ভোট তামাশার বিষয় নয়

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৫ এএম

মানুষের ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের প্রতিটি কর্মকাণ্ড আল্লাহর কাছে হিসাবযোগ্য একেকটি আমানত। ভোটাধিকার প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ এক আমানত। বর্তমান সময়ের এই আলোচিত বিষয়ে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের নিরিখে সঠিক দিশা খুঁজে পেতে চমৎকার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। গত শুক্রবার জুমার বয়ানে তিনি এমন দিকনির্দেশনা দেন।

জুমার বয়ানের একপর্যায়ে খতিব মুফতি আবদুল মালেকের কাছে মুসল্লিদের পক্ষ থেকে একটি প্রশ্ন আসে। প্রশ্নটি হাতে নিয়ে তিনি বলেন, একটা প্রশ্ন এসেছে। যাক অনেক দিন পর একটা প্রশ্ন আসলো, ‘হ্যাঁ’ ভোট  দেবে নাকি ‘না’ ভোট দেবে? সুবহানাল্লাহ, দেখেন ‘হ্যাঁ-না’ দুটি অপশন আছে কি নেই? অপশন যখন দুটি আছে, এখন সবাই তো বলছে, সরকারও চাচ্ছে ‘হ্যাঁ’তে ভোট দেওয়া হোক। ‘হ্যাঁ’তে ভোট দিলে দেশের ফায়দা হবে, ‘না’তে ভোট দিলে দেশের উন্নতি বাধাগ্রস্ত হবে। সরকারও বলছে ‘হ্যাঁ’তে দেওয়া উচিত, উৎসাহ দিচ্ছে। অনেক দলকে দিয়ে বলানো হচ্ছে বা অনেক দল নিজেরাও স্বতঃস্ফূর্ত বলছে ‘হ্যাঁ’তে ভোট দেওয়া হোক। কিন্তু অপশন যখন দুটি আছে, এর মানে ‘না’তে ভোট দেওয়ার অধিকার আছে কি নেই? আছে। না হলে তো আর দরকার নেই ভোটের।

আইনিভাবে যখন আমাকে দেখাচ্ছেন যে ‘হ্যাঁ’তে ভোট দাও বা ‘না’তে ভোট দাও, এর মানে অধিকার দেওয়া আছে সরকারের পক্ষ থেকে। আপনি ‘না’তেও দিতে পারেন, ‘হ্যাঁ’তেও দিতে পারেন। ‘না’তে দিলে এটা অপরাধ হবে না, দণ্ডনীয় অপরাধ হবে না। তাহলে ‘হ্যাঁ-না’ দুটির অপশন রাখল কেন? আপনাকে বুঝতে হবে, আপনি কী করবেন। বাধ্য হয়ে দেবেন না ভোট। নিজেকে বাধ্য মনে করবেন না যে, আমাকে ‘হ্যাঁ’তেই দিতে হবে। বাধ্য করেনি কেউ আপনাকে। কিন্তু এক ধরনের যন্ত্রণায় ফেলেছে আমাদের নির্বাচন কমিশন হোক, সরকার হোক, বিদেশিরা হোক, আমাদের এক ধরনের যন্ত্রণায় ফেলেছে।

একটা প্রশ্ন বোঝার জন্য বলছি। এখন যদি আপনাকে প্রশ্ন করে ঢাকা, দিল্লি এটা বাংলাদেশের রাজধানী, কী বলবেন? ঢাকা এবং দিল্লি বাংলাদেশের রাজধানী। দিল্লি এবং ঢাকা ইন্ডিয়ার রাজধানী, কী বলবেন আপনি? এখানে তো এ রকম করে রেখেছে পাঁচ-ছয়টা জিনিস, আপনি ‘হ্যাঁ’ বললে সবগুলোকে ‘হ্যাঁ’ বলবেন। ‘না’ বললে সবগুলোকে কী বলবেন? ‘না’। কেন অপশন নেই কেন? আলাদা আলাদা ভোট নেন। আপনাদের কি সিলের টান পড়ছে? না কালি-কাগজ, কীসের টান পড়ল? ছয়টা জিনিসের ওপরে একসঙ্গে বললে ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’ বললে ছয়টার ওপরে।

মোট কয়টা? পাঁচটা? আচ্ছা যাই হোক, যে কয়টার ওপরেই হোক, সবটির ওপর ‘হ্যাঁ’ বললে সবটির ওপরে ‘হ্যাঁ’, ‘না’ বললে সবটির ওপরে ‘না’ কেন? আলাদা আলাদা করে বলেন না কেন? এখন তো মানুষকে মসিবতে ফেললেন। সে আপনার চার কথা বা পাঁচ কথা বা যত কথাই আছে, কথার কোনোটার সঙ্গে একমত, কোনোটার সঙ্গে একমত না।

