তিন দিবসে কোটি টাকার ফুল বিক্রির প্রত্যাশা

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৫৭ এএম

ফেব্রুয়ারি  মাস এলেই রঙিন হয়ে ওঠে মানিকগঞ্জের সিংগাইর। পহেলা ফাল্গুনে বসন্তবরণ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এই তিন দিনকে সামনে রেখে উপজেলা জুড়ে ফুলচাষিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। তিন দিবসের সঙ্গে এ বছর যুক্ত হয়েছে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিজয়ী প্রার্থীদের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য ফুলের বাড়তি চাহিদার সম্ভাবনাও। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে মাঠ জুড়ে হাসছে গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা ও রজনীগন্ধা। দিনগুলোকে ঘিরে  সিংগাইরে আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার ফুল বিক্রির প্রত্যাশা করছেন ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা।

 সিংগাইরের ফুল যেমন শহরের পথে পথে রঙ ছড়াচ্ছে, তেমনি এই ফুলই ঘোরাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাও। পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতা, অবকাঠামোগত সহায়তা ও ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা গেলে ফুলচাষ সিংগাইরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপজেলার ধলা ইউনিয়নের ফোর্ডনগর ও জয়মন্টপের ভাকুম, শায়েস্তা ইউনিয়নের নীলটেক, তালেবপুর ইউনিয়নের ইরতা ও নতুন ইরতা এবং জার্মিত্তা ইউনিয়নের পানিশাইল এলাকাগুলো এখন ফুলপল্লী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সিংগাইরে ৩২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। এসব জমিতে গোলাপ, জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকা, গ্লাডিওলাস, জিপসি, স্টার ফুল, রজনীগন্ধা ও গাঁদা ফুল উৎপাদিত হচ্ছে। এসব ফুলের বড় অংশ রাজধানী ঢাকাসহ গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে।

উৎসব যত ঘনিয়ে আসছে, ফুলের দামও তত বাড়ছে। উপজেলার বিভিন্ন ফুলের দোকান ঘুরে ও পাইকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে প্রতিটি দেশি গোলাপ ৪০ থেকে ৫০ টাকা, জারবেরা ৫০ থেকে ৬০ টাকা, গ্লাডিওলাস ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং রজনীগন্ধা ১০ থেকে ১৫ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবসের দিনগুলোতে ফুলের দাম আরও বাড়তে পারে। উপজেলা কৃষি অফিস ও বাজার সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এই তিন দিবসকে ঘিরে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকার ফুল বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।

ফুলচাষিরা জানান, ফেব্রুয়ারিকেই মূল মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময়কে সামনে রেখে জমি প্রস্তুত, সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এবং ফুলগাছের পরিচর্যায় বাড়তি শ্রম ও সময় দিতে হয়। তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাভের হিসাব নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অনেক চাষি। সাম্প্রতিক সময়ে সার ও কীটনাশকের দাম বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট ও মজুরি বৃদ্ধি। ফলে ফুল বিক্রি থেকে যে আয় আসে, তার বড় অংশই চলে যাচ্ছে খরচ মেটাতে।

ধল্লা ইউনিয়নের ফোর্ডনগর এলাকার ফুলচাষি মজিদ জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি ফুল চাষ করছেন। চলতি মৌসুমে ১৫ বিঘা জমিতে চায়না গোলাপসহ বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ করেছেন। মাসে গড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হলেও খরচ বাদে লাভ থাকে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। তবে এ বছর গোলাপে ছত্রাকের আক্রমণ এবং কীটনাশকের দাম বৃদ্ধিতে তিনি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সামনে আসা তিনটি দিবসে ফুলের ভালো দাম পেলে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে আশাবাদী তিনি।

একই এলাকার ফুলচাষি ডাব্লু ও সিরাজ মিয়া বলেন, সারা বছর তারা এ সময়টার জন্য অপেক্ষা করেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফুলের রঙ ও আকার ভালো হয়েছে। তবে সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ন্যায্য দাম না পেলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানান তিনি।

ফুলচাষে পরিবারের সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণও চোখে পড়েছে। ধল্লা ইউনিয়নের ফোর্ডনগর এলাকার শিক্ষার্থী সোলায়মান বাবার সঙ্গে সরাসরি ফুল চাষে সহযোগিতা করছেন। তিনি বর্তমানে অনার্সে পড়াশোনা করছেন এবং তার দুই ভাই লেখাপড়া শেষ করে চাকরিজীবী। শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরির কারণে তারা তিন ভাই মিলে বাবা আব্দুল মজিদের সঙ্গে জমি পরিচর্যা, ফুল তোলা ও অন্যান্য কাজ নিজেরাই করছেন। সোলায়মান বলেন, এতে একদিকে যেমন খরচ কমছে, অন্যদিকে পরিবারের সঙ্গে কাজ করতে পেরে আত্মতৃপ্তি পাচ্ছেন। ফুল চাষের মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিকভাবেও উপকৃত হচ্ছেন।

পাইকারি ফুল ব্যবসায়ী সোহেল রানা জানান, ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আগাম অর্ডার আসছে। তবে পরিবহন ও শ্রম খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার চাপও বাড়ছে। সঠিক সময়ে ফুল বাজারে পৌঁছাতে পারলে লাভের সুযোগ থাকলেও ঝুঁকি কম নয় বলে জানান তিনি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন, সিংগাইরে ফুলচাষ এখন একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সঠিক মাত্রায় সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এবং শ্রম সাশ্রয়ী পদ্ধতি গ্রহণ করলে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকদের লাভ আরও বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত