আত্মোপলব্ধি আত্মনিরীক্ষা আত্মজিজ্ঞাসা

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৩ এএম

মনুষ্যত্বহীন মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রের অনিষ্টের মূল। গুটিকয়েক রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত বিস্তৃত অনিষ্টকারী গোষ্ঠী। তারা নিজের স্বার্থের জন্য, যে কোনো অমানবিক ও পাশবিক কাজ করতে পারে। এমনকি মানুষ হত্যা করতেও তাদের অন্তরে বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয় না। তারা মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও সত্যকে পদদলিত করে সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। যে কারণে সমাজে নেমে আসে অন্ধকার, নষ্ট হয় মূল্যবোধ, ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ ও জাতি। দার্শনিক রেনে দেকার্ত বলেছিলেন, ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি’। এই কথাটির মধ্যে নিহিত রয়েছে আত্মোপলব্ধি, আত্মনিরীক্ষা এবং আত্মজিজ্ঞাসার গভীর বোধ, যা ব্যক্তি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব ও দায়িত্ববোধ নির্ধারণ করে। আমরা কে, কী ভাবি, কেন ভাবি এবং সেই ভাবনা সমাজে কীভাবে প্রতিফলিত হয় এই আত্মসচেতনতার ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রগতির ভিত্তি। দেকার্তের চিন্তা আমাদের শেখায় সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা ঘটে, ব্যক্তি পর্যায় থেকে। যখন একজন মানুষ তার আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধে পরিবর্তন আনে, তখন সেই আলো ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। তখন তা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিফলিত হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে দলীয় নেতাদের একটি অংশ গণমানুষের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন, সেখানে আত্মশুদ্ধির প্রশ্ন সময়োপযোগী। আমাদের ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনি এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক বিচ্যুতি ও গণচেতনা বিস্মৃতির দলিল। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে আদর্শিক রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্ন ছিল সাম্য, মানবিকতা ও গণতন্ত্রের ভিত্তিতে তা স্বাধীনতার পরবর্তী পাঁচ দশকে বহুবার বিকৃত ও পদদলিত হয়েছে। নেতৃত্বের অব্যাহত অবহেলা ও দায়হীনতা দেশের গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায় এবং উন্নয়নের ধারায় বারবার বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এই ব্যর্থতার দায় শুধু অতীতে সীমাবদ্ধ নয়, তা বর্তমানেও বহাল এবং ভবিষ্যতের জন্যও ভয়ংকর ইঙ্গিতবাহী। নেতৃত্বের এই অবজ্ঞা ও আত্মকেন্দ্রিকতা সবসময় আইনের শাসনকে দুর্বল করেছে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকেও ব্যাহত করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনমান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ন্যায্যতার প্রশ্নে রাষ্ট্র ক্রমেই ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে, সময় এসেছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আত্মপুনরাবিষ্কারের ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও জনগণকেন্দ্রিক নেতৃত্বের পথ বেছে নেওয়া। অন্যথায়, তারা ইতিহাসে ঠাঁই পাবে সেইসব শাসকদের তালিকায়, যারা জনগণকে অন্ধকার ছাড়া কিছু দিতে পারেনি। ‘আপনি একজন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী হিসেবে আপনার পেছনে যদি পাবলিকই না থাকে, তাহলে কীসের রাজনৈতিক নেতা! কীসের রাজনৈতিক কর্মী! এমন নেতা হয়ে লাভ নেই।

আপনি কেন সালাম বা শ্রদ্ধা পাচ্ছেন? এ জন্য পাচ্ছেন যে, আপনি জনগণসংশ্লিষ্ট দলের একজন নেতা, সে জন্য কিন্তু আপনি সম্মান পাচ্ছেন, দশটা মানুষের সালাম পাচ্ছেন। এখন কথা হচ্ছে দশটা মানুষ কেন সালাম দিচ্ছে? দশটা মানুষ সালাম দিচ্ছে যে আপনি বিপদে আপদে হোক, বা তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি কাজ করেন, চিন্তা করেন। কিন্তু আপনি যদি এমন কোনো কাজ করেন, যেখানে সে আঘাতপ্রাপ্ত হবে, তখন কি সে আপনার পেছনে থাকবে? সে যদি আপনার পেছনে না থাকে? তাহলে আপনি কীসের নেতা?’ তারেক রহমানের এই বক্তব্য একদিকে যেমন আত্মসমালোচনার ভাষ্য, তেমনি রাজনৈতিক সংগঠনের মূল্যবোধ কী হওয়া উচিত তার দিকনির্দেশনা উঠে এসছে। তিনি আরও বলেছেন, ‘এখন কিন্তু মানুষ অনেক সচেতন। মানুষ আমাদের ওপর আস্থা রাখতে চাচ্ছে, আমাদের ওপরে অর্থাৎ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ওপরে। মানুষ অর্থাৎ, দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ, অর্থাৎ এদেশের ভোটার, তারা বিএনপির ওপরে আস্থা রাখতে চাচ্ছে। এই আস্থা যদি নষ্ট করার জন্য কেউ কোনো কাজ করে, তাহলে ভাই, তাকে তো আমার পক্ষে টানা সম্ভব না। তাকে আমি টানব না। তাকে শেল্টার আমি দেব না। এখানে দলকে স্বার্থপর হতেই হবে। কোনো ব্যক্তি, নেতা বা কর্মীর কারণে যদি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়, তাকে আমরা ওউন করতে পারব না। কারণ আমরা বহু বহু অত্যাচার নির্যাতন ও ঝড়-ঝঞ্ঝার ভেতর দিয়ে আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। কাজেই আমাদের পক্ষে আর সম্ভব না যে কেউ নিজের বিষয়, নিজের স্বার্থ নিয়ে এমন কিছু করবে যেটা দলের স্বার্থকে আঘাত করবে, ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তাকে আমাদের পক্ষে টানা সম্ভব না।’ আজকের বাংলাদেশে মানুষ আগের চেয়ে অনেক সচেতন। তারা চোখে দেখে, কানে শোনে, আর হৃদয়ে বিচার করে। তারা বিএনপির ওপর আস্থা রাখতে চাচ্ছে এটি একটি বড় অর্জন, আবার একই সঙ্গে বড় চ্যালেঞ্জও। এই আস্থা যদি কারও ভুল, দলীয় কোন্দল, মারামারি, খুন-খারাবি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সীমাহীন স্বার্থপরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই ব্যক্তিকে দলে রাখবেন না বলে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন তারেক রহমান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখন বিশ্বাসের সংকট, নেতৃত্ব সংকট এবং আদর্শ সংকট ঘনীভূত, তখন তারেক রহমানের বক্তব্য আশার আলো দেখায়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন নেতৃত্ব মানে শুধু পদ বা অবস্থান নয়, নেতৃত্ব মানে দায়, নেতৃত্ব মানে মানুষের আস্থা রক্ষা ও আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন করা। রাষ্ট্র কেবল নীতি আর আইন দিয়ে চলে না এর প্রাণ হলো নেতৃত্ব। আর সেই নেতৃত্ব যদি দুর্নীতিগ্রস্ত, স্বার্থপর আর জনবিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে কোনো সংবিধানই রাষ্ট্রকে জনগণের পাশে দাঁড় করাতে পারে না। আজকের বাংলাদেশ তারই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছে। বিগত দিনে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী নেতৃত্বের বড় একটি অংশ ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থেই নিয়োজিত ছিল। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর অনিয়ম শুধু অর্থনীতিকে না, ন্যায়ের বোধকেও ধ্বংস করেছে। এই অবস্থার উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোকে ভেতর থেকে গণতান্ত্রিক হতে হবে। জনগণের সমস্যার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। যুবসমাজ ও নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। আদর্শিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। শুধু রাস্তার ময়লা পরিষ্কার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না মন পরিষ্কার করা জরুরি।

প্রয়োজন এমন নেতা বা জননেতা, যিনি সত্যিকার অর্থে জনগণের কথা ভাবেন, আর তাদের সঙ্গে মাটির সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তিনি নৈতিকতা, আদর্শ ও আন্তরিকতা দিয়ে তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও প্রস্তুত থাকেন। রাষ্ট্র বদলাবে তখনই, যখন নাগরিকরা নিজেদের বদলাবে। চিন্তার দৈন্য, আত্মতুষ্টি, ব্যক্তিস্বার্থ আর প্রশ্নহীনতা এই তিন রোগে ভুগছে আজকের বাংলাদেশ। শিক্ষা হয়েছে সার্টিফিকেট-নির্ভর, ধর্মে এসেছে কুসংস্কার, রাজনীতি ডুবে গেছে ক্ষমতা আর দুর্নীতিতে। কারিকুলাম বদলায় কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মনোভাব একই থাকে। আইন বদলায়, বিচারব্যবস্থায় পক্ষপাতিত্ব চলে। ডিজিটাল সেবা আসে, কিন্তু দুর্নীতি যায় না। এমন প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান বলেন, ‘আগে নিজেকে সংশোধন করুন, তারপর অন্যকে বলুন।’ সবার আগে প্রয়োজন আত্মসংস্কার ও আত্মশুদ্ধি। যে নেতা নিজেকে শুদ্ধ করতে পারে না, সে দেশ গড়তে পারে না। যদি সমাজকে পরিবর্তন করতে চান, তাহলে আগে নিজেকে পরিবর্তন করুন। যদি সমাজকে পাল্টাতে চান, তাহলে আগে নিজেকে পাল্টান। আপনি যদি বিপ্লব করতে চান, তাহলে আগে নিজেকে বিপ্লবী হিসেবে তৈরি করুন। আপনি যা-ই করতে চান, তা শুরু হোক নিজেকে দিয়ে। যখন আপনি নিজেকে বদলাতে শুরু করবেন, দেখবেন আপনার এই পরিবর্তনই অন্যদের ছুঁয়ে যাচ্ছে।

সমাজ কিংবা রাষ্ট্রকে যদি সত্যিকার অর্থে সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক করে গড়ে তুলতে চাই, তাহলে প্রথমেই প্রয়োজন সুন্দর চিন্তার মানুষ। কারণ সুন্দর চিন্তার মানুষ যা কিছু করে, তা-ই হয়ে ওঠে সৃজনশীল, অর্থবহ ও কল্যাণকর। তাদের চিন্তা থাকে মানবিক, কর্ম থাকে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পক্ষে এবং দৃষ্টিভঙ্গি থাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক। এই মানুষরাই সমাজে গড়ে তোলে নৈতিকতা, নন্দনবোধ ও মূল্যবোধের ভিত। ফলে সমাজ-রাষ্ট্রের যাবতীয় সৃষ্টি ও কাঠামো হয়ে ওঠে সুন্দর, গঠনমূলক ও টেকসই। আসলে, একটি রাষ্ট্রের সৌন্দর্য তার সড়ক, দালান বা আইন-কানুনে নয়; বরং সেই রাষ্ট্রে বসবাসকারী মানুষের চিন্তা, চেতনা ও দায়িত্ববোধেই নিহিত থাকে। তাই সুন্দর রাষ্ট্র গড়ার যাত্রা শুরু হয় সুন্দর চিন্তার মানুষ তৈরি করার মধ্য দিয়ে। তারেক রহমান, বিএনপির নেতৃত্বকে আদর্শ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। শুধু দায়িত্ব নিয়ে কথা বলেননি, বরং ভুলের শুদ্ধি এবং নেতাদের ব্যক্তিগত চরিত্রকে দল ও জনগণের স্বার্থের ওপরে রাখার বার্তা দিয়েছেন। সময় এসেছে হিংসা, হীনতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সহনশীলতা, সমঝোতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার। রাষ্ট্রকে মানুষের চিন্তা, কর্ম ও নৈতিকতার প্রতিচ্ছবির রূপায়ণ করতে হবে। ব্যক্তি বদলালে সমাজ বদলায়, সমাজ বদলালে রাষ্ট্র বদলায়। আত্মসংস্কারই পরিবর্তনের সূচনা। এটি কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং জাতিগত নবজাগরণের প্রথম ও প্রধান ধাপ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং শান্তি টেকসই হয়েছে। এটি ছাড়া শক্তিশালী গণতন্ত্রের অস্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক কলাম লেখক

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত