জীবাশ্ম জ্বালানির ফাঁদ!

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:২৪ এএম

চলতি জানুয়ারি মাসেই, গণঅভ্যুত্থানের ফসল অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে একটি ২৫ বছর মেয়াদি জ্বালানি নীতির খসড়া প্রস্তাবনা জমা পড়েছে। এর নাম ‘জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত মাস্টার প্ল্যান (ঊচঝগচ) ২০২৬-২০৫০’। প্রস্তাবটি এখন অনুমোদনের অপেক্ষায়। বলা হচ্ছে, এই পরিকল্পনাটি তিনটি পৃথক পর্যায়ে বাস্তবায়িত হবে এবং এতে দেশ আরও টেকসই এবং নিরাপদ জ্বালানি ভবিষ্যৎ পাবে। প্রকৃতপক্ষে, নীতিমালাটি একটি পথনকশা (রোডম্যাপ) হিসেবে কাজ করবে। আরও বলা হচ্ছে এই নীতিটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি-২০২৫ এবং মার্চেন্ট পাওয়ার নীতি-২০২৫-এর আলোকেই প্রণীত হয়েছে। যার প্রধান লক্ষ্য, জ্বালানি খাতকে আধুনিকীকরণ এবং সরকারের আর্থিক বোঝা কমিয়ে আনা। প্রথমেই বলে নেওয়া জরুরি, খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমেই এই খবরটি জানা গিয়েছে যে, সরকার এমনি এই গুরুত্বপূর্ণ (!) কাজ করেছে। কারণ এই নীতি প্রণয়নের জন্য অংশীজনদের কোনো মতামত গ্রহণ করা হয়নি; এমনকি বৃহত্তর নাগরিক সমাজেরও কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। উপরন্তু নীতিমালাটি কারা, কীভাবে প্রণয়ন করল, তাও জানা যায়নি। নীতিমালাটি অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়ার পরই খবরটি প্রকাশিত হয়। যতদূর জানা গেছে, এই মাস্টার প্ল্যানটি ২৫ বছরের সময়কে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যার প্রাথমিক লক্ষ্য ২০২৫ সালের বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১৭ গিগাওয়াট হতে ২০৫০ সালের মধ্যে তা ৫৯ গিগাওয়াটে উন্নীত করা। প্রথম পর্যায় ২০২৬-২০৩০ সালের মধ্যে অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান, পরিশোধন ক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং অতি-অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। দ্বিতীয় পর্যায় ২০৩০-২০৪০ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা এবং তৃতীয় পর্যায় ২০৪০-২০৫০ সালের মধ্যে উচ্চ-প্রযুক্তি শক্তি (হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া, কার্বন ক্যাপসার ও স্টোরেজ-সিসিএস) এবং ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থাৎ পরিষ্কার বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি শক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা।

এই নীতি বাস্তবায়নে সরকারের কৌশলগত পদক্ষেপটি হচ্ছে, জীবাশ্ম জ্বালানি হতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর ঘটানো। ২০৩০ সালের মধ্যেই ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৬,১৪৫ মেগাওয়াট জ্বালানি স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা। ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ অর্থাৎ ১৭,৪৭০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা। ২০৫০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি শক্তি অর্জন করা। এজন্য ঐতিহ্যবাহী সৌর ও বায়ু হতে জ্বালানি উৎপাদন করার পাশাপাশি হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া ও সিসিএস ব্যবহার করেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদকদের জন্য ১০ বছরের পূর্ণ কর ছাড় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সার্টিফিকেট (জঊঈ) দেওয়ার প্রথা চালু করার কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাবিত নীতিমালায়, পূর্ণমাত্রায় দেশীয় সম্পদ ব্যবহারের চেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে। কারণ আমাদের এ যাবৎকালের পরিকল্পনা ছিল আমদানিনির্ভর। ২৫ বছরের পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমুদ্র হতে গ্যাস উত্তোলন করার কথা বলা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, এতে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের প্ল্যান্ট (মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট) তৈরি এবং সরাসরি বৃহৎ গ্রাহকদের কাছে তা বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া হবে, যা সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনা কৌশলের পাশাপাশি একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করবে। এ ছাড়াও নবায়নযোগ্য শক্তি বিতরণের জন্য স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থাপনা করা হবে। অবশ্য, এটি ২০৪০ সাল পরবর্তী সময়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে দুটি। এক. অন্তর্বর্তী সরকার এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে কিনা!  দুই. এই নীতিমালায় যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো কী আদৌ পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়! আমরা প্রথম প্রশ্নটি নিয়ে যদি কথা বলি, তাহলে বলা যায়, এই সরকার কিন্তু শুধু নির্বাচন আয়োজনের জন্য একটি অন্তর্বর্তী সরকার নয়। এই সরকার ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ফসল। গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটিয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রেক্ষাপটে এই সরকার গঠিত হয়েছে। শুরুতে বলা হয়েছিল, সরকার রাষ্ট্র কাঠামোর নানা স্তরে সংস্কার করবে। এ লক্ষ্যে অনেক কমিটি তৈরি করা হয়। কমিটিগুলো তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। যদিও জমা দেওয়া সুপারিশ কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে বা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেই সম্পর্কে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। শুধু সংবিধানের কিছু ধারা পরিবর্তনের সুপারিশ নিয়ে কাজ হচ্ছে। কিছু প্রস্তাবনায় রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য পোষণ না করায়, সেগুলো গণভোটে দেওয়া হচ্ছে। এ সময়ে সরকারের রুটিন ওয়ার্কের বাইরে, কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আছে কিনা, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি তা হচ্ছে এই প্রস্তাবনার বিষয়গত দিক। এখানে কয়েকটি প্রশ্ন রয়েছে, তা হচ্ছে : প্রস্তাবনাটি কী সত্যিই নবায়নযোগ্য বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে উৎসাহিত করছে? ২০৪০ সালে যে পরিমাণ বিদ্যুতের (৫৯ গিগাওয়াট) প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হয়েছে, তা-কি যুক্তিসঙ্গত? পরিচ্ছন্ন জ্বালানির লক্ষ্য পূরণের জন্য আমদানিভিত্তিক এলএনজির ওপর জোর দেওয়া এবং তেমন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা কী যুক্তিসঙ্গত? এলএনজি কী পরিচ্ছন্ন জ্বালানি? এ ছাড়াও হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া, সিসিএস এগুলোও কী পরিচ্ছন্ন জ্বালানি? অতীত সরকারের সময় দেখেছি, বিদ্যুৎ খাতে তারা যে চাহিদা নিরূপণ করেছিল, তা আমরা অর্জন করতে পারিনি বা প্রয়োজন হয়নি। অথচ ওই লক্ষ্য ধরে বিনিয়োগ হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বেড়েছে।  এর ফলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত এই অব্যবহৃত বা অলস বিদ্যুতের জন্যও দেশকে তার মূল্য (ক্যাপাসিটি চার্জ) পরিশোধ করতে হয়েছে। বছরে বছরে এর পরিমাণ বেড়েছে। ২০২০ সালে এর পরিমাণ ছিল ১২শ মিলিয়ন বা ১২০ কোটি ইউএস ডলার। যা ২০২৫-এ দাঁড়িয়েছে উনিশশ পঞ্চাশ মিলিয়ন বা ১৯৫ কোটি ইউএস ডলার। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ৫৯ গিগাওয়াট হবে বলে অনুমান করা হয়েছে। এটি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে হয়। এতে আগের সরকারের মতো ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের পরিমাণ দিন দিন বাড়বে। এর অর্থ হলো রাষ্ট্র বা জনগণের টাকা কয়েকটি বিদ্যুৎ কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার আগের সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। যা একটি গণঅভ্যুত্থানের সরকারের নিকট হতে একেবারেই প্রত্যাশিত নয়।

আমরা আমদানিনির্ভর এলএনজিভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে চাইছি। এ খাতে ব্যয় হতে পারে ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। এখন প্রশ্ন, এলএনজি কী নবায়নযোগ্য জ্বালানি? না, মোটেই তা নয়; এটিও জীবাশ্ম জ্বালানি। তাহলে আমরা কেন এত বিশাল বিনিয়োগ করে আবারও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক একটি অবকাঠামো গড়ে তুলতে চাইছি! এই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে, আমাদের আবারও সেই জীবাশ্ম জ্বালানির ঋণ-ফাঁদে আটকা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাধারণভাবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বলতে, যদি আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি বুঝে থাকি তাহলে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ-ই উত্তম পন্থা। হাইড্রো বা জল-বিদ্যুতে নানাবিধ পরিবেশ-সামাজিক প্রতিক্রিয়া আছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। যত বড় জল-বিদ্যুৎ প্রকল্প, তত বেশি ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া। এতে মানুষ স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়। যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এ কারণে জল-বিদ্যুৎ পরিচ্ছন্ন হলেও তাকে উৎসাহিত করা হয় না। হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া কো-ফায়ারিং, সিসিএস- এর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্বালানিকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। এগুলো ভুয়া-প্রযুক্তি বা ফলস সল্যুশন। অথচ আমরা সেই দিকে ধাবিত হবো বলে পরিকল্পনা করেছি। এ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, যাদের হাতে এই প্রযুক্তি আছে, তারা এই নীতি প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। সার্বিকভাবে বলা যায়, জীবাশ্ম জ্বালানি লবি অতীতের সরকারের ন্যায় বর্তমানের গণঅভ্যুত্থানের সরকারের ঘাড়েও সিন্দাবাদের ভূতের মতো চেপে বসে আছে এবং তারা এই মাস্টার প্ল্যান তৈরি করিয়েছে। 

প্রকৃতপক্ষে, প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিকাশের নামে আবারও জীবাশ্ম জ্বালানির ফাঁদে আটকে অপরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে রক্ষা ও বিকশিত করতে চলেছি। এ কারণেই প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনাটি সরকারের অনুমোদন না করা উচিত। 

লেখক: চেয়ারপারসন, সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ (সিইপিআর) এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও প্রধান নির্বাহী, কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক-(ক্লিন)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত