ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি বলেন, ‘সবাইকে নিয়ে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়াই আমাদের চাওয়া। যেখানে শুধু পারিবারিক পরিচয়ে কেউ দেশের চালকের আসনে বসতে পারবে না। যেখানে রাষ্ট্র হবে সবার, সরকার হবে জনগণের।’ গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে তিনি এ ভাষণ দিয়েছেন। ভাষণে রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতির পাশাপাশি তাবলিগ জামাতের প্রসঙ্গে কথা বলেন তিনি। বিশেষ করে, হ্যাঁ ভোটের পক্ষে তিনি জনগণকে জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন, পাশাপাশি নিজ দল ও ১১-দলীয় প্রার্থীর প্রতীকে ভোট চেয়েছেন তিনি ভাষণের শুরুতে তিনি বলেন, ‘আমরা জুলাই আর চাই না; আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে আর কোনো দিন জনগণকে রাস্তায় নামতে না হয়।’
ভাষণের আরেক অংশে তিনি বলেন, ‘এক কথায় যদি বলি, দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। কিন্তু একটি মহল পরিবর্তনের বিরোধী। কারণ পরিবর্তন হলেই তাদের অপকর্মের পথ বন্ধ হবে, মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা প্রচলিত ধারা বদলাতে চাই। দেশটা বিভেদ ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকুক, মানুষের জীবনে শান্তি ফিরুক।’
জনগণ চাওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জনগণ চায় একটু নিরাপত্তা, সুশাসন ও ইনসাফ। তাই আগামীর বাংলাদেশকে অঙ্গীকার ও মূল্যবোধের আলোকে সাজাতে চাই। রাষ্ট্রের মৌলিক কিছু সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করে; কিন্তু এসব পরিকল্পনার সবগুলো যেমন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, তেমনি অনেকগুলো একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি এবং এ সংস্কার প্রক্রিয়াকে জারি রাখাসহ সংস্কার নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে। এই গণভোট জনগণের সাধারণ ইচ্ছা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট চাই।’
নতুন বাংলাদেশের আকাক্সক্ষার বিষয়ে বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশের আকাক্সক্ষার আলোকে আমাদের পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও অঙ্গীকার আপনাদের কাছে স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশে আমরাই প্রথম পলিসি সামিটের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিকৌশল জনগণের সামনে তুলে ধরেছি। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এর প্রতিফলন রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশের এবং প্রবাসী বিশেষজ্ঞরা অবদান রেখেছেন। এ ছাড়া আমরা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে বসেছি এবং তাদের মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ নিয়েছি। আমরা সুযোগ পেলে, মহান আল্লাহ ইচ্ছায় জনগণের ভালোবাসায় আমরা সরকার গঠন করলে প্রথমদিনে ফজরের নামাজ পড়েই আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু করব ইনশাআল্লাহ।’
বিভিন্ন আমলের সরকার প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদের শাসক শ্রেণি সরকারি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর নিজেদের দেশের মালিক গণ্য করেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, পদপদবি-নীতি-প্রতিষ্ঠান সবকিছু ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ হাসিলের উপায় হিসেবে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছে। এর ফলে চুরি ও দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্রতারিত করে জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করেছে। উন্নয়ন প্রকল্প ব্যক্তিগত ও দলীয় লণ্ঠনের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ব্যবস্থার অবসান ঘটানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে চাই, আমরা কি নিয়মনীতি-শান্তির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, আমরা কি উন্নত দেশ হতে চাই, আমরা কি শোষণ-জুলুম-দুর্নীতি-চাঁদাবাজমুক্ত রাষ্ট্র চাই। আমাদের ভাবতে হবে, আমরা কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে চাই, যোগ্যতা ও সততাকে সরকারি পদের জন্য মৌলিক শর্ত করতে চাই; আমরা কি আমাদের জাতীয় সক্ষমতা এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করতে চাই। এসব বিষয়ে যদি আমরা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চাই, তাহলে আমাদের আগামী নির্বাচন নিয়ে নৈতিকভাবে ভাবতে হবে। রাজনৈতিক কথার ফুলঝুরির বাইরে এসে বাস্তবতার আলোকে সৎ, দক্ষ, নিষ্ঠাবান নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
হ্যাঁ ও না ভোট সম্পর্কে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, ‘আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছি যে আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ তৈরির জন্য পাঁচটি বিষয়ে হ্যাঁ এবং পাঁচটি বিষয়ে না বলতে হবে। সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে আমরা হ্যাঁ বলতে বলেছি। কারণ এসব মৌলিক শর্ত ছাড়া বৈষম্যহীন, উন্নত, নৈতিক মানসম্পন্ন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। পাশাপাশি দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব, চাঁদাবাজিকে স্পষ্ট করে না বলতে হবে।’
নারীর মর্যাদা সম্পর্কে বলেন, ‘যে সমাজ নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সেই সমাজ কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। আমরা ক্ষমতায় এলে নারীরা শুধু ঘরের ভেতরে নয়, সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে থাকবেন সগৌরবে। আমরা মনে করি, সমাজে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবাইকে মর্যাদা দিতে হবে এবং সবার মানবাধিকার সুরক্ষা দিতে হবে। সব পরিচয় নির্বিশেষে আমরা এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি যে, একটি মানবিক-উন্নত দেশ গড়ার জন্য দলমত-নির্বিশেষে সবার মান-ইজ্জত-অধিকারের সুরক্ষা দেব। এই বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার। কেউ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করবে না। যদি কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আঘাত করার চেষ্টা করে, আমরা অতীতের মতো ভবিষ্যতেও তা প্রতিরোধ করব।’
তাবলিগ জামাত প্রসঙ্গে বলেন, ‘তাবলিগ জামাতের ভাইয়েরা, আপনারা দ্বীনের জন্য যে মেহনত করছেন, দেশ গড়ার কাজেও আপনারা আমাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলেও আমরা বিশ্বাস করি। আমরা অঙ্গীকার করছি, ভবিষ্যতে কেউ আপনাদের অন্যায়ভাবে বিভিন্ন বিশেষণে ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন করতে পারবে না। বিচারবহির্ভূতভাবে আপনাদের হত্যা করতে পারবে না। আমরা জানি, অতীতে আপনাদের কোনো মানবাধিকার ছিল না। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো হবে নতুন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জাতীয় নীতি-পদ্ধতিতে আপনাদের আনুষ্ঠানিক অবদান ও ভূমিকাকে জোরদার করা হবে।’
ভাষণে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে জামাতের শীর্ষ নেতা বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক তৈরি করব। আমরা অন্যের ভৌগোলিক অখ-তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করব, তেমনি সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেব। তবে আমাদের জাতীয় স্বার্থ, মর্যাদা, জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্মাণে প্রধান ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক উন্নয়ন চ্যালেঞ্জগুলো যেমন জলবায়ু পরিবর্তন নিরসনে আমরা সাধ্যমতো ব্যবস্থা গ্রহণ করব। নিপীড়নের শিকার হয়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য সব ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হবে।’
