কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ও রানওয়ে নির্মাণে ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে দুদকের একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করে। সংস্থাটির জনসংযোগ শাখার সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পরে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলার তদন্ত পর্যায়ে এজাহারভুক্ত আসামি প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এবং আলামত নষ্ট বা সাক্ষীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা থাকায় তাকে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে আটক রাখার জন্য আবেদন করে দুদক।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন সাবেক সিনিয়র সচিব মুহিবুল হক, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ম সচিব জনেন্দ্রনাথ সরকার, বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল মালেক, অ্যারনেস ইন্টারন্যাশনালের মালিক লুৎফুল্লাহ মাজেদ, এমডি মাহবুব আনাম, সাবেক উপসচিব মো. শফিকুল ইসলাম এবং প্রকল্প পরিচালক মো. ইউনুস ভূঁইয়া।
মামলার এজাহারে বলা হয়, কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়। প্রচলিত ক্রয়-প্রক্রিয়া ও বিধিবিধান লঙ্ঘন করে একটি চীনা কোম্পানিকে কার্যাদেশ প্রদানে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন তারিক আহমেদ সিদ্দিকীসহ আসামিরা। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়ে স্থানীয় এজেন্ট অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সঙ্গে যোগসাজশে প্রকল্পের অন্তত ১৫০ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।
ইকবাল-সালাম মুর্শেদীসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে ১১ মামলা : বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে ১৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, সাবেক এমপি সালাম মুর্শেদীসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে ১১টি মামলা রুজুর সিদ্ধান্ত দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে মামলাগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানান সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন।
দুদকের তথ্যমতে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশ করে ২০২১-২২ সালে বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে ১১টি কার্যাদেশের বিপরীতে ১৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ ১৭ জনের বিরুদ্ধে ১১টি পৃথক মামলা করার অনুমোদন দেয় কমিশন।
মামলার আসামিরা হলেন প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার দুই ছেলে ব্যাংকটির পরিচালক মোহাম্মদ ইমরান ইকবাল ও মঈন ইকবাল, পরিচালক ও সাবেক এমপি আবদুস সালাম মুর্শেদী, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি বজলুল হক হারুন, ব্যাংকের পরিচালক শফিকুর রহমান, জামাল গুপ্ত আহমেদ, শায়লা শেলী খান, এএইচএম ফেরদৌস, নব গোপাল বণিক, শাহ মোহাম্মদ নাহিয়ান হারুন, স্বতন্ত্র পরিচালক কাইজার আহমেদ চৌধুরী, ইভিপি মোহাম্মদ তারেক উদ্দিন, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবুল হাশেম, ব্যাংকটির এমডি এম রিয়াজুল করিম, ডিএমডি ও ক্রয় কমিটির প্রধান সৈয়দ নওশের আলী এবং মাইন্ডট্রি লিমিটেডের এমডি ইকবাল আল মাহমুদ।
দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, মাইন্ডট্রি লিমিটেড নামে একটি বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০১১ সালের ৪ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত মাইন্ডট্রি/মাইন্ডট্রি লিমিটেডের নামে বিজ্ঞাপন প্রচারের অগ্রিম বাবদ ৪৩৮ কোটি ৭১ লাখ ২৮ হাজার ৪৪৪ টাকা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এসব অগ্রিম অর্থ বৈধতা দিতে সময়ে সময়ে বিজ্ঞাপন প্রচারের কার্যাদেশ দেখিয়ে সমন্বয় করা হয়। এর মধ্যে ২০১১ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৪২ কোটি ২৯ লাখ ৮৭ হাজার ৪৪৪ টাকা সমন্বয় দেখানো হলেও ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ৯৬ কোটি ৪১ লাখ ৪১ হাজার টাকা এখনো অসমন্বিত রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, ২০২১-২২ সালে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিজ্ঞাপন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারের জন্য মাইন্ডট্রিকে ১৯ কোটি ৮০ লাখ টাকার ১১টি কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি চ্যানেলে ১০০ মিনিট করে বিজ্ঞাপন প্রচারের কথা থাকলেও বাস্তবে ট্রান্সমিশন সার্টিফিকেট অনুযায়ী মাত্র ৫০ মিনিট বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। মাইন্ডট্রির বিল, ভাউচার ও পে-অর্ডার যাচাইকালে ১১টি কার্যাদেশের বিপরীতে মাইন্ডট্রিকে মাত্র ৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা প্রদানের তথ্য পাওয়া যায়। অবশিষ্ট ১৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয় না করে আত্মসাৎ করা হয়।
এর আগে গত ৯ জানুয়ারি বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে ৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দি প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল তার দুই ছেলে, সাবেক এমপি সালাম মুর্শেদী ও বিএইচ হারুন এবং ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দুদক।