আলাদা আলাদা থাকলে সে আলাদা আলাদা উত্তর দিত। একটা দিত ‘হ্যাঁ’, একটা দিত ‘না’। এখন আপনি তাকে বাধ্য করলেন, ‘হ্যাঁ’ বললে সবগুলোর ওপরে বলো, ‘না’ বললে সবগুলোর ওপরে বলো। আমি তো সবগুলোর ওপর ‘হ্যাঁ’ বলতে পারছি না, আমি তো সবগুলোর ওপরে ‘না’-ও বলতে পারছি না। কেন আমাকে বাধ্য করা হলো? একটা পেরেশানি, একটা যন্ত্রণার মধ্যে ফেলা হলো জাতিকে। ভোট দিলে সবগুলোর ওপর ‘হ্যাঁ’ বলো, আর ‘না’ বলতে হলে সবগুলোর ওপর পুরা ‘না’ বলো। কিন্তু আপনারা ভয় পাবেন না। ‘হ্যাঁ’-এর মধ্যে যেহেতু অনেক অন্যায় কথা আছে, আপনি বুঝে শুনে ভোট দেন। এই কথা কখনো ভাববেন না, এসব প্রতারণাতে আসবেন না যে, ‘না’তে ভোট দিলে দেশের উন্নতি রুখে যাবে, দেশের উন্নতি বাধাগ্রস্ত হবে, কখনো না।

দেশের কিসমত যদি ভালো হয়, জনগণের কিসমত যদি ভালো হয়, শাসকদের যদি নিয়ত ভালো হয়, তাহলে ‘না’ ভোট সবাই দিলেও দেশের উন্নতি চলতে থাকবে ইনশাআল্লাহ। আর যদি নিয়ত ভালো না থাকে, তবে সবাই ‘হ্যাঁ’তে ভোট দিলেও কাজ হবে না।

ভোট একটা আমানত। এটাকে বুঝে শুনে ব্যবহার করেন। এটা অধিকার। এই অধিকার একটা আমানত। এই অধিকারকে বুঝে শুনে ব্যবহার করুন। চিন্তা ফিকির করুন, আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, আল্লাহ আমি যাতে সঠিক ভোট দিতে পারি, সেই তৌফিক আমাকে দান করুন।

এটা তামাশার বিষয় না। প্রতারিত হয়ে বাধ্য হয়ে ভোট দেবেন না। লোভে পড়ে ভোট দেবেন না। চিন্তাভাবনা করে এবং এটার জন্য দোয়া-দরুদ পড়ুন, সালাতুল হাজত পড়–ন, অভিজ্ঞতার সঙ্গে মশওয়ারা করুন, নেককার দ্বীনদার মানুষের সঙ্গে মশওয়ারা করুন।

শুধু নামের ভিত্তিতে আপনি ভোট দিলে হবে না। শুধু মার্কার ভিত্তিতে ভোট দিলে হবে না। শুধু মনোগ্রাম দেখে ভোট দিলে হবে না। চিন্তা-ভাবনা করতে হবে, শুধু নাম দিয়ে প্রতারিত হবেন না। ইসলামের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক দলে ইসলামের নাম ব্যবহার করেছে।

এখন আপনি বলবেন, যেহেতু উনারা ইসলামের নাম নিয়ে রাজনীতি করছে, ইসলামের নাম নিয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছে, নির্বাচন করছে, তাহলে চোখ বন্ধ করে ওদেরকে ভোট দাও। এ কথা বলার সুযোগ নেই। কারণ ইসলামের নাম ব্যবহার করছি আমি, আমার দলের মধ্যে ইসলামের নাম আছে, কিন্তু ইসলাম আসলে কী? আমি ইসলাম বাস্তবায়ন করার জন্য মানুষের প্রতিনিধি হতে যাচ্ছি, মানুষের কাছে চাচ্ছি ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য সংসদে গিয়ে, সেটা আমার নিয়ত আছে কিনা বা আমি পারব কিনা বা আমি দল হিসেবে ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করি কিনা এ সবকিছু দেখার আছে।

একটা ইসলামি দল, তার ইশতেহার পড়ে দেখুন, সেকুলার দলের ইশতেহার যেমন হয় ওই দলের তেমন। বড় কিছু না, আসলে শুধু দেখেই কাউকে ভোট দেওয়া যায় না, কিন্তু তারপরও এটার কিছু না কিছু মূল্য তো আছে। না হলে সবাই ছাপে কেন ইশতেহার? আমি ইসলামের কথা বলি, কিন্তু পুরা একটা সেকুলার দলের মতো মনে হবে আগাগোড়া পড়লে। এ জন্য আমি বলছি, শুধু ইসলামের নাম, এ কারণে চোখ বন্ধ করে ভোট  দেবেন না। আরেক দলের মধ্যে ইসলামের নাম নেই, শুধু এই কারণেই তাকে বলবেন না যে, ভোট দেওয়াই যাবে না।

এখানে বিবেচনার অনেক কিছু আছে। এটা তো দুঃখর বিষয় যে, আমাদের কাছে ইসলামি খেলাফত ব্যবস্থা নেই। ইসলামি খেলাফত ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য কেউ দাঁড়াচ্ছে না, এটা তো দুঃখের বিষয়, কষ্টের বিষয়। সেই কষ্ট তো আছে, সেই ব্যথা আছে, সেজন্য আমরা ব্যথিত। কিন্তু এখন যারা মানবিক দেশ, নিরাপদ দেশ গড়ার জন্য যাচ্ছে, তারা মানবতা কি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করবে? নিরাপত্তা কি দিয়ে বাস্তবায়ন করবে? মানবিক দেশ কীভাবে? কোন মানবতা? পশ্চিমাদের মানবতা না ইসলামি মানবতা? ইসলামের কথা, ইসলামি মানবতার কথা তো আপনি বলছেন না। যে মানবতা ইসলাম এবং কোরআনের মাধ্যমে পাওয়া যায়, নবীজির সিরাতের মাধ্যমে পাওয়া যায়, সেটা তো আপনি বলছেন না। মানবিক বাংলাদেশ, নিরাপদ বাংলাদেশ, এটা যেকোনো সেকুলার দলই বলতে পারে।

এজন্য শুধু মনোগ্রামের মধ্যে কোনো আয়াত লেখা আছে, শুধু মার্কাটা আকর্ষণীয়, দলের নামটা আকর্ষণীয়, এ কারণে প্রতারিত হয়ে, প্রভাবিত হয়ে ভোটাধিকার ব্যবহার করবেন না। ভোটাধিকার ব্যবহার করতে হলে আপনাকে অনেক চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। অনেক দোয়া করতে হবে আল্লাহর দরবারে।

আল্লাহ আমাকে সঠিক কাজ করার তৌফিক দান করো। আর বিশেষভাবে আমি আগেও বলেছি, এ দোয়া করুন এবং এখনো বলছি দোয়া করুন, সেই দোয়া হলো, আল্লাহ যাদের অন্তরে আপনার ভয় নেই, আখেরাতের হিসাব দেওয়ার চিন্তা নেই, আপনার মাখলুকের প্রতি যাদের অন্তরে দয়ামায়া নেই, আল্লাহ তাদের হাতে দেশের ক্ষমতা দিয়েন না। যাদের অন্তরে আপনার ভয় আছে, আখেরাতে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে হিসাব দিতে হবে এই ফিকির যাদের মাথায় আছে এবং আপনার মাখলুকের প্রতি, আল্লাহর বান্দাদের প্রতি যার অন্তরে দয়ামায়া আছে, আল্লাহ তাদের হাতে আপনি ক্ষমতা দিন। এ দোয়া করতে কোনো সমস্যা আছে?

কোনো দলের নাম নিলাম না আমি। কারণ আমার আল্লাহ সবচেয়ে বেশি জানেন। বাস্তব কথা আল্লাহ জানেন কার হাতে ক্ষমতা গেলে তারা উম্মতের জন্য, আল্লাহর বান্দাদের জন্য, দেশের জন্য কল্যাণকামী হবে, এটা আল্লাহ সব থেকেই ভালো জানেন।

আল্লাহর হাওলা করে দিলাম, আল্লাহ তাদের হাতে দেন যারা আখেরাতমুখী, আখেরাতের ফিকির আছে, আপনার ভয় আছে, আপনার মাখলুকের প্রতি যাদের অন্তরে দয়ামায়া আছে তাদের হাতে ক্ষমতা দিন। যাদের অন্তরে আপনার ভয়ও নেই, আখেরাতে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে হিসাব দিতে হবে এই ফিকিরও যাদের নেই, আপনার মাখলুকের প্রতি দয়ামায়াও নেই, হে আল্লাহ তাদের আপনি ক্ষমতা দিয়েন না।

গ্রন্থনা ও শ্রুতিলিখন : হাসান আল মামুন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত