দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক নৃবিজ্ঞানের পরিমণ্ডলে আন্দ্রে বেতেই (André Béteille) এক বিরল ও অনন্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি কেবল তত্ত্ব ও মতাদর্শের বিমূর্ত আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সমাজকে দেখেছেন জীবন্ত বাস্তবতা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং জটিল আন্তঃসম্পর্কের সমন্বিত পরিসর হিসেবে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ৯১ বছর বয়সে দিল্লিতে নিজের বাসভবনে তার মৃত্যুর ফলে, ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটে। বেতেইর মৃত্যু কেবল এক ব্যক্তির নীরব সমাপ্তি নয়; এটি একটি বৌদ্ধিক ধারার অবসান, যেখানে যুক্তি, মানবিকতা ও ধারাবাহিক বিশ্লেষণ সম্মিলিতভাবে মানুষের জীবনের সামাজিক বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করত। দ্বৈত কালচারাল উত্তরাধিকারের ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে তার শৈশব, কৈশোর ও শিক্ষার বৌদ্ধিক ভিত্তি। ১৯৩৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের চন্দননগরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এক ফরাসি পিতা ও বাঙালি মায়ের ঘরে। এই দ্বৈত কালচারাল উত্তরাধিকারের পারিবারিক পরিবেশই তাকে শৈশব থেকেই বহু সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা ও তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত করে। পরবর্তী সময়ে তার চিন্তায় বিশেষ করে সামাজিক বিশ্লেষণে যে বহুমাত্রিকতা, তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও ভারসাম্য লক্ষ্য করা যায়, তার বীজ নিহিত ছিল এই অভিজ্ঞতায়। শিক্ষাজীবন শুরু হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তিনি মানবিক ও সামাজিক প্রশ্নগুলোর সঙ্গে পরিচিত হন। পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি অর্জনের মাধ্যমে তিনি সমাজবিজ্ঞানের গভীর অন্বেষণে প্রবেশ করেন, বিশেষত ভারতীয় সমাজের বর্ণভেদ প্রথা, শ্রেণি বিভাজন ও ক্ষমতা কাঠামোর সম্পর্ক নিয়ে। আন্দ্রে বেতেইয়ের (১৯৩৪-২০২৬) একাডেমিক জীবন ছিল বিস্তৃত ও আন্তর্জাতিক পরিম-লে পরিব্যাপ্ত।
দীর্ঘ প্রায় চার দশক তিনি দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিক্সে শিক্ষকতা ও গবেষণার প্রতি নিবেদিত ছিলেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে ভারতের তুলনামূলক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সসহ বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানের উপস্থিতিকে সুদৃঢ় করেন। তবু লক্ষণীয়, বহু আন্তর্জাতিক সুযোগ সত্ত্বেও তিনি গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে নিজের দেশ ভারতকেই বেছে নিয়েছিলেন। ভারতীয় সামাজিক বাস্তবতাকে দেশীয় প্রেক্ষাপটে, নিজস্ব বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনুধাবন করাই ছিল তার বৌদ্ধিক অঙ্গীকার। ত্রিমাত্রিক প্রেক্ষাপট তথা জাতিভেদ প্রথা, শ্রেণি বিভাজন ও ক্ষমতার সমন্বিত প্রেক্ষাপট থেকে আন্দ্রে বেতেই সামাজিক সম্পর্কের জটিলতা ও আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। প্রথাগত ভারতীয় সমাজতত্ত্বের ধর্মীয় বিশ্বাস-নির্ভর বিচার-বিশ্লেষণের বিপরীতে, তথ্য-উপাত্ত-নির্ভর যুক্তিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি এমন সমাজচিন্তাবিদ ছিলেন, যিনি সমাজের বিশ্লেষণে কুসংস্কারগত বা একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেননি। তিনি সুচারুভাবে তুলে ধরলেন যে, কেবল ধর্মীয় বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে বর্তমান ভারতের জাতিগত রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তিনি দেখিয়েছেন, সমাজের স্তরায়ণকে বোঝা যায় জাতি (কাস্ট), শ্রেণি (ক্লাস) এবং ক্ষমতার (পাওয়ার) সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে।
ক্ষেত্রসমীক্ষা ও শ্রেণিভিত্তিক বাস্তবতা উঠে এসেছে তার একাডেমিক কর্মে, যা গবেষণার অন্যতম শক্তি। বেতেইয়ের গবেষণার অন্যতম ভিত্তি হলো, তামিলনাড়–র থাঞ্জাভুর জেলার শ্রীপুরম গ্রামে ষাটের দশকের গোড়ার দিকে দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা, যা পরবর্তী সময় ১৯৬৫ সালে ‘বর্ণ, শ্রেণি ও ক্ষমতা : তাঞ্জোরের একটি গ্রামে স্তরবিন্যাসের পরিবর্তনশীল ধরন’ (কাস্ট, ক্লাস অ্যান্ড পাওয়ার : চেইঞ্জিং প্যাটার্নস অব স্ট্র্যাটিফিকেশন ইন এ তাঞ্জোর ভিলেজ) নামে প্রকাশিত হয়। তার এই গবেষণাভিত্তিক গ্রন্থ ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানে একটি যুগান্তকারী সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তথা ক্ল্যাসিক কাজ হিসেবে স্বীকৃত। এই গ্রন্থে তিনি প্রমাণ করেন, সমাজের স্তরায়ণ কেবল বর্ণভিত্তিক পরিচয়ের ওপর স্থির নয়; বরং আধুনিক শিক্ষা, পেশাগত সুযোগ, ভূমির মালিকানা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। আন্দ্রে বেতেই বিশ্লেষণ করেন যে, বিদ্যমান ঐতিহ্যগত ব্রাহ্মণ্যবাদী ঐতিহ্যগত প্রভাব সমাজে ধীরে ধীরে দুর্বল ও রূপান্তরিত হচ্ছে এবং তার পাশাপাশি আবার নতুন সামাজিক শক্তি যেমন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় গোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এসব উঠে আসছে এক সমান্তরাল স্তরায়ণের অংশ হিসেবে। ফলে সমাজে এক সমান্তরাল স্তরায়ণ গড়ে উঠছে, যেখানে বর্ণ, শ্রেণি ও ক্ষমতা একযোগে কাজ করছে। বেতেই আরও দেখান যে, কাস্টের তথা বর্ণভেদ প্রথার ওপর ভিত্তি করে ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করলে তা ভূগোলের মতো স্থির হয়ে যায়। ফলে সমাজকে স্থির ও অপরিবর্তনীয় বলে মনে হতে পারে; কিন্তু বাস্তবে সমাজ গতিশীল এবং তার ভেতরে বিভিন্ন শক্তির পারস্পরিক টানাপড়েন সক্রিয় থাকে। এই বইটিতে তিনি কেবল বর্ণ কাঠামো থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়ে অর্থনৈতিক শ্রেণি, সামাজিক তথা আচার-অনুষ্ঠানের মর্যাদা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরের দিকে নিয়ে যায়, যা প্রকাশ করে যে কীভাবে ঐতিহ্যবাহী বর্ণপ্রথার আধিপত্য হ্রাস পাচ্ছে।
সমাজ, ন্যায্যতা ও আধুনিকতা তার কাজের পরিধিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ওপরে আলোচিত বইটি ছাড়াও বেতেই লিখেছেন বেশ কিছু বই ও প্রবন্ধ। তার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো, ‘ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতি’ (সোসাইটি অ্যান্ড পলিটিক্স ইন ইনডিয়া), ‘প্রাকৃতিক বৈষম্যের ধারণা ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ (দ্য আইডিয়া অব ন্যাচারাল ইনইকুয়ালিটি অ্যান্ড আদার এসেজ), ‘সমাজের বিরোধিতা’ (এন্টিনোমিস অব সোসাইটি)। এসব লেখায় তিনি ভারতীয় সমাজ, বৈষম্য, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়ের জটিল প্রশ্নগুলোকে তুলনামূলক ও নৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ্য যে, ‘প্রাকৃতিক বৈষম্যের ধারণা ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ গ্রন্থে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সমাজে অসমতার ধারণা কীভাবে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘প্রাকৃতিক’ বলে প্রতিষ্ঠিত হয়? তিনি বিশ্লেষণ করেন, কীভাবে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নিয়মনীতি এবং পেশাগত সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে বৈষম্য ধীরে ধীরে বৈধতা অর্জন করে এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে। আন্দ্রে বেতেই ছিলেন একজন মানবিক শিক্ষক ও যুক্তিবাদী পথপ্রদর্শক। কেবল একাডেমিক গবেষণাই তার মেধার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়; বরং শিক্ষাদান ছিল তার বৌদ্ধিক সাধনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রকৃতপক্ষে, বেতেই ছিলেন এক ব্যতিক্রমী শিক্ষক, যিনি ছাত্রদের সঙ্গে সহজ ও সমমর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। তিনি মনে করতেন, তত্ত্বের আলোচনায় কেবল তথ্য বা জ্ঞান যথেষ্ট নয়; শিক্ষা এমন হতে হবে যা শিক্ষার্থীকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন তুলতে এবং সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে উৎসাহিত করে।
বেতেইয়ের অবদান কেবল গবেষণা ও লেখালেখিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার কাজেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং উত্তর-পূর্ব হিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ পর্ষদে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে তিনি প্রান্তিক অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আন্দ্রে বেতেই এমন এক চিন্তাবিদ ছিলেন, যিনি নৈতিক বোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে তার বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার হিসেবে প্রচ-ভাবে ধারণ করেছিলেন। তার মৃত্যুতে দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশের একাডেমিক ও সমাজবিজ্ঞানের অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ তাকে ‘নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নোঙর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি অনেকের জন্য বৌদ্ধিক উত্তরণ ও নৈতিক দিকনির্দেশনার দৃঢ় ভিত্তি হয়ে থাকবেন। তার জীবন ও কর্ম আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়। সমাজকে উপলব্ধি করা মানে কেবল তত্ত্বের অনুশীলন নয়; বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক ন্যায়ের চেতনা এবং সংযমী পর্যবেক্ষণের সমন্বয়ে ব্যক্তি ও সমাজকে গভীরভাবে অনুধাবন করা। বেতেইর উত্তরাধিকার আমাদের সমাজবিজ্ঞানে সংযত, যুক্তিনিষ্ঠ ও সদর্থক আলোচনার ধারাকে অটলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আন্দ্রে বেতেই শুধু এক প্রতিভাধর সমাজবিজ্ঞানীই ছিলেন না; ছিলেন আত্মবিশ্বাসী, সংযত ও গভীরভাবে মানবিক সমাজবোধের এক অনন্য উত্তরাধিকারী। তার বৌদ্ধিক অবস্থান কখনো উচ্চকণ্ঠ ছিল না, কিন্তু ছিল দৃঢ়, সুসংহত ও নৈতিকভাবে স্বচ্ছ। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, সমাজকে বোঝা মানে কেবল তত্ত্ব নির্মাণ নয়, বরং বাস্তবতার জটিল স্তরগুলোকে ধৈর্য ও সততার সঙ্গে বিশ্লেষণ করা। তার জীবনের পাঠ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় গতিশীল সমাজের অন্তর্নিহিত বৈষম্য, ক্ষমতার রূপান্তর ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নের সমাধান সম্ভব কেবল তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, যৌক্তিকবোধ এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে।
লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন