রাজার ছেলে রাজা হবে সেই সংস্কৃতি পাল্টাতে চাই

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৭ এএম

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, রাজার ছেলে রাজা হবে, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হবে, সেই সংস্কৃতির ধারা তারা পাল্টে দিতে চান। এমন ব্যবস্থা করতে চান যেখানে যোগ্য ব্যক্তির যথাযথ মূল্যায়ন হবে। যোগ্যতা ও মেধা বিকাশের মাধ্যমে রিকশাচালকের ছেলেও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে। গতকাল শুক্রবার সকালে ফেনীতে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জেলা শহরের ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এ জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এদিন জামায়াত আমির নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে নির্বাচনী সমাবেশেও বক্তব্য দেন। 

ফেনীতে জামায়াত আমির বলেন, ‘অতীতের বস্তাপচা রাজনীতি ফ্যাসিবাদ উপহার দিয়েছে, একনায়কতন্ত্র উপহার দিয়েছে, দুর্নীতিতে দেশকে চ্যাম্পিয়ন করেছে। ওই রাজনীতিকে আমরা লাল কার্ড দেখাতে চাই। আমাদের কাছে হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই সমান। আমরা তাদের সবার অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। ইনশাআল্লাহ এই কাজে কেউ বাধা দিয়ে আমাদের আটকাতে পারবে না।’

দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতার দিকে ইঙ্গিত করে জনসভায় জামায়াতের আমির বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় আমরা মাথা গরম দেখতে পাচ্ছি। শীতের দিনে মাথা গরম করলে, চৈত্র মাসে কী করবেন? একটু মাথাটা ঠান্ডা রাখেন। একটু জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান করেন, এতগুলো শহীদের প্রতি একটু শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুলির সামনে যারা বুক পেতে দিয়েছিল, তাদের সম্মান করুন। সেই সম্মানটা করলে মাথা গরমের কোনো সুযোগ নেই।’

নারীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘কিছু কিছু জায়গায় মা-বোনদের ওপর হাত তোলা হচ্ছে। আমরা তাদের অতি বিনয়ের সঙ্গে আহ্বান জানাব, মা-বোন আপনাদেরও রয়েছে। নিজেদের মা-বোনকে সম্মান করুন, তাহলে বাংলার সব মা ও বোনকে আপনি সম্মান করতে পারবেন।’

১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের পক্ষে ভোট চেয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘দাঁড়িপাল্লার মার্কা হচ্ছে স্বাধীনতা রক্ষার মার্কা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মার্কা। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মার্কা। এর পক্ষে গোটা দেশে একদম ‘চষে’ ফেলতে হবে। একটা মানুষও বাদ যাবে না।’

জামায়াতের আমিরের আগমন উপলক্ষে সকাল থেকেই সেøাগানে সেøাগানে মুখর হয় জনসভাস্থল। বেলা ১১টায় তিনি মঞ্চে ওঠেন। এ সময় তিনি গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন। বেলা ১১টা ১২ মিনিটে তিনি বক্তব্য শুরু করেন। ১১টা ৩৫ মিনিটে বক্তব্য শেষ করে ফেনীর তিনটি আসনের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা ও ঈগল প্রতীক তুলে দেন।

এদিকে ফেনীর আগে নোয়াখালী জেলা স্কুল মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় জামায়াত আমির বলেন, নোয়াখালীর মানুষের অনেক দাবি রয়েছে। আমরা কথা দিচ্ছি, ১১ দলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে ইনসাফের সঙ্গে দাবিগুলো পূরণ করা হবে। সুবর্ণচরকে পৌরসভায় উন্নীত করা ও হাতিয়াকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে, এতে নোয়াখালীবাসী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করবে। জনসভায় নোয়াখালীর ছয়টি দাবি পূরণ করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

নোয়াখালী মানুষের দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে বলেন, ‘আমি সুবর্ণচরে একজন দুঃখিনী মায়ের দরবারে পৌঁছার চেষ্টা করেছিলাম। যাকে হায়েনারা কষ্ট দিয়েছিল একটা প্রতীকে ১৮ সালে ভোট দেওয়ার কারণে, ওই মায়ের সম্মানে হলেও সেখানে পৌরসভা করব ইনশাআল্লাহ।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গত দেড় বছর যারা ধৈর্য ধরতে পারেননি, যারা অধৈর্য হয়ে অপকর্ম করেছেন, তাদের জন্য অশনিসংকেত শুরু হয়ে গেছে। এর আগে সকাল ৯টায় জেলা জামায়াতের আমির ও নোয়াখালী-৪ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মো. ইসহাক খন্দকারের সভাপতিত্বে জনসভা শুরু হয়। এ সময় বক্তব্য রাখেন স্থানীয় জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের নেতারা।

তিনি বলেন, ‘আপনাদের ছয়টি দাবি আমি বুঝতে পারলাম যে নোয়াখালীবাসীর প্রাণের দাবি। দোয়া করবেন, কথা দিচ্ছি আপনাদের সঙ্গে বেইনসাফি করা হবে না ইনশাআল্লাহ। ইনসাফের মানদণ্ডে দাঁড়িয়ে অবশ্যই আপনাদের দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে ইনশাআল্লাহ আমরা বাস্তবায়ন করব। আমরা সব দাবি কবুল করে নিলাম ইনশাআল্লাহ। আল্লাহতায়ালা আমাদের এই অঙ্গীকার পূরণের জন্য বিশেষভাবে যেন সাহায্য করেন।’

গতকাল বিকেলে লক্ষ্মীপুরে আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গতকাল বিকেলে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের পর আমরা বলছি প্রতিশোধ নেব না, আমারা ক্ষমা করে দিয়েছি। আমরা আমাদের কথা রেখেছি। কারও বিরুদ্ধে মামলা ও হামলা করিনি আমরা। চাঁদাবাজি, দখলদারির সঙ্গে আমরা জড়িত নই।’

ডা. শফিকুর রহমান যুবকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমরা দেশের যুবকদের বেকার অবস্থায় দেখতে চাই না। আমরা বেকারদের ভাতা দিয়ে অসম্মানিত করতে চাই না। আমরা তোমাদের হাতে বেকার ভাতা তুলে দেব না। তোমরা বেকার ভাতার জন্য কোনো দাবি জানাওনি। বেকার ভাতা দিয়ে তোমাদের অপমানিত করতে চাই না। তোমাদের হাতগুলো দক্ষ কারিগরের হাত হিসেবে গড়ে তুলব। প্রত্যেকের হাতে মর্যাদার কাজ তুলে দেব।’

তিনি বলেন, সেদিন প্রতিটি যুবক গর্বের সঙ্গে বলবে, ‘আমিই বাংলাদেশ, আমায় দেখে বুঝে নাও বাংলাদেশ কী জিনিস।’ সভায় তিনি লক্ষ্মীপুর-১ আসনের শাপলা কলির প্রার্থী মাহবুব আলম, লক্ষ্মীপুর-২ আসনের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী রুহুল আমিন ভূঁইয়া, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের প্রার্থী ড. রেজাউল করিম এবং লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের প্রার্থী এম আর হাফিজ উল্যাহর হাতে নির্বাচনী প্রতীক তুলে দেন।

গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় কুমিল্লার লাকসাম স্টেডিয়ামে আরেক নির্বাচনী জনসভায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের যুবকরা হিমালয়ের সমান। ফ্যাসিবাদকে তাড়িয়েছে। সেই যুবকরা এখনো ঘুমায়নি। তারা জেগে আছে। আগামীতে যারা জনগণের ভোট নিয়ে অন্য চিন্তা করবেন, এ যুবকরা সিংহ হয়ে গর্জন করবে। পরে সিংহের থাবা সামলাতে পারবেন না। সুতরাং কারও ভোটের দিকে নজর দেবেন না।’

মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করে আমিরে জামায়াত বলেন, যারা ৫ তারিখের পর জুলাই আন্দোলন মানেন না। চাঁদাবাজ ও টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত হয়ে এ ফ্যাসিবাদের মতো আচরণ করছেন। আগামী ১৩ তারিখ বাংলাদেশের জনগণ ফ্যাসিবাদ মুক্ত সরকার গঠন করার জন্য বসে আছেন। যারা ফ্যাসিবাদের মতো আচরণ করে তাদের দিয়ে ফ্যাসিবাদ দূর করা যাবে না।

তিনি বলেন, যারা হাঁচি-কাশি দিলেও বিদেশে চিকিৎসার জন্য যায়, তারাও একসময় এদেশ শাসন করেছেন। এই দেশটা তাদের কাছে টাকা কামানোর মেশিন। জনগণের টাকা মেরে দেবেন, ব্যাংকের টাকা, শেয়ার বাজারের টাকা লুট করে বিদেশে নিয়ে যাবেন। সেই টাকা দিয়ে ছেলেমেয়েদের বিদেশে লেখাপড়া করাবেন। এটাই তাদের দেশপ্রেমের নমুনা। তিনি আরও বলেন, এক হাতে ফ্যামিলি কার্ড, আরেক হাতে মায়ের গায়ে হাত। এটা মেনে নেওয়া যায় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত