ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে কেউ যেন বিভ্রান্ত করতে না পারে

ভোটারদের সতর্ক করলেন বিএনপি চেয়ারম্যান

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৭ এএম

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘দেশবরেণ্য অনেক আলেম-ওলামা সোচ্চার কণ্ঠে বলেছেন, কেউ কেউ দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মের অপব্যাখ্যা করে বিশ্বাসী মুসলমানদের বিভ্রান্ত করারও অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সুতরাং সব বিশ্বাসীর প্রতি আহ্বান কেউ যেন বিশ্বাসী মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে না পারে, সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’ গতকাল সোমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতারে তার এই ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী। পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ থাকবেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কে কোন ধর্মের? এটি কোনো জিজ্ঞাসা ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০২ং৪ি সালের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধেও কে কোন ধর্মের? কার কি ধর্মীয় পরিচয়? এটি কোনো জিজ্ঞাসা ছিল না। আমরা মনে করি, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। প্রতিটি ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রীতি অনুযায়ী যার যার ধর্ম পালন করবেন। এটি একটি আধুনিক সভ্যসমাজের রীতি। সব নাগরিকের শান্তি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ধর্ম যার যার। নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।’

তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে এটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিককামী জনগণ তাদের স্বাধীনতা হরণকারী স্বৈরাচার ধর্মীয় চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদ কোনোটিকেই পছন্দ করে না। নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সংস্কৃতি বজায় রেখেই যাতে আমরা সবাই মিলেমিশে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে পারি। এ লক্ষ্যেই স্বাধীনতার ঘোষকের যুগান্তকারী রাজনৈতিক দর্শন ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তা। দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই বাংলাদেশ আমাদের সবার, আমরা সবাই বাংলাদেশি।’

জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের উচিত শহীদদের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ গড়া। যারা রক্ত দিয়েছেন, তাদের রক্ত কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেওয়া হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উপনীত বাংলাদেশ। দেশের সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু পতিত পরাজিত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট চক্র জনগণের কাছ থেকে রাষ্ট্রের মালিকানা কেড়ে নিয়েছিল। কেড়ে নিয়েছিল জনগণের সব গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক অধিকার। অবশেষে দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় হাজারো প্রাণের বিনিময়ে জনগণের কাছে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার এক মাহেন্দ্রক্ষণ আমাদের সামনে উপস্থিত। ১২ ফেব্রুয়ারি হতে যাচ্ছে গণতন্ত্রকামী জনগণের বহুল আকাক্সিক্ষত জাতীয় নির্বাচন।’

সরকারে থাকাকালে বিএনপির ভুলত্রুটির জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে তারেক রহমান দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘অতীতে আপনাদের সমর্থনে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে সে সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো আমাদের অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুলত্রুটি হয়েছে। সেজন্য আমি দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’

তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরে বলেন, ‘জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত হলো নাগরিকদের সরাসরি ভোটাধিকার প্রয়োগ। স্থানীয় পরিষদের মাধ্যমে এই অধিকার তৃণমূলপর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের হাতে কুক্ষিগত থাকলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না।’

পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং দেশের টাকা দেশে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে, তা রোধ করা গেলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড এবং বেকার ভাতা দেওয়ার মতো জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য অর্থের কোনো সংকট হবে না। আমরা সেই পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে এনে সাধারণ মানুষের পকেটে ফিরিয়ে দিতে চাই। দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে যতটা কঠোর হওয়া যায়, বিএনপি সরকার ততটাই কঠোর হবে। দেশে আবার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। দেশবাসীর কাছে এটি আমার অঙ্গীকার, বিএনপির অঙ্গীকার।’

প্রশাসন পরিচালনার বিষয়ে বিএনপির নীতি স্পষ্ট করে তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান চলবে শুধু সংবিধান মোতাবেক। আমরা এমন এক রাষ্ট্র গড়তে চাই, যেখানে শাসকরা নিজেদের মালিক মনে করবে না, বরং জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে। আমাদের দলীয় ইশতেহারে বলেছি, জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সরকারি কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের জন্য যথাসময়ে জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা এবং বাস্তবায়ন করা হবে।’

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিগত বছরগুলোয় শাসক শ্রেণি সরকারি পদপদবিকে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ হাসিলের উপায় হিসেবে ব্যবহার করেছে, যা রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দিয়েছে।’

দেশ পরিচালনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় যেতে পারলে প্রথম দিন থেকেই আমরা আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করব। আমাদের লড়াই শুধু ক্ষমতা দখলের নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের হাত থেকে মুক্ত করে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার। প্রশাসন পরিচালনার মূলনীতি হবে সংবিধান। সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করা হবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘প্রবাসীদের সব সমস্যা সমাধান ও বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ করা হবে। বিদেশগামীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘শহীদ জিয়াউর রহমান সংবিধানে আল্লাহ সর্বশক্তিমান শব্দ যুক্ত করলেও তাঁবেদার সরকার সংবিধান বাদ দিয়েছিল। তবে ১২ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতায় এলে আমরা তা পুনঃস্থাপন করব। বিএনপি এমন একটি দেশ গড়তে চায়, যেখানে সব ধর্মের লোক নিরাপদে থাকবে। প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। ধর্ম যার যার নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার। ধর্মীয় উগ্রবাদকে কেউ বিশ্বাস করে না।’

তারেক রহমান দেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে বলেন, ‘বেকারত্ব দূরীকরণ এবং মেধাবীদের মূল্যায়ন করা হবে আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। বিএনপি শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জন্য ছয় মাস থেকে এক বছর, কখনো চাকরি না হওয়া পর্যন্ত বেকার ভাতা দেবে।’ তিনি বলেন, ‘সাইবার নিরাপত্তা, আউটসোর্সিং, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কাজ করবে বিএনপি।’ এ সময় একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে তিনি দেশবাসীর সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত