নজিরবিহীন নিরাপত্তায় নির্বাচন ছিল শান্তিপূর্ণ

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩৮ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের দিন কঠোর অবস্থায় ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নজিরবিহীন নিরাপত্তার বলয় গড়ে তুলেছেন বাহিনীর প্রতিটি সদস্য। ২৯৯ আসনের সব কেন্দ্রেই ছিল সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসারসহ অন্য বাহিনীর সরব উপস্থিতি। ফলে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে একাধিক স্থানে কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও অন্য নির্বাচনগুলোর চেয়ে অনেকটা শান্ত।

ঢাকার প্রায় সবকটি আসনে সরেজমিনে দেখা গেছে. পুলিশ ও আনসারের নিরাপত্তা বলয়। স্টাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী ও বিজিবি রাস্তায় টহল দিয়েছে সার্বক্ষণিক। এমনকি কেন্দ্রের ভেতরেও ছিল কঠোর নজরদারি। আগে থেকেই সিদ্ধান্ত ছিল, যে প্রকারেই হোক শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করবে সরকার। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৯ লাখের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সক্রিয় থাকতে হয়েছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের ভেতর ও বাইরে তিন স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। তাছাড়া স্ট্রাইকিং ফোর্স, বাইরে মোবাইল টিম এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য আলাদা রিজার্ভ ফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়।

এদিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সংঘর্ষের ফলে কোনো হতাহতের খবর ছাড়াই নির্বাচন শেষ হয়েছে বলে গতকাল সন্ধ্যায় এক বার্তায় এ তথ্য জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র‌্যাব দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর বিষয়ে আন্তঃবাহিনী সমন্বয় জোরদার করা হয়। ঢাকাসহ সারা দেশের ৯০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রেই সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করে পুলিশ। ২৫ হাজার ৫০০ ক্যামেরার মধ্যে ১৫ হাজারে সিমকার্ড সংযুক্ত এবং ১০ হাজার অফলাইনে কাজ করেছে। নজরদারিতে যুক্ত ছিল ৫০০ ড্রোন ও ৫০টি ডগ স্কোয়াড। নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি কয়েক দিন ধরেই দেশ জুড়ে টহল, চেকপোস্ট ও তল্লাশি অভিযান চালানো হয়েছে। রাজধানীর প্রবেশপথসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে নজরদারি বাড়ানো হয়। বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার অভিযানও চালিয়েছে দেদার।

এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) বাহারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভোটে যেভাবে আমরা নিরাপত্তার ছক এঁকেছি সেভাবেই আমরা আজ (গতকাল) নিরাপত্তা দিয়েছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি সদস্য নিরলসভাবে কাজ করায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটারদের পাশাপাশি সব দলের প্রার্থীরা আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন।

জানা গেছে, নির্বাচনে ফোর্স মোতায়েনের হিসাবে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার, আনসার ও ভিডিপির ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন সদস্য মাঠে ছিলেন। তার মধ্যে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বে ছিলেন ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৯৫৮ জন আনসার সদস্য। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে আনসারের ১১ হাজার ৯১০ জন প্রস্তুত ছিলেন। তাছাড়া বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫ এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ১৩ হাজার ৩৯০ জন সদস্য মোতায়েন ছিলেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আকাশপথে নজরদারির জন্য বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ৪১৮টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। তার মধ্যে সেনাবাহিনী ২০০টি, বিজিবি ১০০টি, পুলিশ ৫০টি, কোস্ট গার্ড ২০টি এবং নৌবাহিনী, র‌্যাব, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ১৬টি করে ড্রোন ব্যবহার করে। দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের ২৪ হাজার কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ থাকলেও সেখানে বেশি নজরদারি থাকায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ঢাকা মহানগর পুলিশ চেকপোস্ট ও টহল কার্যক্রম জোরদার অব্যাহত আছে। যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, সোয়াট, কে-৯ ইউনিট ও ক্রাইম সিন ভ্যানও মাঠে সক্রিয় ছিল।

এবারের নির্বাচন জাতির কাছে উদাহরণ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, এবারের নির্বাচন ঐতিহাসিক ও জাতির কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, চামেলীবাগ গোল্ডেন ইরা কিডস স্কুল, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল এজিবি কলোনি কমিউনিটি সেন্টার, টিঅ্যান্ডটি উচ্চ বিদ্যালয় ও তেজগাঁও কলেজ ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত প্রিসাইডিং অফিসার ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি ভোটের সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

আনসার মহাপরিচালক যা বললেন : আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ গতকাল রাজধানীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। তিনি টিঅ্যান্ডটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, খিলগাঁও মডেল কলেজ এবং খিলগাঁও মডেল উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি কেন্দ্রগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শৃঙ্খলা রক্ষা কার্যক্রম এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের প্রস্তুতি ও তৎপরতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সদস্যদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে ভোটারদের নির্বিঘœ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

জীবনের প্রথম ভোট দিলাম র‌্যাব মহাপরিচালক : নির্বাচনে ভোট দিয়ে নিজের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন র‌্যাব মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘জীবনের প্রথম ভোট দিলাম। পেশাগত কারণে আগে কখনো ভোট দেওয়া হয়নি। গতকাল গুলশান মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি ছিল আমাদের। আর এ কারণে অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন, গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত ডিবি প্রধান : নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম। গতকাল তিনি বলেন, সারা দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। এ পর্যন্ত কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা উল্লেখযোগ্য অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়নি। ডিবিপ্রধান বলেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে অন্যান্য বাহিনীর পাশাপাশি সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল যেকোনো পরিস্থিতিতে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা সেই লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছি। দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা চলমান থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত