ভালো সরবরাহ থাকার পরও রমজানকেন্দ্রিক বাড়তি চাহিদার কিছু কিছু পণ্যের বাজারমূল্য খানিকটা বেশি। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের মূল্য অনেক কমেছে; কিন্তু দেশে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। কোনো কোনো পণ্য দেশে বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে। অর্থাৎ গত বছর রোজার আগে এসব পণ্যের যে দাম ছিল, এ বছর সেগুলোই খানিকটা বাড়তি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা’বিষয়ক টাস্কফোর্সের দশম সভায় কমিশনের পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। বাণিজ্য সচিব মো. মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। উপস্থিত ছিলেন ভোগ্যপণ্যের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা।
এই প্রতিবেদনে বেশ কিছু ভোগ্যপণ্যের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারদরের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে গত বছরের তুলনায় বর্তমানে পণ্যমূল্যের তুলনামূলক চিত্র রয়েছে। এতে দেখা গেছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত পাম অয়েলের দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ কমে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু দেশের বাজারে পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি দামে। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ান মসুর ডাল ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং ভারতীয় মসুর ডাল ৯ শতাংশ কম দামে বিক্রি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। অথচ দেশের বাজারে গত বছরের চেয়ে বর্তমানে মাঝারি দানার মসুর ডাল ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং ছোট দানার মসুর ডাল ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। সব ধরনের চালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে গত বছরের তুলনায় অন্তত ১৮ শতাংশ কম। কিন্তু দেশের বাজারে গত বছরের তুলনায় মোটা চাল ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, মাঝারি মানের চিকন চাল ২ দশমিক ৪৪ এবং চিকন চাল শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজ আন্তর্জাতিক বাজারে ২২ দশমিক ৬২ শতাংশ কমলেও স্থানীয় বাজারে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রসুনের দাম ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমলেও দেশের বাজারে ১৯ শতাংশ কমেছে।
তবে কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে স্থানীয় বাজারেও পণ্যের মূল্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থা লক্ষ করা গেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে চিনি। বিশ^বাজারে পরিশোধিত চিনির দাম ১৫ দশমিক ৪৯ এবং অপরিশোধিত চিনির দাম ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ কমেছে। দেশের বাজারেও পণ্যটির দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ কম দামে বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম বাড়তি, দেশেও বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে। ছোলার দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বাজারেও কম দামে বিক্রি হচ্ছে। যদিও রোজা উপলক্ষে ইতিমধ্যেই ছোলার দাম খানিকটা বাড়তে দেখা গেছে স্থানীয় বাজারে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বেশিরভাগ পণ্যের সরবরাহ ও মজুদ পরিস্থিতি চাহিদার তুলনায় বেশ ভালো। যার ওপর ভিত্তি করে বাণিজ্য উপদেষ্টা আশা দেখছেন, এবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্যমূল্য গত বছরের তুলনায় কম থাকবে।
সভা শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেছেন, আসন্ন রমজানে কিছু কিছু পণ্যের দাম কমবে। গত বছরের চেয়ে এবার নিত্যপণ্যের গড় আমদানি ৪০ শতাংশ বেশি। এই সরবরাহ পরিস্থিতি ও পণ্যমূল্যের স্থিতি বিবেচনায় গতবারের চেয়ে এ বছরের রমজান স্বস্তিদায়ক হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বর্তমান বাজারের স্থিতি নিয়েছি। আমদানি এবং উৎপাদনের পরিমাণগত বিশ্লেষণ করেছি। বিশ্লেষণ করে আমরা এই অবস্থায় উপনীত হয়েছি, গত বছরের চেয়েও এ বছরের রমজানের বাজার আরও ভালো হবে। গত বছরের তুলনায় এ বছরের রমজানের বাজারে পণ্যমূল্যে আরও বেশি স্থিতিশীল থাকবে।’
বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, সভায় ব্যবসায়ীরা আশ্বস্ত করেছেন রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। আসছে রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকবে। দাম বাড়বে না; বরং কিছু কিছু পণ্যের দাম আরও কমবে। তবে মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীরা সভায় জানিয়েছেন, সরবরাহ পরিস্থিতিতে কোনো জটিলতা তৈরি না হলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে না।
এক প্রশ্নের উত্তরে উপদেষ্টা জানান, দেশে এই মুহূর্তে গ্যাসের সংকট নেই, ডলারের সংকট নেই। বিনিময় হার স্থিতিশীল এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবির উদ্যোগে ভোজ্য তেলকে বৈচিত্র্যময় করা হয়েছে। প্রায় পাঁচ লাখ টন রাইস ব্র্যান তেলকে বাজারে আনা হয়েছে। সরকার ঘোষিত মূল্যের চেয়েও বাজারে তেলের দাম কম, বিশেষ করে পাইকারি মূল্যে। বাজারে যত প্রতিযোগিতা বাড়বে, দাম তত প্রতিযোগিতামূলক হবে।
তিনি জানান, ব্যবসায়ীরা বিশেষ কোনো চ্যালেঞ্জের কথা সরকারকে জানাননি। বিশেষ করে, মৌলভীবাজারের যারা আছেন, ওনারাও বলছেন বাজার মূল্য স্থিতিশীল। সরবরাহকেন্দ্রিক কোনো জটিলতা যদি না থাকে, রমজানে পণ্যমূল্য আরও কমবে।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, রমজান উপলক্ষে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়। তারা সরকারকে আশ^স্ত করেছেন, ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। মূল্য পরিস্থিতি এবং সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলেও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ পরিস্থিতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি আছে। মূল্যও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু কম আছে।
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রোজায় তিন লাখ টন করে সয়াবিন তেল ও চিনি, পাঁচ লাখ টন পেঁয়াজ, দেড় থেকে দুই লাখ টন ছোলা, ৬০ থেকে ৮০ হাজার টন খেজুর, ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টন আদা, ৮০ থেকে ১ লাখ টন রসুনের চাহিদা রয়েছে। এই বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে বেশিরভাগ পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি ভালো থাকলেও খেজুর ছাড়া সবগুলো পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যাপ্ত রয়েছে।
নেত্রকোনায় এক অনুষ্ঠানে পদ্মা সেতু নির্মাণের কারণে চালের দাম বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা বন্দর, পদ্মা সেতুর মতো অযাচিত প্রকল্পের জন্য সরকারের বড় দায় তৈরি হয়েছে। এতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে। আইএমএফের কাছ থেকে বড় ঋণ নিতে হয়েছে, এসবের প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারে বা দামে। শুধু টাকার অবমূল্যায়নের কারণেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘অনেক অপচয়ের প্রকল্পের কারণেই আমাদের ব্যয় বেড়ে গেছে। যার প্রভাব পড়েছে পণ্যমূল্য থেকে শুরু করে সবকিছুর ওপরে।’
