সরকার আমলাতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:২৮ এএম

অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করে একতরফাভাবে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে একাধিক অধ্যাদেশ রাষ্ট্র সংস্কারের বদলে দায়মুক্তির ফাঁদ গড়ে তুলছে এবং নিয়ন্ত্রণ ও পুরনো আমলাতান্ত্রিক কৌশল ফের সক্রিয় হচ্ছে। দুদক সংস্কারে কমিশনার সংখ্যা বাড়ানো, নারী কমিশনার ও আইসিটি বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্তি এবং সরাসরি এফআইআর করার ক্ষমতা যোগ করার মতো ইতিবাচক দিক থাকলেও অধ্যাদেশে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়। সংস্কারের নামে যতটুকুই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাস্তবায়নে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর কারণ এ সরকার কার্যত আমলাতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

‘অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্য প্রণয়নে সংস্কার বিমুখতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানম-িতে টিআইবির কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের বিষয় টিআইবির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।

টিআইবির সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘১১টি কমিশন ও কমিটিগুলোর বাইরে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অন্য অনেক খাত, যেমন শিক্ষা, কৃষি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত কোন যুক্তিতে বাদ পড়েছে, এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। গণভোটের সিদ্ধান্ত ছাড়া সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনগুলো বাস্তবায়নের কোনো কর্মকৌশল প্রণীত হয়নি। শুরু থেকে কোনোপর্যায়ে সংস্কার বিরোধী মহলকে চিহ্নিত করে প্রতিহত করার গুরুত্ব অনুধাবন করা হয়নি। বরং এই অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণের ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাতিল হয়েছে। সংস্কার-পরিপন্থী অনেক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমনকি জুলাই সনদকে যুক্তিহীনভাবে লঙ্ঘন করে নেতিবাচক উদাহরণ স্থাপন করা হয়েছে। যার ফলে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংস্কার-পরিপন্থী আইন বা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।’

এতে বলা হয়েছে, ‘সবগুলো সংস্কার কমিশনের আশু বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। অন্যদিকে গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, নারীবিষয়ক, শ্রম ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন এবং অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর শ্বেতপত্রের সুপারিশ বাস্তবায়ন সম্পর্কে কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই।’

পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ সরকার একতরফাভাবে অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খসড়া অধ্যাদেশ স্বল্প সময়ের জন্য লোকদেখানোভাবে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে দায় এড়ানো হয়েছে। অবহেলিত হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো অংশীজনদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হয়েছে। সরকার আইনপ্রণয়ন ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা এবং স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের চর্চার উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেনি।’

সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশকে টিআইবি ‘সংস্কার নয়, পুরনো ব্যবস্থার পুনর্বাসন’ বলেছে। ‘অধ্যাদেশ যেভাবে প্রণীত হয়েছে, তাতে এর স্বাধীন পুলিশ কমিশনের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করা হয়েছে। লোকদেখানো এ অধ্যাদেশে এমন অনেক উপাদান রয়েছে, যাতে তথাকথিত পুলিশ কমিশন অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক ও পুলিশ আমলাদের ক্ষমতার অব্যাহত অপব্যবহারের রিসোর্ট ছাড়া কিছুই হবে না। বাস্তবে এটি পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারের সুরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) ক্ষেত্রে প্রাথমিক খসড়াটি আন্তর্জাতিক মানে সংগত ছিল, তবে তাৎপর্যপূর্ণ সংশোধনের ফলে কমিশন স্বাধীনতা হ্রাস পেয়েছে বলে টিআইবি জানায়। বিশেষ করে, কমিশনার নিয়োগে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

সাইবার সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশে যুগোপযোগী ইতিবাচক বিধান রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে টিআইবি। এতে বলা হয়েছে, ‘তারপরও কর্তৃত্ববাদী আমলের মতো ব্যাপক নজরদারিভিত্তিক শাসনব্যবস্থা চলমান রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে।’

দুদক সংস্কার কমিশনের আশু করণীয় সুপারিশ গুরুত্ব পায়নি অভিযোগ করে টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘অন্য কোনো অংশীজনকে সম্পৃক্ত না করে দুদক ও সরকারি আমলাতন্ত্রের একচ্ছত্র কর্তৃত্বে দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিতের সুপারিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। সংস্কার প্রতিবেদনে দুদকের শীর্ষ কর্তৃপক্ষের যেমন দ্বিমত ছিল না, তেমনি জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর নোট অব ডিসেন্ট ছিল না দুদক সংস্কারে।’

গত দেড় বছরের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘উপদেষ্টা পরিষদ বা মন্ত্রিপরিষদ নামে কর্তৃপক্ষ থাকলেও বাস্তবে অপারেশনাল সিদ্ধান্ত সেখানে নেওয়া হয় না। কোন কাগজে সই হবে, কোন সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে, কোন ধারা বা তারিখ থাকবে কিংবা বাদ যাবে এসব বিষয় উপদেষ্টা পরিষদ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে না। এসব সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে থাকা অত্যন্ত ক্ষমতাবান কিছু ব্যক্তি বা মহলের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এই মহলগুলো শুধু নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থই নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থ এবং কখনো কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের একাংশের স্বার্থও সুরক্ষিত রাখে।’

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশের উদাহরণ দিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘সংস্থাটিকে কার্যকর করার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট কৌশলগত অঙ্গীকার দেখা যায় না। দুদক যদি বাস্তব অর্থে সামান্য হলেও কার্যকর হয়, তাহলে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি হবে।’

টিআইবির সতর্কতা অনুযায়ী, যদি এই অধ্যাদেশগুলো সংশোধন ছাড়া কার্যকর হয়, তাহলে১. দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচারের পথে বাধা সৃষ্টি হবে, ২. তদন্ত-প্রক্রিয়া ও জবাবদিহি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্বল হবে এবং ৩. রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বাড়বে, ফলে ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ চর্চা হবে। টিআইবি বলেছেন, সংস্কারের নামে এমন কাঠামো গড়লে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

টিআইবির অনুরোধ, সরকার-সংশ্লিষ্ট কমিশনগুলোর খসড়া পুনর্বিবেচনা করুক, গঠনপ্রণালিতে স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করুক এবং দ- বা জরিমানাভিত্তিক ‘মার্জিনিং’ অপশন বাদ দিয়ে কার্যকর তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করবে এমন ব্যবস্থাই গ্রহণ করুক। নীতিনির্ধারকদের প্রতি টিআইবি বলেছে, রাষ্ট্র সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ‘স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা’ ঐকমত্যে নিয়ে আসা ছাড়া কোনো অধ্যাদেশ অর্থপূর্ণ নয়। বর্তমান সময়ে জনগণের প্রত্যাশা, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দর্শন অনুযায়ী গভীর ও টেকসই প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার। সেই প্রত্যাশার পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যাদেশগুলোর উপস্থাপনা ও বাস্তবায়ন যদি জনগণের আস্থা অর্জন করতে না পারে, তাতে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং নাগরিক অসন্তোষ বাড়ারও প্রেক্ষাপট তৈরি হবে তাই দ্রুত সংশোধন ও স্বচ্ছতা দাবি করছে টিআইবি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত