প্যারোলে মুক্তি না দিয়ে বাগেরহাটের নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী-সন্তানের লাশ কারাফটকে নিয়ে দেখানোর ঘটনায় তোলপাড় চলছে। গত শুক্রবার বাগেরহাটের বাড়িতে সাদ্দামের স্ত্রী ও শিশুসন্তানের লাশ উদ্ধার করা হয়। স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় অংশ নিতে সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি দিতে বাগেরহাটে আবেদন করে তার পরিবার। কিন্তু সাদ্দাম যশোরে থাকায় তার প্যারোলের বিষয়ে জেলা প্রশাসন কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। তাদের লাশ যশোর কারাগারে নিয়ে দেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী দুজনের লাশ যশোর কারাফটকে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে ব্যাপক সমালোচনা। ‘মৃত শিশু জীবিত বাবাকে দেখতে কারাগারে’ এমন শিরোনামে অনেকে প্রচার চালান। বলা হয়, সরকার ও প্রশাসন এখানে মানবিক আচরণ করেনি। সাদ্দামের পরিবারের করুণ পরিণতি নিয়েও অনেকে বিচারব্যবস্থার সমালোচনা করেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেছে। যদিও সরকার এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরিবারের পক্ষ থেকে প্যারোলের আবেদন করা হয়নি। আবেদন করা হলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে এ ঘটনার সমালোচনা করেন।
অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ এ ঘটনার সমালোচনা করে ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ইউনূস সাহেব বলেছিলেন ‘আমরা এখন সভ্যতায় প্রবেশ করেছি।’ মানুষ পিটিয়ে পুড়িয়ে মারা, মবসন্ত্রাস, জবরদস্তি, হেফাজতে মৃত্যু, আটক বাণিজ্য, বিনা বিচারে মাসের পর মাস মানুষদের আটকে রাখা, হতাশায় শিশু-সন্তানকে নিয়ে স্ত্রীর আত্মহত্যার পরও তাদের দেখতে যেতে না দেওয়া, শুধু পরিচয়ের কারণে নির্যাতন নিরাপত্তাহীনতা এগুলো সবই ইউনূস সভ্যতার কিছু নমুনা!
এদিকে, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ‘নিষিদ্ধ’ ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির জন্য তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আবেদন করা হয়নি। বরং মানবিক কারণে জেল কোড অনুযায়ী কারাফটকে নিহত স্ত্রী-পুত্রের লাশ দেখানো হয় তাকে। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ভিন্ন আঙ্গিকে অতিরঞ্জিত করে খবরকে উপস্থাপন করায় তার প্রতিবাদ জানিয়েছে যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং যশোর কারাগারের জেল সুপার। এ ঘটনাকে পরিকল্পিতভাবে ভিন্ন রূপ দিতেই এ রকম কল্পকাহিনি তৈরি করে মিডিয়াতে প্রকাশ করা হয়েছে বলে এক প্রতিবাদলিপিতে জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর বাগেরহাট জেলা কারাগার থেকে জুয়েল হাসান সাদ্দামকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। অদ্যাবধি তিনি এই কারাগারে অন্তরীণ আছেন। জেল কোড অনুযায়ী বন্দির সঙ্গে তার আত্মীয়স্বজন যশোর কারাগারে দেখা সাক্ষাৎও করেছেন। কিন্তু হঠাৎ করে গত শনিবার রাত ৮টার দিকে কারাগারের মেইন গেটের সামনে একটি অ্যাম্বুলেন্স আসে। সেটি কারাগারের অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি চায়। কারারক্ষীরা জানতে পারেন ওই অ্যাম্বুলেন্সে দুটি কফিনে সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালি ও তার ছেলে সেজাদ হাসান নাজিফের লাশ রয়েছে। লাশ দুটির স্বজন যশোর কারাগারে বন্দি আছেন। তাকে লাশ দুটি একনজর দেখাতে তারা বাগেরহাট থেকে যশোর কারাগারে এসেছেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিক কারাগারের জেলার আবিদ আহমেদ ও সুপার আসিফ উদ্দীনকে অবহিত করা হয়। জেল কর্র্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক বিষয়টি যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানকে অবহিত করেন। একই সঙ্গে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কারা কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়। পরে পরিবারের মৌখিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কারা কর্র্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে মানবিক দিক বিবেচনায় কারাফটকে দ্রুত লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করেন।
বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন জেলার আবিদ আহমেদ। এ ব্যাপারে জেল সুপার মোহাম্মদ আসিফ উদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুতে প্যারোলে মুক্তি-সংক্রান্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা সত্য নয়। মূল ঘটনাকে আড়াল করতেই এমন একটি মিথ্যা গল্প সাজানো হয়েছে। বরং যশোর কেন্দ্রীয় কারা কর্র্তৃপক্ষ মানবিক কারণে বন্দির সঙ্গে তার স্বজনদের লাশ দেখানোর জন্য দ্রুত যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা প্রশংসনীয়।
অন্যদিকে, যশোর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান এক বিবৃতিতে বলেছেন, জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তান মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, যশোর কিংবা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্র্তৃপক্ষ বরাবর প্যারোলে মুক্তির কোনো ধরনের আবেদন করা হয়নি। বরং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পরিবারের বক্তব্য থেকে জানা যায়, সময় স্বল্পতার কারণে তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্তে প্যারোলে মুক্তির আবেদন না করে জেল গেটে লাশ দেখানোর সিদ্ধান্ত হয়। ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টে উল্লিখিত বন্দির স্ত্রীকে লিখিত চিঠি, কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছবি দেখা যাচ্ছে, যা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। এসবই পরিকল্পিত। এ ছাড়া আবেদনের পরেও প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি, এ ধরনের তথ্যও মিথ্যা। কারণ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, যশোর বরাবর প্যারোলে মুক্তি-সংক্রান্ত কোনো আবেদনই করা হয়নি। বরং পরিবারের মৌখিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কারা কর্র্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে মানবিক দিক বিবেচনায় কারাফটকে লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করে।
জানা গেছে, স্বর্ণালী ও তার পরিবার এবং সাদ্দামের পরিবার তাকে কারামুক্ত করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু স্বামীকে কারামুক্ত না করতে পেরে তিনি কিছুটা মানসিক চাপে ছিলেন। গত ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে বাগেরহাট কারাগারে প্রথম পুত্রসন্তানের মুখ দেখেন বন্দি সাদ্দাম হোসেন। তখন তিনি তার স্ত্রীকে দ্রুত তাকে কারামুক্ত করার জন্য সব রকমের উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দেন। এরই মধ্যে গত ১৫ ডিসেম্বর সাদ্দাম হোসেনকে বাগেরহাট জেলা কারাগার থেকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। এরপর যশোর কারাগারেও সন্তানসহ তার স্ত্রী বন্দি সাদ্দামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কিন্তু গত ২৩ জানুয়ারি দুপুরে প্রথমে ৯ মাসের শিশুসন্তানকে বালতির পানিতে চুবিয়ে হত্যার পর নিজেও শোবার ঘরে গলাই ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন সুবর্ণ স্বর্ণালী। সাদ্দামের বাড়িতে তার মা, বোন, স্ত্রী ও সন্তান একসঙ্গে বসবাস করতেন।
সাদ্দামের চাচাতো ভাই সাগর ফারাজী বলেন, শুক্রবার বিকেলে বাগেরহাট সদর থানা পুলিশ লাশ দুটি উদ্ধার করে বাগেরহাট সদর হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। শনিবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ দুটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। জানাজা না পড়িয়েই অ্যাম্বুলেন্সে করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্দেশে রওনা হই। আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন না করে সরাসরি লাশ দুটি তাকে একনজর দেখানোর জন্যই যশোরে নিয়ে যাই। রাত ৮টার দিকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের মূল ফটকের সামনে পৌঁছে কারাগারের জেলারকে খবর দিলে তিনি বেশ কিছু সময় পরে আমাদের অ্যাম্বুলেন্সটি ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেন। এরপর সেখানে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর পুলিশ প্রহরায় বন্দি সাদ্দাম হোসেনকে অ্যাম্বুলেন্সের কাছে নিয়ে আসা হয়। তার স্ত্রী ও সন্তানের লাশটি শেষবারের মতো দেখিয়ে নিয়ে আমরা রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাগেরহাটের উদ্দেশে রওনা হই।
সন্তানকে হত্যার পর মায়ের আত্মহত্যার ঘটনায় বাগেরহাট সদর থানায় দুটি পৃথক হত্যা মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। মামলা দুটির বাদী নিহত সুবর্ণ স্বর্ণালীর পিতা জাপা নেতা রুহুল আমিন হাওলাদার। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা : স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক বন্দি জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুতে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক বন্দি জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে তার পরিবারের পক্ষ থেকে যশোর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্র্তৃপক্ষ বরাবর কোনো আবেদন করা হয়নি। সাদ্দামের পরিবারের মৌখিক অভিপ্রায় অনুযায়ী যশোর জেলগেটে স্ত্রী ও সন্তানের লাশ দেখানোর সিদ্ধান্ত হয়। মানবিক দিক বিবেচনা করে এ বিষয়ে যশোর জেলা প্রশাসন ও যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় যশোর জেলা প্রশাসক বা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্র্তৃপক্ষ বরাবর প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হয়েছে মর্মে প্রকাশিত সংবাদটি সঠিক নয়।
বাগেরহাটের ডিসি-এসপিকে ফোন করে ‘হুমকি’ : এদিকে গতকাল রবিবার বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারকে (এসপি) ফোন করে হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একাধিক বিদেশি নম্বর থেকে তাদের দাপ্তরিক হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করার পর হুমকি দেওয়া হয়। গালাগাল করে হুমকি দেওয়ার একটি অডিও ক্লিপও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে শোনা যায়, এসপি ফোন রিসিভ করার পর থেকে অন্যপ্রান্ত থেকে গালাগাল করে বলা হয়, ‘এই...কী করছস, সাদ্দামের লগে কী করছস...।’ হুমকি দিয়ে বিভিন্ন বিদেশি নম্বর থেকে ফোন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী।
