চিরস্থায়ী সুখের ঠিকানা জান্নাত

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৯ এএম

জান্নাত আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ বাগান। ইসলামি পরিভাষায় জান্নাত বলতে এমন স্থানকে বোঝায়, যা মহান আল্লাহ তার অনুগত বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছেন, যেখানে দিগন্ত বিস্তৃত নানা রকম ফুলে ফলে সুশোভিত সুরম্য অট্টালিকা সংবলিত মনোমুগ্ধকর বাগান রয়েছে। যার পাশ দিয়ে প্রবহমান বিভিন্ন নদী-নালা ও ঝর্ণাধারা। যেখানে চির বসন্ত বিরাজমান। কেয়ামতের দিন হিসাব-নিকাশ শেষে নেক বান্দাদের সেখানে প্রবেশ করানো হবে।

জান্নাতের প্রশস্ততা আসমান ও জমিনের সমান। এর দৈর্ঘ্য ও বিশালতা এতটাই যে, এর ভেতর একশটি স্তর রয়েছে। প্রতিটি স্তর এতই বিস্তৃত যে, যদি সারা বিশে^র সব মানুষকে কেবল একটি স্তরেই সমবেত করা হয়, তবুও সেখানে জায়গা অবশিষ্ট থেকে যাবে। (তিরমিজি ২৫৩১) জান্নাতে হিরা ও জহরত খচিত সুউচ্চ প্রাসাদ থাকবে। প্রাসাদের ভেতর থেকে বাইরের দৃশ্য এবং বাইরে থেকে ভেতরের সবকিছু স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। এসব প্রাসাদের দেয়াল নির্মিত হয়েছে সোনা ও রূপার ইট দিয়ে। আর ইটের গাঁথুনিতে ব্যবহৃত হয়েছে সুগন্ধি কস্তুরীর আস্তর। জান্নাতের জমিন জাফরান দিয়ে তৈরি এবং এতে পাথরকুচির পরিবর্তে ছড়িয়ে আছে মণি-মুক্তা ও দামি পাথর। (তিরমিজি ২৫২৬)

জান্নাত চিরস্থায়ী সুখের ঠিকানা। সেখানে আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি, আমোদ-প্রমোদ, চিত্তবিনোদন ও আনন্দ-আহ্লাদের ব্যবস্থা রয়েছে। জান্নাতে ভোগ-বিলাসের সব উপায়-উপকরণ বিদ্যমান। সেগুলো স্বাদ ও গন্ধে অপূর্ব। সেখানে থাকবে সুমিষ্ট পানির নহর, দুধের নদী, স্বচ্ছ মধুর ঝরনা এবং এমন পানীয়, যা পান করলে কখনো তৃষ্ণা পাবে না। জান্নাতবাসীরা তাদের পছন্দমতো ফলমূল ও খাদ্য লাভ করবেন। জান্নাতিরা যা কিছু পাওয়ার আকাক্সক্ষা করবে, চোখের নিমিষে তা পেয়ে যাবে। জান্নাতে মানুষের শরীর থেকে কোনো অপবিত্র জিনিস (মল-মূত্র) বের হবে না। জান্নাতে কোনো নোংরা বা অপ্রীতিকর গন্ধ থাকবে না, সব কিছু পবিত্র ও সুগন্ধময় হবে।

হাদিসে এসেছে, ‘জান্নাতিরা যা খাবে, তা তাদের শরীর থেকে মেশকের মতো সুগন্ধি হিসেবে বের হবে।’ (সহিহ মুসলিম ২৮৩৫) সেখানে সবাই যুবক হয়ে বাস করবে। জান্নাতে দুনিয়ার এই দৈহিক কাঠামো থাকবে না। জান্নাতের বিশাল রাজ্যে রাজত্ব করার জন্য জান্নাতি সাজে জান্নাতবাসীদের দেহ সাজানো হবে। সেখানে নতুন দেহ, নতুন বয়সে নতুনভাবে মুমিনরা নিজেদের আবিষ্কার করবে। জান্নাতবাসীদের দেহের দৈর্ঘ্য হবে ৬০ হাত।

জান্নাতির শরীরে কোনো রোগ-শোক, জরাজীর্ণতা, মন্দা, বার্ধক্য, দুর্বলতা ও শারীরিক অক্ষমতা থাকবে না। জান্নাতে কোনো ধরনের মানসিক বা শারীরিক কষ্ট থাকবে না। তাই জান্নাতে কান্না, হতাশা, উদ্বেগ বা মানসিক অশান্তি থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা সেখানে কোনো কষ্ট অনুভব করবে না এবং সেখান থেকে তাদের বের করে দেওয়া হবে না।’ (সুরা হিজর ৪৮) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে, কখনো দুঃখভোগ করবে না। তার পোশাক কখনো পুরনো হবে না, আর তার যৌবন কখনো শেষ হবে না।’ (সহিহ মুসলিম ২৮৩৬)

দুনিয়ায় সুখ-শান্তির যত ব্যবস্থা আছে, জান্নাতের সুখ-শান্তির তুলনায় তা কিছুই না। বরং তা দুনিয়ার সব আরাম-আয়েশকে হার মানাবে। কোরআন ও হাদিসে জান্নাতের সৌন্দর্য, সুখ, শান্তি ও নেয়ামতের এমন বর্ণনা এসেছে, যা মুমিনের হৃদয়ে ইমানকে দৃঢ় করে এবং নেক আমলের প্রেরণা জাগায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কেউ জানে না, তাদের জন্য কী কী নয়নাভিরাম নেয়ামত লুকায়িত আছে কৃতকর্মের প্রতিদান স্বরূপ।’ (সুরা সাজদা ১৭)

অন্যত্র মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের  পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সেই জান্নাত লাভের জন্য একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হও, যার প্রশস্ততা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমান, যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান ১৩৩)

জান্নাত হলো মুমিনদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ও অনন্তকালের প্রশান্তি। পার্থিব জীবনের সাময়িক মোহ ত্যাগ করে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলে, তাদের জন্যই এই চিরস্থায়ী সুখের ঠিকানা অপেক্ষা করছে। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, নেক আমলের মাধ্যমে সেই মহিমান্বিত জান্নাতের উপযোগী করে নিজেকে গড়ে তোলা।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত