‘অ্যা ট্রু বিউটি ইজ বর্ন’

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৫ এএম

আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণ শুরু হওয়ার পর থেকে হতাহত বেড়েই চলেছে। পুলিশ, মানবাধিকার সংগঠন, হিউম্যান রাইট সাপোর্ট সোসাইট ও আসক এবং হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে প্রতিদিনই একাধিক ব্যক্তি খুন হয়েছেন। বিভিন্ন ডোবা ও অজ্ঞাত স্থান থেকে লাশ উদ্ধার হচ্ছে। রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নির্বাচন বিরোধের জের ধরে অন্তত ১৩ জন নিহত হন। সেই হিসাবে নির্বাচন সামনে রেখে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩ মাসে সারা দেশে ১৪৬ জন শুধু রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হন। এ ধরনের নিষ্ঠুর উদাহরণ এখনো কেন? আমাদের জুলাই বিপ্লব উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের বিখ্যাত লাইনটির কথা স্মরণ করিয়ে দেয় ‘অ্যা টেরিবল বিউটি ইজ বর্ন’। জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যেন, ভয়ংকর সুন্দরের জন্ম হয়েছে। বিপ্লব ছিল অনিবার্য, কিন্তু বিপ্লবের পরে যা যা হচ্ছে প্রতিটি ঘটনাই যেন ইয়েটসের লাইনটিকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। বহু ত্যাগের বিনিময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ এসেছে। কোনো অবস্থাতেই এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। বিগত তিনটি বিতর্কিত ও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনে গণ-মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছিল। কঠিন ও কঠোর বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একটি উৎসবমুখর, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্ষ্ঠুানের প্রশ্নে অনড় অবস্থান নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষ আস্থা স্থাপন করেছেন এই সরকারের ওপর। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ২১ জানুয়ারি তিন বাহিনী প্রধানসহ অন্যদের একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে প্রধান উপদেষ্ট বলেছেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের ধাপে ধাপে পরীক্ষা শুরু হলো। আজ থেকে শুরু। ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ফাইনাল।

দেশের রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে। এ স্বাক্ষরের মাধ্যমে তারা স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করেছে, জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে একমত হয়েছে, সেসব বিষয় তারা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করবে। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হবেন ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে। এই ১৮০ কর্মদিবসে জুলাই জাতীয় সনদের যেসব বিষয় নিয়ে গণভোট হবে, সেগুলো যদি পাস হয়, তাহলে তারা সেগুলো বাস্তবায়ন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। যেহেতু তারা লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেছেন, এগুলো পূর্ণ বাস্তবায়ন করবেন বলে জনগণ বিশ্বাস করে। আমাদের রাজনীতি যেন যুক্তিবোধহীন এক আবেগী যাত্রায় পরিণত না হয় যেখানে উত্তেজনা, সংঘাত, মারামারি, হানহানি, হত্যা, দখলবাজি থাকবে আর অনুপস্থিত থাকবে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, সহমর্মিতা, যুক্তি, দেশপ্রেম এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা। অতীতে রাজনীতিবিদের ক্ষেত্রে যা প্রত্যক্ষ করেছি তা হলো, দেশের জনগণের অর্থ, দেশের বড় বড় প্রজেক্টের কোটি কোটি ডলার বিদেশে পাচার করে, জনগণ ও দলীয় কর্মীদের ভুলে বিদেশের মাটিতে অবস্থান করা। শুধু তাই নয়, বর্তমানে বিদেশ থেকে রাষ্ট্রবিরোধী সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা চালানো, নির্বাচন ভ-ুলের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু পরিণতি কী হবে? তা সবাই জানি। সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগের বিষয় নয় এটি জ্ঞানের বিষয়। মালয়েশিয়ার ড. মাহাথীর মোহাম্মদ স্বল্প সময়ের মধ্যে তার দেশটিকে প্রায় উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে গেছেন। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে সংসদ মানেই গবেষণা, তথ্য আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কেন্দ্র। সেখানে রাজনীতিবিদ মানে কেবল বক্তা নন, তারা নীতিনির্ধারক। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, আমাদের রাজনীতিবিদদের এখান থেকে অনেক কিছু শিখতে হবে, চিন্তা করতে হবে এবং পূর্বের রাজনীতি, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সম্পর্ক কী হবে, কেমন হবে সেখানে নতুনত্ব আনতে হবে। নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্বে ভিশনারি লিডারশিপ দেখতে চায় জনগণ। অশিক্ষিত ও পেশিশক্তিতে বিশ্বাসী নেতৃত্বের দ্বারা ভয়ের রাজনীতি করা যায়, কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়া যায় না। আইন প্রণয়ন, বাজেট বিশ্লেষণ, যুগোপযোগী শিক্ষা প্রণয়ন, পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ ছাড়া সম্ভব নয় নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যদিও সবকিছুর মাপকাঠি নয়, তারপরও নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ধৈর্য ও অধ্যবসায় সহকারে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় পড়াশোনা করা, চিন্তা করা, বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে যে চরিত্র গড়ে ওঠে তা ভবিষ্যৎ জীবন, জাতীয় জীবনে অনেক কাজে লাগে।

বিশ^বিদ্যালয় জীবনে দেখেছি ছাত্রনেতা মানে পড়া নেই, ভালো আচরণ নেই, বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো কাজ নেই শুধু থ্রেট, পেশিশক্তির চর্চা। আর জাতীয় রাজনীতিতে শুধু গরম গরম বক্তৃতা, বিরোধী দল ও জনগণকে সর্বতোভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা। সেখানে বুদ্ধি, যুক্তি, সততা, মানবতা, দেশপ্রেম নেই। নতুন বাংলাদেশ যারা গড়বেন, তাদের এ বিষয়গুলো ধরে অগ্রসর হতে হবে। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, ইতিহাস কারুর জন্য অপেক্ষাও করে না। যে জনগোষ্ঠী নিজেকে যথার্থ জাতি হিসেবে গড়তে বিলম্ব করে, ইতিহাস সেই জনগোষ্ঠীকে কেবল একটি দীর্ঘ প্রশ্নচিহ্নে পরিণত করে রাখে। আমরা আর সেটি হতে চাই না। আমাদের তরুণরা যে রক্তস্নাত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তাবায়নে দেশপ্রেমিক সব রাজনৈতিক দলকে যৌক্তিক আচরণ প্রদর্শন করতে হবে প্রতিটি ক্ষেত্রে। এখানে আবেগ, নির্বুদ্ধিতা, পেশিশক্তি, ভয়ভীতি দলের দু’চারজনকে অতি সাময়িককালের জন্য কিছু রিটার্ন হয়তো দিতে পারে। কিন্তু গোট দেশ ও সমাজের জন্য তা মারাত্মক ক্যানসার। লক্ষণসেনের যুগের দিকে না তাকালেও অতি সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নিতেই হবে। সেখানে ব্যত্যয় ঘটলে, ইতিহাস, দেশ ও জনগণ কাউকে ক্ষমা করবে না। জুলাই বিপ্লবকে আমরা নানাভাবে সমালোচনা করতে পারি, কিন্তু ইয়েটসের মতো ‘অ্যা টেরিবল বিউটি ইজ বর্ন’ না বলে যেন বলতে পারি ‘অ্যা ট্রু বিউটি ইজ বর্ন’ থ্রু জুলাই রেভল্যুশন।

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর ‘ভাব’, বাংলাদেশ

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত