দুদিন ধরেই বাড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের দাম। রোজার আগের দিন বাজার যেন আরও ‘তেলেবেগুনে’ জ¦লে উঠেছে। পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, লেবু, শসা, বেগুন থেকে শুরু করে কলা, বড়ই, খেজুরের মতো পণ্যগুলোতে চড়া দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। বিশেষ করে রোজায় যেসব পণ্যের বাড়তি চাহিদা রয়েছে সেগুলোর দাম বাড়ছে। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বলছে বাজারে পণ্যের যথেষ্ট সরবরাহ রয়েছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাড্ডা, রামপুরা, সেগুনবাগিচা, মগবাজার, মালিবাগসহ কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক কেজি পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে কমপক্ষে ৭০ টাকায়। অথচ মঙ্গলবার সকালেও খুচরা দোকানিরা ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় প্রতিকেজি পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন। পেঁয়াজের মৌসুম চলমান
থাকায় দোকানগুলোতে সরবরাহের কোনো কমতি দেখা যায়নি। অথচ রাতারাতি বেড়ে গেল পণ্যটির দাম।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, রোজার মাসে স্বাভাবিক সময়ে দ্বিগুণ বা ৫ লাখ টনের মতো পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। এই বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরের মতো এবারও দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এদিকে দেশে প্রতিবছর ২৮ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে ৩৫ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। যদিও পরিবহন, সংরক্ষণের জটিলতাসহ নানা কারণে ২৫ শতাংশ বা তারও বেশি পেঁয়াজ নষ্ট হয়।
কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজের আড়তদার আশরাফুল দেশ রূপান্তরকে জানান, স্থানীয় পাইকাররা দুদিন ধরে বাড়তি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। চাহিদা বেশি বলেই তারা দাম বাড়িয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে। তবে পেঁয়াজের কোনো সংকট নেই।
প্রতিবছর রোজা এলেই পেঁয়াজের মতোই বেড়ে যায় কাঁচামরিচের দাম। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। প্রতিকেজি কাঁচামরিচের দাম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। রাতারাতিই বেড়ে ২০০ টাকায় উঠেছে। বিক্রেতারা বলছেন, বাড়তি চাহিদা তৈরি হচ্ছে, ক্রেতারা বেশি বেশি কিনছেন। এ জন্য দাম বেড়েছে।
রোজায় ইফতারের বড় অনুষঙ্গ লেবু। প্রতিবছর রোজার ঠিক একদিন, দুদিন আগে এর দাম বাড়লেও এবারে প্রায় ১৫ দিন আগেই বেড়েছে দাম। উৎপাদন মৌসুম না হওয়ার পরও চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার কারণে পণ্যটির সরবরাহ সংকট রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাজারে অপরিপক্ব লেবু বিক্রি করতে দেখা গেছে। প্রতি হালি লেবু আকারভেদে ৭০ টাকা থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। একইসঙ্গে বেড়েছে বেগুনের দাম। ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হওয়া বেগুন গতকাল ঢাকার বিভিন্ন বাজারে ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। ইফতারে মুখরোচর বেগুনি খাওয়ার অভ্যস্ততার কারণে এই সবজিটির চাহিদা বেড়ে যায় এবং দামও লাফিয়ে বাড়ে রোজা এলে। একইভাবে প্রতিকেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে। শসার দাম ৬০-৭০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এর পাশাপাশি ব্রয়লার মুরগির দাম সপ্তাহখানেক আগেই বেড়েছে। প্রতিকেজি ১৯৫ থেকে ২০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। যা এর আগে ছিল ১৭৫ থেকে ১৮৫ টাকা। তবে ডিমের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে। কদিন আগেই অবশ্য গরুর মাংসের দাম ৮শ টাকায় উঠেছে।
তবে মাছের দামে প্রকারভেদে কেজিতে ৫০ থেকে ২শ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে প্রতিকেজি রুই বা কাতল মাছের কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। মানভেদে ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হওয়া পাবদা মাছ এখন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রকারভেদে প্রতিকেজি ছোট মাছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। এর মধ্যে একটি টেংরা। বড় আকারের টেংরা মাছ প্রতিকেজি ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। যা আগে ছিল ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। পাঙ্গাস, তেলাপিয়ার দামও কেজিতে ৫০ টাকা করে বেড়েছে।
সবজি, মাছ ও মাংসই নয়, দাম বৃদ্ধির তালিকায় যুক্ত হয়েছে সব ধরনের ফলমূল। এর মধ্যে কলা, বড়ই, খেজুর থেকে শুরু করে বিদেশি ফল আপেল, কমলা, আঙুরও বাদ নেই। বেড়েছে সব ফলের দাম। গতকাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, দেশীয় ফল হিসেবে পরিচিত কলা প্রতি ডজন বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ২০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে। এক ডজন সাগর কলা বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা ডজন, যা ১২০ টাকায় পাওয়া যেত কয়েকদিন আগে। সবরি কলাও বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা ডজন হিসেবে। একইভাবে বাংলা কলা ১০০ থেকে ১২০ টাকা বিক্রি হতে দেখা গেছে। যা আগের চেয়ে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি। বড়ইয়ের কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম দেখা গেছে।
রোজার আগে দেশি-বিদেশি প্রায় সব ফলের দাম বেড়েছে। আপেল মাল্টার মতো ফলগুলোর দাম প্রায় ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে। এদিকে তরমুজের মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হলেও আকারভেদে কেজিপ্রতি দাম চাওয়া হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকা। পেয়ারার দাম বেড়ে আকারভেদে প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। আর আকারভেদে প্রতিটি আনারস ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে বিদেশি ফলের মধ্যে রোজায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে খেজুর, মাল্টা ও আপেলের। এর মধ্যে মাল্টা ও আপেলের দাম বেড়েছে ৬০ টাকা পর্যন্ত। মাল্টার দাম কেজিপ্রতি বেড়ে ৩২০ থেকে ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা আগে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা ছিল। আর আপেলের কেজি প্রকারভেদে ৩৬০ থেকে ৪৫০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, যেখানে রোজার কারণে ফলের চাহিদা বেড়েছে, সে অবস্থায় নির্বাচনের ফলে সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে। পরিবহন খরচও বেড়েছে কয়েকগুণ। এদিকে বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর অভিযোগও আছে।
এই অবস্থার মধ্যেও আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি গতকাল সচিবালয়ে প্রথম অফিস করতে এসে সাংবাদিকদের জানান, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে বাজারও স্থিতিশীল থাকবে। রমজান মাস ও পরবর্তী সময়ের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ সরকারের হাতে রয়েছে। ফলে বাজার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
মন্ত্রী জানান, তিনি শুধু বক্তব্য দিতে চান না, বরং কাজের মাধ্যমে ফল দেখাতে চান।