বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এমন এক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে, যেখানে সমস্যার সমাধান হিসেবে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তই নতুন জটিলতার জন্ম দিচ্ছে।
এককথায়, সমস্যার পাহাড়ে চাপা পড়েছে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষা হবে, জ্বালানি খাত সামাল দেওয়া। কারণ বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, কর্মসংস্থান সবকিছুর কেন্দ্রেই জ্বালানি। গত এক দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে, কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা ক্রমশ ভঙ্গুর হয়েছে। সস্তা প্রাইমারি এনার্জি নিশ্চিত না করে সেকেন্ডারি এনার্জি বা বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা ও জ্বালানি সরবরাহের মধ্যে গভীর বৈষম্য তৈরি হয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত, বাস্তবে লোডশেডিং এই দ্বৈত বাস্তবতা এখন সাধারণ মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সামনে সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মকাল। নতুন সরকার, বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যদি এই সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যর্থ হয়, তাহলে রাজনৈতিক চাপ দ্রুত বাড়বে। আবার বিগত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেখানো পথে হাঁটলে, দীর্ঘমেয়াদে সংকট আরও বাড়বে। ফলে সরকারকে স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হবে। বিএনপি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়েছিল। এখন জনগণ সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে। ফলে বিএনপিকে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সব সুযোগ ব্যাপকভিত্তিক কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় জ্বালানির অনুসন্ধান কাজও জোরালোভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
গ্যাস সংকট আজ আর শুধু বাসাবাড়ির সমস্যা নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সারকারখানা, শিল্পকারখানা সবখানেই এর প্রভাব পড়ছে। অথচ একই সঙ্গে বিদেশ থেকে ব্যয়বহুল এলএনজি ও কয়লা আমদানি করা হচ্ছে। বিপুল বিনিয়োগে বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলেও জ্বালানির অভাবে সেগুলোর অনেকগুলোই পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। অথবা অলস বসে আছে। এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘ অবহেলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে নীতিগতভাবে পিছিয়ে রাখা, দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর রাজনৈতিক চাপ এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা সব মিলিয়ে খাতটি একটি ব্যয়বহুল ফাঁদে আটকে গেছে। এর খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ ও শিল্প খাত। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২,২০০ থেকে ২,৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে, যেখানে চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ। দেশের অন্যতম বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে আসা ভবিষ্যতের ঝুঁকির স্পষ্ট ইঙ্গিত। আগে যেখানে মার্কিন কোম্পানি শেভরন প্রায় ১,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করত, এখন তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অতিরিক্ত উত্তোলন ও নতুন অনুসন্ধানের অভাব পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলেছে। ফলাফল খুবই স্পষ্ট। দেশীয় গ্যাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিদ্যুৎ ও শিল্প খাত ব্যবস্থা দ্রুত ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি সাময়িক সমাধান দিলেও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়িয়েছে এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং পেট্রোবাংলা, দুটিই এখন আর্থিক চাপে ন্যুব্জ অথবা দেউলিয়ার পথে।
পরিস্থিতি সামলাতে যেমন দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে, তেমনি দেশি-বিদেশি ঋণ নিয়ে বিদ্যুৎ খাতের দায় পরিশোধ করা হয়েছে। এটি সাময়িক সমাধান, স্থায়ী নয়। একদিকে নতুন ঋণ, অন্যদিকে পুরনো দায় এই চক্র চলতে থাকলে জ্বালানি খাত অর্থনীতির ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে। একসময় জ্বালানি সংকটকে দরিদ্র মানুষের সমস্যা মনে করা হতো। এখন শিল্পপতিরা প্রতিদিন গ্যাস ও বিদ্যুতের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন। কারণ জ্বালানি ছাড়া রপ্তানিমুখী শিল্প টিকবে না। গ্যাসের অভাবে ইতিমধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। শিল্প বন্ধ হলে কর্মসংস্থান কমবে, বৈদেশিক আয় কমবে, অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে। ফলে জ্বালানি সংকট এখন ধনী-গরিব সবার সমস্যা। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের রাজনীতি না করে টেকসই সিদ্ধান্ত নেওয়া। তারেক রহমান দেশে ফিরে বলেছেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান।’ জনগণ সেই পরিকল্পনার বাস্তব রূপ দেখতে চায়। আগেই বলেছি, বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়টি অগ্রাধিকার পেয়েছে। দলটির ঘোষিত অগ্রাধিকার দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য শক্তির সম্প্রসারণ এখন বাস্তব পদক্ষেপে পরিণত করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাময়িক জনপ্রিয়তার জন্য এমন সিদ্ধান্ত না নেওয়া, যা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি করবে। প্রথমেই সরকারের করণীয়আওয়ামী লীগ আমলে প্রণীত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (আইইপিএমপি) চূড়ান্তভাবে বাতিল করতে হবে। অন্তর্র্বর্তী সরকার গৃহীত আমদানিনির্ভর খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত মহাপরিকল্পনা (ইপিএসএমপি) ব্যাপক সংস্কার করে দেশীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবিলম্বে একটি নতুন জাতীয় জ্বালানিনীতি প্রণয়ন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে একসঙ্গে বিবেচনায় এনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। দুই. জ্বালানি খাতে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা বন্ধ করতে হবে। প্রকল্প গ্রহণ থেকে চুক্তি পর্যন্ত তথ্য উন্মুক্ত করা হলে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমবে। তিন. দেশের জল, স্থল ও সম্ভাবনাময় পাহাড়ি অঞ্চলে ব্যাপকভিত্তিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করতে হবে।
পেট্রোবাংলা-বাপেক্সের জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান দুটির ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে। সাধারণ আমলাতন্ত্র থেকে পেট্রোবাংলা-বাপেক্সকে বের করে পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার, জিওলজিস্ট বা জ্বালানি খাতের দক্ষ ব্যক্তিদের এর দায়িত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ, পেট্রোবাংলা-বাপেক্সকে আন্তর্জাতিক মানের তেল-গ্যাস বা খনিজ সম্পদ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরকে করতে হবে। চার. দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে জাতীয় বাজেটে ব্যাপকভিত্তিক বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পাঁচ. আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে রূপান্তর শুরু করতে হবে। এখানে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকে কর সুবিধা, সহজ ঋণ ও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে এই রূপান্তরকে উৎসাহ দিতে হবে। ছয়. নতুন কয়লা বা তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন বন্ধ করে অকার্যকর কেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে। ক্যাপাসিটি চার্জের মতো অযৌক্তিক ব্যয় কমানো না গেলে বিদ্যুৎ খাত আর্থিকভাবে টেকসই হবে না। সাত. বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত এলএনজি আমদানিনির্ভর বাণিজ্য চুক্তি সংশোধন করতে হবে। আট. এলএনজিনির্ভর মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা (মিডি) সংশোধন অথবা বাতিল করতে হবে। নয়. নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিবর্তে গ্যাসের অপচয় রোধে জোর দিতে হবে। শিল্পে ধীরে ধীরে গ্যাসের পরিবর্তে বিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে গ্যাস লিকেজ ও অবৈধ সংযোগ বন্ধ করা জরুরি। দশ. নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য স্পষ্ট জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া যেতে পারে। বাজেট বরাদ্দেও এই অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। এগারো. পরিবহন খাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার অপরিহার্য। এতে জ্বালানি আমদানির চাপ কমবে এবং নগর দূষণও হ্রাস পাবে। বারো. জাতীয় গ্রিড আধুনিকায়ন করে স্মার্ট গ্রিডে রূপান্তর জরুরি। বিকেন্দ্রীকৃত সৌরবিদ্যুৎ, বিশেষ করে গ্রামীণ ও কৃষিভিত্তিক ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত হতে হবে দেশীয় উৎসকে প্রাধান্য দিয়ে। যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎসহ অন্যান্য উৎস প্রাধান্য পাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে এ খাতে বাংলাদেশের ব্যাপকভিত্তিক সুযোগ রয়েছে। অন্তর্র্বর্তী সরকার এরইমধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্র্রহণ করেছে। নতুন সরকারের উচিত হবে এটি এগিয়ে নেওয়া। দেশের শিল্পঘন এলাকা যেমন সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, চট্টগ্রাম, মুন্সীগঞ্জ ও নরসিংদী এলাকায় ছাদভিত্তিক বিদ্যুতের বিরাট সুযোগ রয়েছে। এজন্য সরকারকে যেমন সহজ নীতি গ্রহণ করতে হবে তেমনি শিল্পমালিকদের এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য হতে পারে ভয়াবহ। কিন্তু সঠিক নীতিনির্ধারণ, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে, এই সংকটই নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিতে পারে। নতুন সরকারের সামনে প্রশ্ন একটাই তারা কি সাময়িক স্বস্তির রাজনীতি করবে, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, টেকসই এবং স্বনির্ভর জ্বালানি কাঠামো গড়ে তুলবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অর্থনীতির আগামী পথ।
লেখক: সাংবাদিক
