রথমে কারাগার থেকে মুক্ত হন কিলার আব্বাস। তারপর মুক্ত হন সুইডেন আসলাম, মোহাম্মদপুরের ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, হাজারীবাগের সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন। গোপনে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা একে অন্যকে ঘায়েল করার পাঁয়তারা করছে। খুন, দখল, চাঁদাবাজি ও হামলার ঘটনায় সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ ও বিকাশের নাম বেশি এসেছে। গত বছরের ১৯ এপ্রিল হাতিরঝিলে ওয়ার্ড যুবদলের সদস্য আরিফ শিকদারকে গুলি ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সুব্রত বাইনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ। ওই বছরের ১৩ মার্চ মগবাজারের ওয়্যারলেস রেলগেটের পাশে একটি ক্লাবঘরের ভেতরে কুপিয়ে ও মাথা থেঁতলে দেওয়া হয় ডিএনসিসির ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য মো. রাজনকে। চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে ফেরেন তিনি। এ ঘটনায়ও সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদের সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। মাস তিনেক আগে কুষ্টিয়া থেকে আটক হন সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ। গুলশানে ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান। জিসান বর্তমানে দুবাইয়ে আছেন বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য আছে। ফ্রিডম মানিক ভারত থেকে কলকাঠি নাড়ছে।

এ প্রসঙ্গে পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকে ঢাকার অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ যে কজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর হাতে ছিল, তাদের অন্যতম সুব্রত বাইন। তার সেভেন স্টার নামক সন্ত্রাসী গ্রুপে মোল্লা মাসুদও ছিল। তাদের প্রতিপক্ষ ছিল যুবলীগ নেতা লিয়াকত ও মুরগি মিলনের নেতৃত্বাধীন ফাইভ স্টার গ্রুপ। গণপূর্ত ও নগর ভবনের টেন্ডারবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি হতো। সেভেন স্টার গ্রুপের হাতে খুন হন মুরগি মিলন। পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে ১১ জন বিদেশে থাকায় ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করা আছে। প্রভাবশালী চক্র তাদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্র্ণ স্থাপনায় হামলার পাশাপাশি খুুনাখুনিতেও লিপ্ত করবে। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়কে জানানো হয়েছে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত