জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তত ২৮টির বেশি রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করেছে। এবার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করা একাংশ ও বামপন্থি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন অ্যাকটিভিস্টদের নিয়ে আরও একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। ‘জনযাত্রা’, ‘পিপলস মার্চ’, ‘গণসফর’, ‘ইজতেহাদ’ কিংবা ‘পিপলস অ্যাকশন’ এর মধ্যে একটি সম্ভাব্য নাম আলোচনায় থাকলেও দলটির খসড়া ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে ‘নিউ পলিটিক্যাল অ্যাকশন’ (এনপিএ) নামে। আজ শুক্রবার বিকেল তিনটায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে নতুন এই প্ল্যাটফর্মটির আনুষ্ঠানিক যাত্রার ঘোষণা করা হবে। পাঁচ মূলনীতি এবং সাত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এনপিএ তাদের কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষাই এদের মূলমন্ত্র। দেশ রূপান্তরের হাতে থাকা নতুন এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফমটির্র ৯ পৃষ্ঠার খসড়া ঘোষণাপত্রে ‘সর্বস্তরে’ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নতুন বয়ান নিয়ে এসেছে এই রাজনৈতিক সংগঠনটি। ঘোষণাপত্রে তারা বলছে, কেবল জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত হলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। এমন এক গণতন্ত্র চায়, যেখানে সংখ্যালঘু, দুর্বল, প্রান্তিক ও ক্ষমতাহীন সবার আওয়াজ শোনা যাবে এবং নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত হবে।
সাম্য ও সমঅধিকার বিষয়ে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি তার জন্মলগ্ন থেকেই কার্যত বাঙালি, মুসলমান ও পুরুষের রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্র এখানে আদিবাসী হিসেবে বাঙালি ব্যতীত অন্য জাতিগোষ্ঠীকে স্বীকার করেনা। অমুসলিম জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যান্য প্রান্তিক লিঙ্গ পরিচয়সমূহেরও কোনো সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। তাই লিঙ্গ, জাতিগোষ্ঠী এবং ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষের নিরাপত্তা, সমমর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধায় সমান অধিকার নিশ্চিত করাই শুধু নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার দায়িত্বে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও অংশীদারত্বও নিশ্চিত করা।
সংবিধান সংস্কারবিষয়ে দলটির ভাষ্য, ১৯৭২ সালের সংবিধানে ও পরবর্তী সময়ে সংশোধনীসমূহে বারবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় জনগণের সেই মালিকানাকে অস্বীকার ও হরণ করা হয়েছে। আমরা সংবিধানের এমন সংস্কারের পক্ষে কাজ করতে চাই, যা সংবিধানের বর্ণিত রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেবে ও বাংলাদেশ সংবিধানকে জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের জনগণ তাদের মৌলিক, নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এমন একটি রাষ্ট্র তৈরিতে অবদান রাখতে চায়, যা প্রতিটি নাগরিকের জন্য মানসম্মত ও গণতান্ত্রিক শিক্ষা নিশ্চিত করবে এবং জনগণের সুস্বাস্থ্যের দায়িত্ব নেবে। প্রতিটি পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যের কর্মসংস্থান ও সম্মানজনক জীবনধারণের উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করা এবং কর্মবিহীন নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা বলয়ে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সবার অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ ও শ্রেণি নির্বিশেষে নাগরিক হিসেবে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, যেকোনো জুলুম-নিপীড়নের বিরুদ্ধে নাগরিককে আশ্রয় দেবে ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে, এবং প্রতিটি নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের বিষয়ে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে সরকার, সরকারপ্রধান ও সরকার গঠনকারী দলের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবমুক্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। আমরা আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ ও কার্যকর পৃথকীকরণ চাই। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের জন্যে শক্তিশালী, আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং কেন্দ্রের প্রভাবমুক্ত স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই।
অর্থনৈতিক রূপান্তর প্রশ্নে তারা বলছেন, কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, কৃষিঋণের সহজলভ্যতা, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি প্রদান এবং শিল্পশ্রমিকদের জন্য ন্যায্য ও সম্মানজনক মজুরি কাঠামোসহ নিয়মিত মজুরি ও ভাতা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। প্রগতিশীল করব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, রাষ্ট্রীয় আয় বৃদ্ধি এবং সেই আয়ের মাধ্যমে জনগণের সেবায় গড়ে তোলা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সারা দেশে প্রতিটা নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।
দলটির খসড়ায় বলা হয়েছে, বিগত আমলে গ্রহণ করা সর্বগ্রাসী উন্নয়ন প্রকল্প ও মেগা-প্রকল্পগুলোয় দেশের প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনটি অগ্রাহ্য করা হয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি উপেক্ষা করে প্রতিবেশী দেশ দ্বারা আমাদের নদীগুলোর ওপর বাঁধ, ব্যারাজ ও ড্যাম নির্মাণ এবং পানি প্রত্যাহারের ফলে বহু নদী শুকিয়ে মরেছে; অন্যদিকে দেশীয় নদীখেকো দস্যুদের দৌরাত্ম্যে অসংখ্য নদী-নালা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। খাল-বিল ভরাট ও বনজঙ্গল উজাড় করে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ ধ্বংসকারী শিল্পায়ন, মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণ, প্লাস্টিক-সিসা বা লেড-দূষণ এবং রাজধানী ও শহরমুখী জনস্রোত বাংলাদেশকে ক্রমাগতভাবে অবসবাসযোগ্য করে তুলছে। প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ঘোষণা হতে যাওয়া এই দলটির উদ্দেশ্য।
ওরা কারা : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২২ বছর আগে রাজধানীর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ক্যাম্পাসে নিহত বুয়েট ছাত্রী সাবেকুন নাহার (সনি) হত্যাকা-ের প্রতিবাদে গড়ে উঠা আন্দোলনের সামনের সারির সংগঠক ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের বুয়েট নেতা অনুপম সৈকত শান্ত এই প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলতে দেশের বাইরে থেকে একবছর আগে থেকে সক্রিয় ছিলেন। সঙ্গে য্ক্তু হয়েছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বাম ও মধ্যপন্থি ভাবাদর্শের অনেকে। এরমধ্যে রয়েছেন গত সেপ্টেম্বরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে পদত্যাগ করা অনিক রায়, মঈনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) ও অলিক মৃ। তাদের মধ্যে অনিক রায় বামধারার ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। পরে এনসিপিতে যোগ দিয়ে দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছিলেন তিনি। লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট তুহিন খান ছিলেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব। আর আদিবাসী ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সাবেক নেতা অলিক মৃ ছিলেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক। এ ছাড়া নতুন প্ল্যাটফর্মে আরও থাকছেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি বাকী বিল্লাহ, লেখক ও গবেষক মীর হুযাইফা আল মামদূহ, লেখক ফেরদৌস আরা রুমী, ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক নাজিফা জান্নাত, সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু, সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদসহ অনেকে। বিভিন্ন মতাদর্শের তরুণ অ্যাকটিভিস্ট, ছাত্রনেতা, বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর অনুসারীরা এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হবেন বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।
সাংগঠনিক কাঠামো গঠনের বিষয়ে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুরুতেই ১০১ বা ১২০ সদস্য কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হবে। তবে এখনই সরাসরি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ শুরু হচ্ছে।’
এনপিএ-এর অন্যতম উদ্যোক্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মীর হুযাইফা আল মামদূহের অভিমত, এনসিপি থেকে বের হয়ে এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি হচ্ছে না। বরং এই প্ল্যাটফর্ম তৈরির জন্য বহু আগে থেকেই আলাপ-আলোচনা চলমান ছিল। আবার এনসিপির সাবেক কয়েকজনও থাকবেন এই প্ল্যাটফর্মে।
