আওয়ামী সরকারের মেগা প্রকল্পে কাটছাঁট সরকারের

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম

অন্তর্বর্তী সরকার গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গৃহীত বিভিন্ন বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের বরাদ্দ কমিয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ ব্যয়ের মেগা প্রকল্পগুলোতে খরচ কমানোর ফলে সরকারি ব্যয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা কমছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) এসব প্রকল্পে নতুন বরাদ্দ কমানোর পাশাপাশি পূর্বের বরাদ্দেও কাটছাঁট করা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে থাকা ১০টি মেগা প্রকল্পের মধ্যে ৮টির বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট করা হয়েছে মেট্রোরেল এমআরটি-১ প্রকল্পে, যার বরাদ্দ ৯১ শতাংশ হ্রাস পাচ্ছে। মেট্রোরেল লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের বরাদ্দ ৬০ শতাংশ কমবে। মেট্রোরেলসহ অন্যান্য মেগা প্রকল্পে গড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ বরাদ্দ কমানো হয়েছে। মূল এডিপিতে এসব প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩৩ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা, যা সংশোধিত এডিপিতে ২১ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তুতকৃত সংশোধিত এডিপির খসড়া প্রতিবেদন ইতিমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চাহিদা, প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সরকারের সামগ্রিক উন্নয়ন দর্শনের ভিত্তিতে এ খসড়া তৈরি করা হয়েছে। আগামী সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে চলতি অর্থবছরের আরএডিপি অনুমোদনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন।

খসড়া আরএডিপি অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে দুই লাখ কোটি টাকায় নামানো হচ্ছে। মূল এডিপির আকার ছিল দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বরাদ্দের আওতায় মোট ১ হাজার ১৭১টি প্রকল্প রয়েছে।

এদিকে, মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ কমানোর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অবকাঠামো খাতের বড় প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ কমানো দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়, ফলে প্রত্যাশিত কল্যাণমুখী সেবা সময়মতো পাওয়া যায় না। বিলম্বের কারণে পরবর্তী সময়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায়, অথচ সেই ব্যয় দেশি ও বিদেশি ঋণের মাধ্যমেই বহন করতে হয়।

তবে মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ কমানোর কারণ সম্পর্কে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর প্রস্তাবিত চাহিদার ভিত্তিতেই সংশোধিত এডিপি প্রস্তুত করা হয়। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তা এনইসি বৈঠকে উপস্থাপন করাই কমিশনের দায়িত্ব।

আরএডিপির খসড়ায় সবচেয়ে বড় কাটছাঁটের তালিকায় রয়েছে মেট্রোরেল প্রকল্পগুলো। দেশের প্রথম মেট্রোরেল এমআরটি-৬ প্রকল্পে বরাদ্দ ২৪ শতাংশ কমানো হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ১ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা থেকে ৩২৪ কোটি টাকা কমিয়ে ১ হাজার ২৩ কোটি টাকায় নামানো হচ্ছে। উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশ ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এবং আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশ ২০২৩ সালের নভেম্বরে চালু হয়। বর্তমানে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণকাজ চলমান। সাম্প্রতিক সময়ে অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় প্রকল্পের মোট ব্যয় থেকে ৭৫৫ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। ফলে প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা।

বরাদ্দ কমানোর ফলে কাজ ব্যাহত হবে কি না-এ প্রশ্নে প্রকল্প পরিচালক বলেন, মতিঝিল-কমলাপুর অংশের বরাদ্দ অপরিবর্তিত থাকায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে সমস্যা হবে না। ভূমি অধিগ্রহণে সাশ্রয় হওয়া অর্থও হাতে রয়েছে, ফলে বাস্তবায়নে বড় প্রভাব পড়বে না।

মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্পে বরাদ্দ সর্বাধিক কমানো হচ্ছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত এই প্রকল্পে ৮ হাজার ৬৩১ কোটি টাকার বরাদ্দ থেকে ৭ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা কাটছাঁট করা হচ্ছে। ফলে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দাঁড়াবে মাত্র ৮০১ কোটি টাকা।

একইভাবে মেট্রোরেল লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পে বরাদ্দ ৬০ শতাংশ কমানো হচ্ছে। ১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকার মধ্যে ৮৯৮ কোটি টাকা ছাঁটাই করে বরাদ্দ ৫৯২ কোটি টাকায় নামানো হচ্ছে।

অন্য মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ কমছে ৭৩ শতাংশ, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে ৬০ শতাংশ এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে ৭১ শতাংশ। ঢাকা-সিলেট চার লেন সড়ক ও হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক প্রকল্পেও বরাদ্দ কমানো হয়েছে।

তবে দুটি মেগা প্রকল্প এই কাটছাঁটের বাইরে থাকছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ১০ হাজার ১১ কোটি টাকার বরাদ্দ অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। আর ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে অতিরিক্ত ১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পটির বরাদ্দ দাঁড়াবে ৪ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত