জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে সবসময়ই ভালো এবং সুন্দর কথায় পূর্ণ থাকে। তবে ভোটে জিতলে সেই ইশতেহার আর মনে থাকে না। ক্ষমতায় গিয়ে ইশতেহারে কী ঘোষণা দিয়েছিল সেটিই ভুলে যায় রাজনৈতিক দলগুলো। অতীতে এ ঘটনা ঘটেছে, এবার তার ব্যত্যয় হবে সেটা মনে করেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে এই অভিমত দিয়েছেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনপি গত শুক্রবার তাদের ইশতেহার ঘোষণা করে। এর আগে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) ক্ষমতায় গেলে কী করবে ইশতেহারের মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যে জাতিকে জানিয়েছে। ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিবি) ভোটে অংশগ্রহণ করা অন্য দলগুলোও। পৃথকভাবে ঘোষিত রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নানা রকম মন্তব্য করেন।
বিএনপি ঘোষিত ইশতেহারে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে দাবি করেছে, এই ইশতেহার শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে ইশতেহারে বিএনপি ঘোষণা করেছে, তারা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না। প্রত্যেক নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবেন, সবার আগে বাংলাদেশ।
কর্মজীবী নারীদের কর্মঘণ্টা তিন ঘণ্টা কমানোর যে বক্তব্য নিয়ে নানা রকম আলোচনা-সমালোচনা এর আগেও তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে নির্বাচনী ইশতেহারে রেখেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনেরও ঘোষণা দিয়েছে দলটি। ১০টি প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়ে ইশতেহারে জামায়াত বলেছে, আগামীতে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। আর এর বিপরীতে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করবে।
ইশতেহার প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইশতেহার সবসময়ই ভালো হয়। সুন্দর সুন্দর কথা থাকে। কিন্তু বাস্তবায়ন কথার কথায় পরিণত হয়। নির্বাচনের পরে সবাই ভুলে যায় দলগুলো ইশতেহারে কী ঘোষণা করেছে। আওয়ামী লীগ দিনবদলের কথা বলে ইশতেহার ঘোষণা করেছিল আর ক্ষমতায় গিয়ে দিনকে রাত বানিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মনে রাখা উচিত, জাতির কাছে তাদের অলিখিত চুক্তিই হলো ইশতেহার। ফলে আমি দাবি জানাই, ইশতেহারে করা অঙ্গীকার যাতে তারা বাস্তবায়ন করে।’
ইশতেহার প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার কাগুজে দলিল। এটি জাতির সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। এতদিনের অভিজ্ঞতায় আমরা তাই দেখি।’ তিনি বলেন, নির্বাচনের পর সরকারি ও বিরোধী দল কেউই ইশতেহার খুলে দেখে না। এবার ব্যতিক্রম আশা করব জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইশতেহারে রাজনৈতিক দলগুলো যে অঙ্গীকার করবে, তা বাস্তবায়ন ও সুনির্দিষ্ট করবে।’ তিনি বলেন, দেখতে হবে, ইশতেহার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর কতটা সদিচ্ছা আছে। সেটি রাজনৈতিক দলের কাজের ভেতর দিয়ে এবার দেখতে চাই।’
ইশতেহার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্্ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের ইশতেহার সম্পর্কে মন্তব্য করে কী হয়? ক্ষমতায় গেলে এগুলো মনে থাকে কারও?’ তিনি বলেন, ‘আমি কোনো দলের ইশতেহার এখনো পড়িনি। এখন পর্যন্ত একটি দলের ইশতেহার আমার হাতে এসেছে। বাকি কোনো দলের ইশতেহার আমার হাতে আসেনি। বিশাল বিশাল এসব জিনিস না পড়ে কোনো মতামত আমি দেব না।’
এনসিপির ইশতেহারের মূল অংশ : জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভোটের মাঠে নেমে তাদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে। সেখানে আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) শাসনামলে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি ‘পোস্ট-নাজি জার্মানি ও পোস্ট-অ্যাপার্থাইড দক্ষিণ আফ্রিকার মডেলে’ ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ কমিশন প্রতিষ্ঠার কথা রয়েছে।
দলটি বলেছে, এই কমিশনের মাধ্যমে প্রশাসন, বাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগ-সমর্থক এবং দলটির সহযোগীদের মধ্যে যারা ফৌজদারি অপরাধে যুক্ত নন, তাদের অপরাধ ও সম্পৃক্ততা স্বীকার এবং ক্ষমা প্রার্থনা সাপেক্ষে ‘সোশ্যাল জাস্টিসের’ মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা হবে।
