দেশের ইউরিয়া সার কারখানাগুলোয় নিয়মিত উৎপাদন চালু থাকলে সারা বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব। অথচ গ্যাসসংকটের অজুহাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাঁচটি কারখানার চারটিই বছরের ৮ থেকে ১০ মাস বন্ধ রাখা হচ্ছে; আর এই অবস্থা চলছে বছরের পর বছর। ফলে চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ পূরণ করতে হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে। এতে শুধু ইউরিয়ার পেছনে বছরে তিন হাজার কোটি টাকা বা তারও বেশি অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে সরকারের। অন্যদিকে বন্ধ থাকার কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমছে। শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় ১৭ বছর ধরে নিজস্ব কারখানাগুলো বসিয়ে রেখে আমদানি-নির্ভরতা বাড়িয়েছে বিগত সরকারগুলো। এতে বছরে ২৬ লাখ টন ইউরিয়া সারের চাহিদার বিপরীতে ৮ থেকে ১১ লাখ টনের বেশি উৎপাদন করতে পারছে না কারখানাগুলো। বাকি অংশ আমদানি করতে হচ্ছে। অথচ সারা বছর কারখানা চালু রাখতে পারলে চাহিদার প্রায় পুরোটাই নিজস্ব কারখানায় উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু প্রতি বছর বোরো মৌসুমের আগে জরুরি ভিত্তিতে কারখানাগুলো চালু করে দুই-চার মাস পর আবার বন্ধ করে দেওয়াটা নিয়মে পরিণত হয়েছে।
যদিও শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসি স্থানীয় কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আমদানি-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। কারণ প্রায় চার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতাসহ স্থানীয় সার কারখানাগুলোর পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে কারখানা বন্ধ থাকলেও। কারখানাগুলোর ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে বড় পরিবহন ব্যবসা, তৈরি হয়েছে স্থানীয় কর্মসংস্থান, যা এখন ঝুঁকিতে পড়েছে।
বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিসিআইসি পুরনো ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে কাজ করছে। সারা বছর বা অন্তত ১১ মাস কারখানা চালানো যায়, সে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কারখানা সারা বছর চালু রাখতে পারলে ইউরিয়া সারের আমদানি-নির্ভরতা আর থাকবে না। এতে শুধু খরচই কমবে না, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ কমে যাবে।’
জানা যায়, গত নভেম্বরের শেষভাগে সার কারখানার জন্য সরকার প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯ দশমিক ৫০ টাকা নির্ধারণ করে। গ্যাসের নতুন দাম অনুযায়ী, এক টন ইউরিয়া উৎপাদনে গড় খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার টাকায়। আমদানি করা ইউরিয়ার খরচ প্রায় ৬৮ হাজার টাকা (পরিবহন ব্যয়সহ)। অর্থাৎ আমদানি করা সারে প্রতি টনে প্রায় ২০ হাজার টাকা বাড়তি খরচ হয়। ২৬ লাখ টন বার্ষিক চাহিদার প্রেক্ষিতে গত কয়েক বছর ধরে ১৫ থেকে ১৯ লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানি করতে হচ্ছে। উৎপাদনের চেয়ে আমদানিতে বাড়তি যে খরচ, তাতেই সরকারকে অতিরিক্ত তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।
বিসিআইসি জানায়, পেট্রোবাংলা যদি গ্যাসের বাড়তি দামেও সরবরাহ ঠিক রাখে, তাহলে দেশের কারখানাগুলোকে সারা বছর উৎপাদনমুখী রাখা যায়। একই সঙ্গে আমদানির পেছনে যে ব্যয়, তা একেবারে কমিয়ে আনা সম্ভব।
জানা গেছে, দশ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা বাদে মৌসুমের শেষভাগে এসে বাকি ৪টি কারখানার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারখানাগুলো ৮-১০ মাস পর্যন্ত বন্ধ থাকে। অথচ সচল ৫টি ইউরিয়া সার কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৩১ লাখ টন, যা দেশের চাহিদার চেয়ে বেশি। কিন্তু দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে কারখানাগুলো নিয়মিত চালু না থাকায় কমেছে উৎপাদন সক্ষমতা। বসে থাকতে থাকতে কারখানাগুলোর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা কমে এখন ২০ লাখ টনে নেমেছে। আর গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কারখানাগুলোর মোট গড় উৎপাদন নেমে এসেছে ৮ থেকে ১১ লাখ টনে।
স্থানীয় কারখানা থেকেই উৎপাদন সম্ভব চাহিদার সবটুকু : শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসির তথ্য বলছে, সারা বছর কারখানাগুলো চালানো গেলে ২০ লাখ টন ইউরিয়া সার উৎপাদন সম্ভব। যদি সর্বনিম্ন নিরাপদ লোডেও (ন্যূনতম গ্যাস সরবরাহে) ১১ মাস কারখানা চালানো যায়, তাতেও অন্তত ১৮ লাখ টন সার উৎপাদন সম্ভব। এর বাইরে বাংলাদেশ ও জাপানের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) থেকে প্রতি বছর অন্তত সাড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ টন সারের সরবরাহ পাওয়া যায়। যৌথ বিনিয়োগে দেশে স্থাপিত এই কারখানা থেকে সরকার আন্তর্জাতিক মূল্যে বৈদেশিক মুদ্রায় সার কেনে বিসিআইসির মাধ্যমে। তবে আমদানির ক্ষেত্রে পরিবহনের যে খরচ, তা এ ক্ষেত্রে সাশ্রয় হয়। ফলে কাফকোসহ কারখানাগুলোর মোট উৎপাদন দাঁড়ায় সাড়ে ২৩ লাখ টন থেকে ২৪ লাখ টনে। তখন আমদানির প্রয়োজন পড়ে মাত্র দুই থেকে আড়াই লাখ টন। আর যদি পুরো চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা হয়, তাহলে পুরো ২৬ লাখ টন উৎপাদন দেশেই সম্ভব। তখন আর বিদেশ থেকে ইউরিয়া সার আনার প্রয়োজনই পড়ে না।
কারখানাগুলোয় গ্যাসের সরবরাহ পাওয়ার জন্য প্রতি বছর শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসিকে চিঠি চালাচালি করতে হয়। এ বছরও এ পরিস্থিতির বদল নেই। এর মধ্যে বাড়ানো হয়েছে কারখানার প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম। তবে দাম বাড়ানোর আগে পেট্রোবাংলা এবার গ্যাস সরবরাহের একটা প্রস্তাব তুলে ধরেছে। পেট্রোবাংলার প্রস্তাব অনুযায়ী, দাম বাড়ানোর পর বাড়তি ৭ কার্গো এলএনজি আমদানি করে সার কারখানায় সরবরাহ করা হবে। ছয় মাস (অক্টোবর-মার্চ) পুরো মাত্রায় (২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হবে। অবশিষ্ট ছয় মাসের মধ্যে (এপ্রিল-মে) ১৬৫ মিলিয়ন ঘনফুট, জুনে ১৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং জুলাই-সেপ্টেম্বরে ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ করবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ দাম বাড়ানোর ঘোষণার সময় জানান, এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হবে বলে আশা করা যায়।
এখনো সরবরাহ পর্যাপ্ত না : জানা গেছে, দাম বাড়ানোর পরও পর্যাপ্ত গ্যাসের সরবরাহ পাচ্ছে না কারখানাগুলো। বিসিআইসির তথ্য বলছে, গ্যাসের দাম বাড়ানোর আগে পেট্রোবাংলা দুটি কোম্পানিতে গত বছরের অক্টোবরে গ্যাস সরবরাহ করে শুধুমাত্র বোরো মৌসুমের চাহিদার কথা বিবেচনায়। এতে চালু হয় মোট তিনটি কারখানা। বাকি একটি কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা হয় নভেম্বরে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঠিক পরদিন। ফলে এখন ৫টি কারখানার মধ্যে যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল), চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল), শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (এসএফসিএল) এবং ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি (জিপিএফপিএলসি) চালু হয়েছে। আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড বন্ধ রয়েছে। এবারও শঙ্কা রয়েছে, বোরো মৌসুমের শেষে এসেই আবার কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
পেট্রোবাংলার গত ২৭ জানুয়ারির গ্যাস সরবরাহের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই চারটি কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ দেওয়া হয় ১২৬ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে যমুনার ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুটের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ২ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট এবং চিটাগাং ফার্টিলাইজারে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন ঘনফুট, যা চাহিদার তুলনায় কম। পরের দিন ২৮ জানুয়ারি চারটি কারখানায় মোট গ্যাসের সরবরাহ ছিল ১৪১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট। এদিনও যমুনা ও চিটাগাং ফার্টিলাইজারে গ্যাসের সরবরাহ একেবারেই কম ছিল। গ্যাস সরবরাহের একই অবস্থা দেখা গেছে ২৯ জানুয়ারিতেও। সেদনি চারটি কারখানায় ১৪১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ ছিল। যদিও বিসিআইসি বলছে, চারটি কারখানার উৎপাদন পুরোদমে চালু রাখতে অন্তত ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যখন পেট্রোবাংলার ২,৩০০-২,৪০০ এমএমসিএফ গ্যাসের উৎপাদন সক্ষমতা ছিল, তখন সার কারখানাগুলোর বরাদ্দ ছিল ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, যদিও এই সরবরাহ শুধু বোরো মৌসুমের আগেই দেওয়া হতো। মাঝে বছর তিনেক আগেও যখন এলএনজিসহ প্রায় ৩ হাজার এমএমসিএফ গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা ছিল, তখন গ্যাসের অভাবে কারখানাগুলোকে বন্ধ করে রাখা হতো। এখনো ৪টি কারখানার জন্য যে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে, সেটাও সর্বনিম্ন চাহিদার চেয়েও কম। ফলে চারটি কারখানার উৎপাদন ঠিকমতো চালু রাখা কষ্টকর। অথচ এলএনজিসহ দৈনিক মোট গ্যাসের সরবরাহ এখন ২ হাজার ৫৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে যৌথ বিনিয়োগে তৈরি কাফকো সার কারখানায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট। কাফকোকে চুক্তি অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর বাইরে নিয়মিত চালু রাখা হয় শুধু ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা।
সরকার গত বছরের জুলাইয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মনির হোসেন চৌধুরীকে আহ্বায়ক এবং পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমানকে সদস্য সচিব করে একটি কমিটি গঠন করে। যেখানে অর্থ বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসির কর্মকর্তাদের রাখা হয়।
কমিটির প্রতিবেদনে বলে, বিসিআইসির ৫টি কারখানার মধ্যে ৪টি কারখানা বছরে ৩৩০ দিন বা ১১ মাস চালু করার মাধ্যমে ১৮ লাখ টন সার উৎপাদন নিশ্চিতের সুযোগ রয়েছে। সে অনুযায়ী পেট্রোবাংলাকে দৈনিক গড়ে ১৮০ দশমিক ৮১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু পেট্রোবাংলা এখনো সে অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না।
কমিটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দাম বাড়ানোর মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করে ইউরিয়া উৎপাদন বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় দক্ষ জনবল তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন মৌসুমে সারের সরবরাহ ঠিক না রাখতে পারলে তা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে দুর্বল করে দিতে পারে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৫-২০ বছর আগেও চাহিদার ৮০ ভাগ ইউরিয়া দেশেই উৎপাদন হতো। কিন্তু এখন চিত্র পুরো উল্টে গেছে, আমদানি বেড়েছে। নানা অজুহাতে আসলে স্থানীয় কারখানাগুলোকে বসিয়ে বসিয়ে নষ্ট করা হচ্ছে। অথচ আমদানি উৎপাদনের চেয়েও বেশি ব্যয়বহুল এবং মাঝে মাঝে অনিশ্চিত।’
তিনি আরও বলেন, নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ালে তা বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করবে, স্থানীয় কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। ফলে বিসিআইসির উৎপাদনের কাজে মনোযোগী হওয়া উচিত। আর সরকারের উচিত নিয়মিত গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে কারখানা সারা বছর চালু রাখা। এতে খাদ্য নিরাপত্তা ঠিক রাখতে উৎপাদন মৌসুমে ইউরিয়া সরবরাহের যে চ্যালেঞ্জ, সেটা স্থানীয় উৎপাদনেই সহজ করার সুযোগ রয়েছে।
