ফেনী- ৩

জয়-পরাজয়ের জটিল সমীকরণে বড় 'ফ্যাক্টর' আওয়ামী লীগের ভোট

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম

ভোটের মাঠে অনুপস্থিতির পরও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ (দাগনভূঞা-সোনাগাজী) আসনে জয়-পরাজয়ের জটিল সমীকরণ বড় ফ্যাক্টর হয়েছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটার। বিগত ৩ টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত জোটবদ্ধ নির্বাচন করলেও পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আলাদাভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করছে। জামায়াত জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে আলাদা নির্বাচন করছে। 

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি বিশাল ভোটার ভিত্তি রয়েছে, যা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। তাই এবারের ভোটের মাঠের সমীকরণে যুক্ত হয়েছে ভিন্ন মাত্রা। এই আসনে লড়াই কেবল ব্যক্তি বা দল কেন্দ্রিক নয়, বরং ভোটার পরিসংখ্যান, সাংগঠনিক শক্তি ও ভোট বিভাজনের অঙ্কও মুখ্য হয়ে ওঠেছে।

আসনটিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ আবদুল আউয়াল মিন্টু, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ফখরুদ্দিন মানিক, ইসলামী আন্দোলনের সাইফুদ্দিন শিফন। পাশাপাশি মাঠে রয়েছে জাতীয় পার্টির মো. আবু সুফিয়ান, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের আবু নাছের, সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আবদুল মালেক, খেলাফত আন্দোলনের মোহাম্মদ খালেদুজ্জামান পাটোয়ারী ও ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের হাসান আহমদ।

ফেনীর তিনটি সংসদীয় আসনের মধ্যে এ আসনটিতে সর্বোচ্চ ভোটার রয়েছে। এখানে মোট ভোটার ৫ লাখ ৮ হাজার ১৯৪ জন। এর মধ্যে মহিলা ভোটার রয়েছে ২ লাখ ৪৫ হজারের মত।

পূর্বের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপি জামায়াত আলাদাভাবে নির্বাচন করেছে। ১৯৯১ সালে এ  আসনে জামায়াত পেয়েছে ১১ হাজার ৮৬৮ ভোট। এবং বিএনপির পেয়েছে ৪০ হাজার ৪০৬ ভোট। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ পেয়েছে ৩৪ হাজার ৪৬৭। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালে আসনটিতে জামায়াত পেয়েছে ৮ হাজার ৪০৩ ভোট, বিএনপি পেয়েছে ৫৮ হাজার ৪৩৯ ভোট। আওয়ামী লীগ পেয়েছে ৪২ হাজার ১৮২ ভোট। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে এ আসনে  জামায়াতের গড় ভোট ১০ দশমিক ২১ শতাংশ ও  বিএনপির ৪৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগের ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশ। তবে ২০০১ ও ২০০৮ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটবদ্ধ নির্বাচন করেছিল। ২০০১ সালে জোটের প্রার্থী অর্থাৎ বিএনপি পেয়েছিল ৯৪ হাজার ৩২১ ভোট, আওয়ামীলীগ পেয়েছিল ৪২ হাজার ১১২ ভোট।  ২০০৮ সালে বিএনপি পেয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯৩৯ ভোট, যা মোট ভোটের ৪৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। আওয়ামী লীগ পেয়েছে  ৯৩ হাজার ৬৩০ ভোট,যা মোট ভোটের ৩৯ দশমিক ০৬ শতাংশ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন দলের বাক্সে ভোটের হিসাব-নিকাশ এবারের নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে কার্যকর কতটা হবে হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ আসটিতে রয়েছে ইসলামী আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সমর্থক। দুই উপজেলায় রয়েছে বিপুল সংখ্যক কওমি মাদরাসা। এ মাদরাসা শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের ভোটাররা ইসলামী আন্দোলনের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। ইতিপূর্বের জাতীয় নির্বাচনে এ ভোট বিএনপি ও বিএনপি জোটের বাক্সে পড়েছে। এবারের নির্বাচনে  জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে ইসলামী আন্দোলন পৃথক নির্বাচন করার কারণে ভোট কমবে বিএনপির।

এ আসনে  তরুণ ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৩১ হাজার ৭৪৫ জন। তরুণদেও একাংশের মাঝে জুলাই চেতনা, আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর প্রত্যাশিত রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে না উঠার হতাশা, আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো ইউনুস সরকারের সময়ে অব্যাহত থাকার ক্ষুব্ধতা ও হতাশাগ্রস্ত ভোটারের হাতে ঘটে যেতে পারে জয়-পরাজয়ের হিসাব।

বিএনপির প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর রয়েছে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সক্রিয়তা,ব্যক্তিগত প্রভাব ও নির্বাচনী আসনে বিএনপির বিপুল ভোট ব্যাংক। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ফখরুদ্দিন মানিকের নিজস্ব অবস্থানের পাশাপাশি সাংগঠনিক শক্তি ও কর্মী সমর্থকদের সক্রিয়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এ আসনটিতে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে তারা কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে চান। যার মধ্যে কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক সামাজিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা,সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ, সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য স্থানীয় উন্নয়ন।

তবে সবকিছু চাপিয়ে জয়-পরাজয়ের জটিল সমীকরণে আওয়ামী লীগের ভোটাররা একটি বড় ফ্যাক্টর। কারণ তাদের ভোট নির্বাচনে থাকা দল (বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন) নিজেদের পক্ষে টানার জন্য নানা কৌশলে কাজ করছে। এই তিন দলের মধ্যে যাদের পক্ষে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পড়বে তারাই বিজয়ের পথে এগিয়ে থাকবে। তবে দলের নির্দেশনা মেনে আওয়ামী সমর্থক ভোটাররা ভোটদানে বিরত থাকলে ফলাফল নির্ধারণে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানিয়েছেন, তাদের সমর্থক ও সমমনাদের  ভোট বর্জন করার নির্দেশনা দেওয়া আছে।

নির্বাচনে প্রধান তিন প্রতিদ্বন্দ্বী আবুল আউয়াল মিন্টু,ফখরুদ্দিন মানিক, সাইফুদ্দিন শিফন নির্বাচনী প্রচারণায় ভোটারদের প্রত্যাশা পুরণে অঙ্গিকার ব্যক্ত ও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আওয়ামী সমর্থক বিপুল ভোটারদের ভোট নিজেদের পক্ষে নিতে কি পদক্ষেপ নিচ্ছেন সে বিষয়ে তারা খোলাসা করে কিছু বলছেনা । বক্তব্য জানতে ফোন দিলেও রিসিভ করেননি তারা।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত