ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্পের মহাপরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবসম্মত?

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৮ এএম

ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল খনিগুলোকে মার্কিন জ্বালানি খাতের জন্য উন্মুক্ত করতে চান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত জানুয়ারিতে এক ঝটিকা অভিযানে দেশটির সমাজতান্ত্রিক নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ এখন আমেরিকার হাতের মুঠোয় আসবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্পের এই ব্যবসায়িক পরিকল্পনা কি আসলেই বাস্তবসম্মত?

ট্রাম্পের দৃষ্টিতে মাদুরোর পতন মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর জন্য এক বিশাল সুযোগ। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার আইনপ্রণেতারা জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগের পথ সুগম করতে একটি নতুন বিল পাস করেছেন। হোয়াইট হাউসে জ্বালানি খাতের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, আমরা এমন পরিমাণে তেল উত্তোলন করতে যাচ্ছি যা খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পেরেছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম জ্যাকসন মনে করেন, ট্রাম্পের লক্ষ্য হলো ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করে বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়ানো এবং মার্কিন ভোক্তাদের জন্য জ্বালানি খরচ কমানো। তবে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সামনে রয়েছে বিস্তর ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ।

দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অযত্নে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ এখন কঙ্কালসার। মাদুরো এবং তার পূর্বসূরি হুগো চাভেজ জনকল্যাণমূলক কাজে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও তেল উৎপাদন ব্যবস্থা আধুনিকায়নে কোনো বিনিয়োগ করেননি। ফলে গত এক দশকে দেশটির উৎপাদন প্রতিদিন ১৫ লাখ ব্যারেল কমে গেছে।

পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের গবেষক মনিকা ডি বোলে বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামোর অনেক কিছুই এখন সম্পূর্ণ ধ্বংস করে নতুন করে গড়তে হবে। রাজনৈতিক বাধা না থাকলে পিডিভিএসএ বিলুপ্ত করাই হতো সবচেয়ে ভালো সমাধান। কিন্তু তেল সেখানে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক, ভেনেজুয়েলার নাগরিকরা মার্কিন কথামতো সব মেনে নেবে—এমনটা ভাবা ভুল হবে।’

কাগজে-কলমে ভেনেজুয়েলার ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুদ থাকলেও ২০২৩ সালে দেশটি মাত্র ৪ বিলিয়ন ডলারের তেল রপ্তানি করেছে। বিপরীতে সমান মজুদের দেশ সৌদি আরব রপ্তানি করেছে ১৮১ বিলিয়ন ডলারের তেল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের গুণগত মানও এখানে একটি বড় সমস্যা। ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল অত্যন্ত ভারী এবং এতে সালফারের পরিমাণ বেশি, যা উত্তোলনের জন্য ব্যয়বহুল এবং পাইপলাইনের জন্য ক্ষতিকর।

ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো মেরামতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু কোম্পানিগুলো চরম আতঙ্কে রয়েছে। ২০০৭ সালে এক্সন মবিল এবং কনোকো ফিলিপসের মতো বড় কোম্পানিগুলোর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছিল তৎকালীন ভেনেজুয়েলা সরকার। সেই পাওনা আজও আদায় হয়নি।

এক্সন মবিলের প্রধান নির্বাহী ড্যারেন উডস বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলাকে ‘বিনিয়োগের অনুপযোগী’ বলে ঘোষণা করেছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প কোম্পানিটিকে ভেনেজুয়েলার বাজার থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। কোনো নিরাপত্তা গ্যারান্টি বা বড় ধরনের ইনসেনটিভ ছাড়া মার্কিন কোম্পানিগুলো এই ঝুঁকিপূর্ণ খাতে পা রাখতে নারাজ।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ‘সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি’ এবং বেসরকারি খাতের অনীহা তার তেল স্বপ্নকে ফিকে করে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার উৎপাদন বিশ্ববাজারে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে কি না, তা নির্ভর করবে দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের ওপর, যা এখনো সুদূরপরাহত।

সূত্র: বিবিসি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত